,

sheet-1

শীত বাড়ছে,তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা ১১ডিগ্রির নিচে

হাওর বার্তা ডেস্কঃ পৌষের মাঝামাঝি ঘন কুয়াশা আর সূর্যের লুকোচুরি খেলায় উত্তরের জেলাগুলোতে চোখ রাঙাচ্ছে শীতের তীব্রতা। সঙ্গে আছে কনকনে বাতাস; যা জনজীবনে ভোগান্তির মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলেছে। প্রচন্ড শীতের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের স্বাভাবিক জনজীবন। শীতের প্রকোপে অসহায় হয়ে দিনাতিপাত করছে ছিন্নমূল মানুষেরা। গত তিন দিন ধরে ২৪ ঘণ্টা হিমেল হাওয়া জানান দিচ্ছে, শীত জেঁকে বসতে পারে অচিরেই! তীব্র শীতের কারণে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের সারি।

দেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে গত কয়েকদিন ধরেই তীব্র শীত অনুভ‚ত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি শীত তেঁতুলিয়ায়। কয়েকদিন ধরে অব্যাহত এই শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সূর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়লেই বাড়তে থাকে শীতের তীব্রতা। রাত থেকে সকাল অবধি কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে পুরো জেলা। বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত শীত বেশি অনুভ‚ত হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও বিকালের পর থেকে আবারো বাড়ছে শীত। ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছে শিশু ও বয়স্করা।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, গত কয়েকদিন ধরে পঞ্চগড়ে ৮ থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে তাপমাত্রা উঠানামা করছে। গতকাল রোববার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে জনজীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগে রয়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। হাড় কাঁপানো শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন তারা। অনেকেই ছুটছেন ফুটপাতে গরম কাপড়ের খোঁজে। যানবাহনগুলোকে সকালের দিকেও হেডলাইট জ্বালিয়ে সাবধানে চলাচল করতে হচ্ছে। শীতের তীব্রতা বাড়ার কারণে প্রতিদিনই পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে বাড়ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন এই হাসপাতালে শীতজনিত রোগীরা ভর্তি হচ্ছেন। একই চিত্র জেলার অন্য হাসপাতালগুলোতেও।

পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার  জানান, তীব্র শীতের কারণে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে অন্য সময়ের তুলনায় এখন হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
জেলা প্রশাসন বলছে, শীত মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়নের জন্য এ পর্যন্ত প্রায় ২২ হাজার শীতবস্ত্র ও নগদ ৮ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে।

রংপুরে সন্ধ্যার পর থেকে কুয়াশা তীব্র হচ্ছে। দিনে কমছে সূর্যের প্রখরতা। শীত নামতে শুরু করেছে হিমালয়ের কোল ঘেঁষা উত্তরের জনপদেও। গত ডিসেম্বরে মৃদু ও মাঝারি শৈত্যপ্রবাহের পর নতুন বছরে তাপমাত্রা কিছুটা বাড়ার পর ফের শুরু হয়েছে শীতের দাপট। সকালে রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় শৈত্যপ্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছে রংপুর আবহাওয়া অফিস। সন্ধ্যার পর থেকে ঘন কুয়াশার সঙ্গে কনকনে শীত ও হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কাজকর্ম। ঠান্ডায় নাকাল হয়ে পড়ছে চরাঞ্চলসহ ছিন্নমূলের অসহায় মানুষেরা। শীতের এ তীব্রতা আরো বাড়তে পারে। ঘন কুয়াশা আর কনকনে শীত চেপে বসেছে তিস্তা, ঘাঘট, দুধকুমার, যমুনেশ্বরী ও করতোয়া নদী বেষ্টিত রংপুরে। কনকনে শীত আর বেলা গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় হিমেল হাওয়া।

 

