দিন যত যাচ্ছে ততই উত্তুঙ্গ হয়ে উঠছে পূর্ব পাকিস্তান। মিছিল সভা স্লোগান ছড়াচ্ছে আগুন। চোখে নিয়ে দীপ্ত সাহস, বাড়ছে সাহসী মানুষের জট। তরুণের হাতে বাঁশের লাঠি। রাইফেলের ট্রিগারে হাত। স্বদেশের জন্য প্রাণ দিতে উন্মুখ বাঙালি। বিক্ষোভে উত্তাল পূর্ব পাকিস্তান ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে অনিবার্য এক সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে।
উত্তাল পূর্ব পাকিস্তানে ভিন্ন এক দিন আজ ১৭ মার্চ। একাত্তরের এই দিনেই বাঙালি উদযাপন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫২তম জন্ম§দিন। বঙ্গবন্ধুকে শুভে”ছা জানাতে ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরে সকাল থেকেই ঢল নামে মানুষের। ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হন রাত অবধি।
জন্মদিনের শুভেচ্ছার বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, এই দুঃখিনী বাংলায় আমার জন্মদিনই বা কী, আর মৃত্যুদিনই বা কী? বাংলাদেশের জনগণের জীবনের কোনো নিরাপত্তাই তারা রাখেনি। জনগণ আজ মৃতপ্রায়। আমার আবার জন্মদিন কী? আমার জীবন নিবেদিত জনগণের জন্য। আমি যে তাদেরই লোক।
সকাল ১০টা থেকে প্রায় ১১টা পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হাউসে অনুষ্ঠিত হল মুজিব-ইয়াহিয়ার দ্বিতীয় দফা বৈঠক। বৈঠকে উভয়ের পরামর্শদাতারাও যোগ দিলেন। আওয়ামী লীগের যুক্তিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট প্রস্তাবে হতভম্ব হলেন প্রেসিডেন্টের পরামর্শকরা। আবারও মুলতবি হল বৈঠক।
কপালে চিন্তার রেখা নিয়ে বৈঠক থেকে বেরিয়ে এলেন বঙ্গবন্ধু। অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বললেন-আলোচনা চলছে, আন্দোলনও চলবে।
পূর্ব পাকিস্তানে এই দিন থেকেই শুরু হল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র প্রস্তুতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠ, শহরের অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় শুরু হল ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ-যুবার কুচকাওয়াজ ও রাইফেল প্রশিক্ষণ।
ঢাকার বাইরেও বাঁশের লাঠি নিয়ে প্রকাশ্য প্রশিক্ষণ চলে শিক্ষার্থী-তরুণ-তরুণীদের। প্রশিক্ষণ দেন অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সৈনিক ও পুলিশ সদস্যরা।
রাতে প্রেসিডেন্ট হাউসে স্বল্প সময়ের জন্য এক গোপন বৈঠক করেন ইয়াহিয়া ও টিক্কা খান। পিপলস পার্টি চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া।
স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করে। ঘোষণায় বলা হয়, ২৩ মার্চ সকাল ৬টায় সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং যানবাহনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, প্রভাতফেরি, শহীদদের কবর জিয়ারত, শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণ, জয় বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ এবং বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় ছাত্র-জনতার সমাবেশ হবে।
সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, পূর্ব বাংলা এখন স্বাধীন। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। আমার ৮৯ বছরের অতীতের সবকটি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কিš‘ একটি সার্বজনীন দাবিতে জনগণের মধ্যে বর্তমান সময়ের মতো একতা ও সহযোগিতা আগে কখনও দেখিনি।
সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি আজও পূর্ব পাকিস্তান জ্বলে বাঙালির বিক্ষোভের আগুনে। শহর জুড়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। যথারীতি অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। হাজার হাজার মানুষ শহীদ মিনারে গিয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফল করতে শপথ নেয়।
বিকেলে মোহাম্মদপুরে এক জনসভায় ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য স্থানীয় অবাঙালি নাগরিকদেরও আহ্বান জানান।
Reporter Name 























