,

download

পুরুষের গড় আয়ু যে কারণে কম

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সম্প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ছকে বাঁধা পদ্ধতির আদলে পুরুষ হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং পুরুষ বলতেই শারীরিক-মানসিকভাবে শক্তপোক্ত মানুষ হবে—এমন ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় ক্রমে পুরুষের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্র কমছে। আবার পাছে কেউ তাকে দুর্বল ভাবল কি না, সেটা ভেবে অনেক পুরুষ তাদের দীর্ঘদিনের অব্যক্ত কথা ও চিন্তা প্রকাশ না করে নিজের মনের ভেতরে চিরতরে সমাহিত করে। পুরুষ হয়ে ওঠার এই সামাজিক শিক্ষা ব্যাপক প্রসার লাভ করায় পুরুষেরা তাদের মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলতে চায় না।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পুরুষেরা বংশপরম্পরায় এমন শিক্ষাই বহন করে চলেছে যে একজন পুরুষ জীবনে সফল হবে, পরিবারের সবার জন্য অর্থ উপার্জন করবে, পরিবারের সবার দায়িত্ব নিজ থেকে পালন করবে এবং সবার পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করে তাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে—এটাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র উদ্দেশ্য।

এমনকি প্রতিটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষের কাছ থেকে এমনটা আশা করে যে সব পরিস্থিতি ও কঠিন চাপে পুরুষ ভেঙে পড়বে না এবং কোনো অবস্থাতেই সে দুর্বলতা প্রকাশ করবে না। অনেক পুরুষ আবার এই সামাজিক শিক্ষা জন্ম থেকেই তার ঘাড়ে বিশাল এক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে মনে করে মানসিকভাবে হয়ে ওঠে বিরক্ত।

সামাজিকতার এই বেড়াজাল থেকে বের হতে না পারা, ছোটখাটো মানসিক উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়া এবং এসব বিষয়ে কথা বলার অনীহার কারণে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য এখন উপেক্ষিত। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ন্যূনতম স্বস্তির খোঁজে সারা দিন ডুবে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে তার যেমন দূরত্ব বাড়ে, তেমনি নিজের একাকিত্বও বাড়তে থাকে সমান তালে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, নারীর তুলনায় বিশ্বব্যাপী পুরুষের আত্মহত্যার প্রবণতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে এবং এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। এছাড়া পুরুষ হয়ে ওঠার সংগ্রামে ব্যাপক মানসিক চাপে পিষ্ট ও মানসিকভাবে ক্লান্ত পুরুষের বিভিন্ন শারীরিক অসুখে মৃত্যুবরণ করার সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী নারীর তুলনায় পুরুষের গড় আয়ু কম।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বা ইউএনএফপিএ প্রকাশিত ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২১’ নামক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও কাঠামো বাংলাদেশে পুরুষের গড় আয়ু নারীর তুলনায় চার বছর কম হওয়ার জন্য দায়ী।

সেই সঙ্গে পুরুষের নিজের তৈরি পিতৃতন্ত্রের বেড়াজালে সে নিজেই বন্দি হয়ে রয়েছে। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা অনুযায়ী পুরুষকেই পরিবারের নারী, শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতে হয় এবং সে চাইলেই অনেক সময় নারীকে তার প্রচেষ্টায় অংশীজন করতে পারে না।

কারন সে যদি অপারগতা প্রকাশ করে, তাকে তার সমাজে অন্য পুরুষের চেয়ে দুর্বল ভাবা হবে এই যুক্তি দিয়ে যে, অন্য পুরুষ যেহেতু পরিবার এই নিয়মে পরিচালনা করছে, সেহেতু তাকে পারতেই হবে। একটি ছেলেশিশুকে ছোটবেলা থেকে এভাবেই তৈরি করা হয়, যেন সে আবেগ দ্বারা তাড়িত না হয়ে সমাজের শুধু কঠিন বাস্তবতাকে সামলাতে পারে।

তবে চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের মতে, একজন মানুষের পুরুষালি আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে তার শরীরে উত্পন্ন টেস্টোস্টেরন হরমোনের ওপর এবং সামাজিকতার নীতি এখানে ঐচ্ছিক নিয়ামক। বয়ঃসন্ধিকালের শেষ সময়ে সাধারণত ছেলেদের শরীরে এই টেস্টোস্টেরন হরমোন নিঃসরণ হয় এবং এর আধিক্যের ওপর নির্ভর করে একজন পুরুষ কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে আগ্রহী হবে।

ফলে একজন পুরুষকে যখন শারীরবৃত্তীয় কার্যপ্রণালি বিবেচনায় না নিয়ে শুধু সামাজিকতার নিরিখে সক্ষমতার প্রশ্ন তুলে পরিবার পরিচালনার ভার দেওয়া হয়, তখন তার মধ্যে বাড়ে অতৃপ্তি, হতাশা এবং প্রকাশ না করে চেপে যাওয়ার কারণে মানসিক শান্তির খোঁজে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আকুলতা।

কিন্তু অনেক পুরুষ সামাজিকতা রক্ষায় তার সংগ্রামের বিনিময়ে যে স্বীকৃতি ও কর্তৃত্বের ক্ষমতা পায়, সেটাকে সে উপভোগ করে এবং সে কারণে নিজেও এসব দায়িত্বকে শারীরিক ও মানসিক চাপ বলে মনে করে না। আবার অনেক পুরুষকে ছোটবেলা থেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দেওয়া হয় বলে নিজেকে অনুরূপভাবেই সে তৈরি করে নেয়।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর