,

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যাবেই * বিশাল গণসংবর্ধনায় প্রধানমন্ত্রী * বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের ঢল

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। দেশকে নিয়ে যেতে হবে আরও উন্নতির শিখরে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন।

ভারতীয় সংসদে স্থলসীমান্ত বিল পাস ও সীমান্ত চুক্তি কার্যকর এবং ‘জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা অর্জনের’ জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ গণসংবর্ধনা দেয় জাতীয় নাগরিক কমিটি। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে অনুষ্ঠানে আসা লাখো মানুষের উদ্দেশে ভাষণদানকালে বিশাল সংবর্ধনার সম্মাননা দেশবাসীর প্রতি উৎসর্গ করে শেখ হাসিনা বলেন, যতটুকু আর্থ-সামাজিক উন্নতি তার সরকার করতে পেরেছে তার সবই বাংলার মানুষের দান। তিনি বলেন, এ সম্মান আমার নয়, বাংলার মানুষের, জনগণের। তিনি বলেন, তার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই, হারানোরও কিছু নেই। এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য যে কোনো আত্মত্যাগ করতে তিনি সদাপ্রস্তুত। শেখ হাসিনা বলেন, দেশ শাসন করতে নয়, আমরা জনগণের সেবক হয়ে সেবা করতে এসেছি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। দেশকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশকে নিয়ে যেতে হবে আরও উন্নতির উচ্চশিখরে, এ আমাদের প্রতিজ্ঞা। দীর্ঘ ৪০ বছর পর বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তির সংবিধান সংশোধনী বিল ভারতীয় সংসদে সর্বসম্মতিতে পাস হওয়াকে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শুধু সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন নয়, পার্শ্ববর্তী সব দেশের সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা স্থাপন করে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ২০২১ সালে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশের ‘সুবর্ণজয়ন্তী’ উদযাপন হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ আর্থ-সামাজিকসহ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেকে বিদ্রৃপ করে বলেছিল, স্বাধীন হলেও বাংলাদেশ হবে তলাবিহীন ঝুড়ি। কিন্তু আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। সেই ঝুড়ি এখন উন্নয়নে ভরপুর। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নে ভরপুর একটি রাষ্ট্র। এখন বিশ্বের সব দেশই স্বীকার করে বলছে, বাঙালি জাতি পারে। এটা সারা বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত, বাঙালি পারে। বাংলাদেশকে কেউ আর এখন অবজ্ঞার চোখে দেখে না কিংবা অপছন্দ করে না। বরং বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে দেখা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের আরও অনেক দূর পথ চলতে হবে। আরও সামনে এগিয়ে যেতে হবে। নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ভোগ নয়, ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে। বাঙালি জাতির জন্য আমি সব কিছু করব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বসভায় মর্যাদার সঙ্গে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। বিকাল ৪টার দিকে জাতীয় সংগীত এবং ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। নাগরিক কমিটি এ সংবর্ধনার আয়োজন করলেও বৈরী আবহাওয়া এবং থেমে থেমে বৃষ্টি উপেক্ষা করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের উপস্থিতিতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি রীতিমতো বিশাল জনসভায় রূপ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। এ সময় জনতাকে ভিজে ভিজে ভাষণ শুনতে দেখা যায়। জাঁকজমকপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল দৃষ্টিনন্দন এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চলমান উন্নয়নের গতিধারা ত্বরান্বিত করার প্রয়াসে তার প্রতি পূর্ণ সমর্থনও ব্যক্ত করেন। বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে শেখ হাসিনার হাতে নৌকার প্রতিকৃতির স্মারক তুলে দেন নাগরিক কমিটির সভাপতি সৈয়দ শামসুল হক। আর অভিনন্দনপত্র পাঠের পর কাঠের ওপর শেখ হাসিনার প্রতিকৃতিসংবলিত একটি স্মারক আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর হাতে তুলে দেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের সভাপতি সৈয়দ শামসুল হক। পরে তার রচিত ও আলাউদ্দিন আলীর সুরে একটি সংগীত পরিবেশন করা হয়। সংগীত শেষে নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নীপার নেতৃত্বে একটি দলীয় নৃত্য পরিবেশন করা হয়। শেখ হাসিনা বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে সংবর্ধনা মঞ্চে উপস্থিত হন। বিকাল সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। সভাপতির ভাষণে সৈয়দ শামসুল হক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দেশরত্নে’ উপাধিতে ভূষিতকরণ আবশ্যিক করার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শিক্ষাবিদ অনুপম সেন, অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরে বক্তৃতা করেন। তাদের বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে সংগীত পরিবেশনা। মিতা হক ও মহিউজ্জামান চৌধুরী গেয়ে শোনান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী’। মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাধারণ সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য, ঢাকার দুই মেয়র, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, জাতীয় প্রেসক্লাবের নতুন কমিটির নেতৃবৃন্দ, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী নেতা, আইনজীবী, পেশাজীবীসহ ঢাকা এবং আশপাশের জেলাগুলোর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান। তিনি ভাষণের শুরুতে বাংলাদেশ গঠনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা তুলে ধরেন। বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মহৎ কাজের জন্য মহান ত্যাগের প্রয়োজন। ভোগে নয়, ত্যাগেই রয়েছে সবচেয়ে বড় অর্জন। সবাইকে ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, তিনি শাসন করতে আসেননি, জনগণের সেবা করতে এসেছেন। কারণ তিনি সব সময় পিতার আদর্শ অনুসরণ করেন। যার প্রধান লক্ষ্যই ছিল- মানুষকে উন্নত জীবন দেওয়া, শিক্ষার আলোতে আলোকিত করা, বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত করা এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শিক্ষিত করা। যাতে বাঙালি জাতি বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, সেই আদর্শ বুকে নিয়েই সবাইকে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ’৭৫-এর পর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ হারিয়েছে। জাতির পিতাকে হত্যা করে খুনিরা বাংলার মানুষের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। সেই মর্যাদাকে আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। শেখ হাসিনা স্মৃতিতে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘দেশে ফেরার পর আমি আমার স্বজনদের খুঁজেছিলাম। কিন্তু যখন এই বাংলার মানুষ কাছে এসে স্নেহ-মমতা দিলেন, তখনই তাদের মাঝে হারিয়ে যাওয়া মা-বাবার সন্ধান পেলাম। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যারা আমাকে স্বজনহারা করেছে তাদের বিচার করব।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে যা যা করা দরকার তিনি করবেন, দেশে ফিরে এই প্রতিজ্ঞা তিনি নিয়েছিলেন। এ দেশের জন্যই তার বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজন জীবন দিয়েছেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তার সরকার রূপকল্প ঘোষণা করেছিল। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে যে অগ্রযাত্রার সূচনা করেছিলাম, তা ২০০১ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ভূলুণ্ঠিত হয়ে যায়। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলার মানুষের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, ২০০৯ সালের নির্বাচনে ভোট দিয়ে আমাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। সেই সুযোগ দিয়েছে বলেই আমরা মানুষের সেবা করতে পেরেছি।  স্থলসীমান্ত চুক্তির বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পর মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি হয়। পরে ’৭৪-এ বাংলাদেশ সংসদ সীমান্ত চুক্তি পাস করলেও ভারত দীর্ঘ ৪০ বছর পর তা পাস করে। আমি দেশবাসীর পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান করতে চাই। এ অঞ্চলের সমৃদ্ধির জন্য এবং বাংলাদেশের উন্নতির জন্য আমরা এটা চাই।

শেখ হাসিনার নামের আগে স্থায়ীভাবে দেশরত্ন : সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ শামসুল হক শেখ হাসিনার নামের আগে স্থায়ীভাবে ‘দেশরত্ন’ ব্যবহারের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামের প্রারম্ভে আবশ্যিকভাবে ‘দেশরত্ন’ শব্দটি ব্যবহার হবে। তিনি বলেন, আমি সবার পক্ষ থেকে তাকে ‘দেশরত্ন’ উপাধিতে ভূষিত করছি। এ সময় জনতা করতালি দিয়ে সমর্থন জানায়। সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ইতিহাসের তীর্থস্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রতিটি পাতা, ধূলিকণা আজও বঙ্গবন্ধুর কথা বলে। এখানেই স্বাধীনতার প্রথম বাণী উচ্চারিত হয়েছিল, দাবি এসেছিল সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও মানবমুক্তির। বঙ্গবন্ধুর সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানেই আজ তার কন্যা শেখ হাসিনার সংবর্ধনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এখন দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। আমাদের রপ্তানি বেড়েছে দুই বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, আজকে আমাদের উপস্থিতি শুধু সংবর্ধনা দিতে নয়। আমরা আপনার নেতৃত্বের প্রতি নাগরিকের সমর্থন ও আস্থা জানানোর জন্য এসেছি। ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, সব সময় নেতিবাচক বিষয়ই গুরুত্ব পায়। বিগত সময়ে দেশের ভাবমূর্তি বারবার নষ্ট করা হয়েছে। আর শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের মর্যাদাবান করেছে, সম্মানিত করেছে।

নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, শেখ হাসিনা যখন নির্বাসনে ছিলেন তখনো একটা সংস্কৃতি ছিল। তা হলো ভয়ের সংস্কৃতি, শঙ্কার সংস্কৃতি। কিন্তু তিনি তা অতিক্রম করে দেশে ফিরেছেন। সাহসের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছেন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে তিনি বিচারের সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছেন।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর