চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা; কিন্তু অর্থবছরের নয় মাস পার না হতেই সেই সীমা ছাড়িয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সরকার অতিরিক্ত ঋণের পথে হাঁটছে, যা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ার ইঙ্গিত দেয়। এই ঋণের অধিকাংশই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া। মূলত রাজস্ব আয়ে ধীরগতি, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক ঋণ সহায়তার প্রত্যাশিত প্রবাহ না থাকায় এখন কার্যত ব্যাংকিংব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে ব্যয় মেটাচ্ছে সরকার। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে অতিদ্রুত ঋণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলোÑ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে সরকারের মূলধন সহায়তা। গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ওই ব্যাংকে সরকার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়, যার বড় অংশই এসেছে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ধার করা অর্থের মাধ্যমে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরেও বিগত সরকারের ব্যয়ের চাপ বেড়েছিল। বর্তমানে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি খাতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়ে সরকার চাহিদা পূরণ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার ব্যাংক থেকে বাড়তি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমনিতেই ত্রয়োদশ নির্বাচন-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ তলানিতে নেমেছে। তাই বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত দেন তারা।
প্রতিবছরই বড় অঙ্কের ঘাটতি রেখে বাজেট পেশ করে আসছে সরকার। এই ঘাটতি মেটানো হয় মূলত দুটি উৎস থেকে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত। বৈদেশিক খাত থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা পাওয়া না গেলে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপরই বেশি নির্ভর করতে হয় সরকারকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা, নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা কোম্পানি এবং সঞ্চয়পত্র খাত। এবার জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট দিয়েছে, সেখানে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে (অনুদানসহ) ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে অনুদান বাদে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এবার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আর অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পাওয়ার আশা করা হয়। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তবে এখন পর্যন্ত সরকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তার সিংগভাগই নিয়েছে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (১ জুলাই থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত) সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নিট ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৫০ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৫২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ গতবারের চেয়ে এবার ব্যাংক ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এ সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ নিয়েছে ৭৩ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯৪ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। অন্যদিকে এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৩২ হাজার ১৯২ কোটি টাকা। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ঋণাত্মক ধারায় প্রায় ৪১ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের ৩০ মার্চ শেষে সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারে নেওয়া ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা।
এই ঋণনির্ভরতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকার কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ঘাটতি বছর শেষে আরও বাড়তে পারে। ফলে সরকারের ব্যয়ের বিপরীতে আয়ের যে ভারসাম্য থাকার কথা, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সময়ে অ-ব্যাংকিং উৎস থেকে মাত্র ২ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে সরকার। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) হিসেবে সঞ্চয়পত্র থেকে কোনো ঋণ পায়নি সরকার। উল্টো সঞ্চয়পত্র ভাঙাবাবদ অতিরিক্ত ৫৫৫ কোটি টাকার মতো পরিশোধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বৈদেশিক উৎস থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৯ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এবার মোট নেওয়া ঋণের ১১ শতাংশেরও কম এসেছে বৈদেশিক উৎস থেকে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।
এদিকে সরকার ব্যাংক থেকে অস্বাভাবিক গতিতে ঋণ নিয়েও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে। টানা কয়েক মাস ধরে এই প্রবৃদ্ধি ছয় শতাংশের আশপাশে আটকে আছে, যা বিনিয়োগের মন্থরতারই প্রতিফলন। সর্বশেষ ফেব্রয়ারি মাসে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ।
Reporter Name 
