পূর্ব আকাশে সূর্যের দেখা মিললেও নেই তেমন উষ্ণতা। এতে জনজীবনে দেখা দিয়েছে ছন্দপতন। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভোগে পড়েছেন চরাঞ্চল এবং নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষেরা। প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষের শরীরে উঠছে মোটা কাপড়। বাড়ছে শীতজনিত রোগাক্রান্তের সংখ্যা। শীতে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন অনেকে। এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যাই বেশি। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. বাবলু কুমার শাহা বলেন, উত্তরাঞ্চলে শীত বাড়তে শুরু করেছে। এতে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অ্যাজমাসহ শীতজনিত রোগে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের সংখ্যা বাড়ছে। নদী তীরবর্তী বেশির ভাগ এলাকার মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। আর দিন দিন শীত জেঁকে বসায় বেড়েছে গরম কাপড় বিক্রি। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ডিসেম্বরের শেষে একটি শৈত্যপ্রবাহের পর গত এক সপ্তাহ তাপমাত্রার কিছুটা উন্নতি হলেও ফের আবহাওয়া কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
গতকাল সকালে দিনাজপুরে তাপমাত্রা ছিল ১২.৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস। ঘন কুয়াশা, তীব্র শীত আর ঠান্ডা থেকে রক্ষায় আগুন জ্বালানোসহ নানা উপায় খুঁজছেন নিম্নআয়ের মানুষ। দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তা তোফাজ্জাল হোসেন জানান, দিনাজপুরে সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বাতাসের আদ্রতা ৯৫ শতাংশ, বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৪-৬ কিলোমিটার। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ঘণ্টায় ৮-১২ কিলোমিটার পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন জানান, জেলায় শীতের তীব্রতা বেশি অনুভ‚ত হচ্ছে। তাই শিশু ও বিভিন্ন বয়সের মানুষ তাড়াতাড়ি শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
প্রতি বছরই শীতের মৌসুমে বিপাকে পরে এই অঞ্চলের নিম্ন ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষেরা। এবারো প্রচন্ড শীতে সাধারণ মানুষ কাজে যেতে পারছে না। শ্রমিক শ্রেণির এসব মানুষ সন্তান পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতিপাত করছে। অতিরিক্ত শীতের কারণে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ।
এছাড়াও লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট জেলায়ও শীতের তীব্রতা বাড়ছে। তিস্তা, যমুনা, ধরলার চরাঞ্চলের মানুষ শীতের প্রকোপে খরকুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন।

এদিকে চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, পৌষ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ চলছে। মৌলভীবাজার জেলাসহ দুয়েক জায়গা বাদে দেশের অধিকাংশ স্থানে পৌষের তাপমাত্রা সহনীয় অবস্থায় রয়েছে। অনেক স্থানে তাপমাত্রা মৌসুমের এ সময়ের স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি রয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে জানা গেছে, সারা দেশে মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। সেই সাথে তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইতোমধ্যে গ্রাম-জনপদ, মাঠ-ঘাট, শহরতলী, নদ-নদী অববাহিকা মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে। কুয়াশার কারণে সড়ক-মহাসড়কে ও নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। শীত-কুয়াশা, ধুলোবালিতে সর্দি-কাশি, জ¦র, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগব্যাধির প্রকোপ বেড়ে গেছে।
গতকাল রোববার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে ৯.১ ডিগ্রি সে.। ঢাকার তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ২৩ ও সর্বনিম্ন ১৫ ডিগ্রি, চট্টগ্রামে যথাক্রমে ২৭ ও ১৬.৫ ডিগ্রি সে.। দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৯ ডিগ্রি সে.।

আজ সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে আবহাওয়াবিদ  জানান, অস্থায়ীভাবে আকাশ আংশিক মেঘলাসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। সারা দেশে রাত ও দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে । পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পারে। এরপরের ৫ দিনে আবহাওয়ার কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।
উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের একটি বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও এর সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

 

দেশের উত্তর জনপদের সর্বশেষ জেলা ঠাকুরগাঁও। হিমালয়ের অনেক কাছে হওয়ায় এখানে শীতের তীব্রতা প্রতি বছরই বেশি হয়। কিন্তু এবার যেন শীতের আচরণ একটু বেশি দাপুটে। ডিসেম্বরের শুরুতে শীতের তীব্রতা শুরু হলেও মাসের শেষ থেকে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া অফিসের সূত্র মতে, ঠাকুরগাঁও জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭.৪ ডিগ্রি সে. রেকর্ড করা হয়েছে। এই জেলায় কখনো সারাদিন ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকছে আবার কখনো চলছে হালকা রোদের আশা-যাওয়ার ভেলকিবাজি। গত দুইদিন দিন ধরে এখানে দিনের বেলায় কিছু সময় সূর্য দেখা গেলেও বাতাস শীতের তীব্রতা অনেক বেশি। রাতের বেলায় বৃষ্টির ন্যায় ঝিরঝির করে কুয়াশা ঝরছে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর