,

আত্মীয়তার বন্ধনে রাজনীতি-৭

মোগল ও বৃটিশ আমলে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের নামের সঙ্গে ভূস্বামী, পেশাগত, ধর্মীয় ও সম্মানসূচক কিছু
পদবি যুক্ত হয়। কালের বিবর্তনে পদবির গুরুত্ব ম্লান হলেও রাজনীতিতে সেসব পদবিধারী কিছু পরিবার অটুট রেখেছেন তাদের প্রভাব। দেশের রাজনীতিতে দুইটি বিখ্যাত মির্জা পরিবার হলো পাবনা ও ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা পরিবার। জিয়া সরকারের মন্ত্রী ছিলেন পাবনার মির্জা আবদুল হালিম। তার চাচাতো ভাই মির্জা আবদুল আওয়ালও ছিলেন জিয়া সরকারের এমপি। মির্জা আওয়ালের ছোট ভাই হলেন আওয়ামী কৃষক লীগের সাবেক সভাপতি, সাবেক সচিব ড. মির্জা আবদুল জলিল। আবার মির্জা আওয়ালের ভাগনে হলেন এরশাদ সরকার ও বিএনপি সরকারের সাবেক এমপি মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের। আবার মঞ্জুর কাদেরের সম্পর্কে চাচা হলেন বাম নেতা ও ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। বাম নেতা টিপু বিশ্বাসের ভগ্নিপতি হলেন বিএনপি দলীয় সাবেক মন্ত্রী মির্জা হালিম। টিপু বিশ্বাসের এক ভাগনে হলেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ ডিলু। সে সূত্রে ডিলুর খালু হচ্ছেন মির্জা হালিম। পাবনা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মাহতাবউদ্দিন বিশ্বাসের ভাগনে হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি আবার বাম নেতা টিপু বিশ্বাসের সম্পর্কে ভাতিজা। শিমুল বিশ্বাসের বেয়াই হলেন পাবনা পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট তসলিম হাসান সুমন। শিমুল বিশ্বাসের বড় ছেলে তানভীর রহমান বিশ্বাস পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছেন সুমনের মেয়ে তাহিজদ হাসান তরণীকে। আবার তসলিম হাসান হলেন পাবনা জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি মেজর (অব.) খন্দকার সুলতান মাহমুদের শ্যালক। এছাড়া মির্জা পরিবারের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় হলেন বিএনপি সরকারের সাবেক এমপি পাবনার আবদুর রশিদ মির্জা। এ মির্জা আবদুর রশিদের ছেলে মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম ছিলেন ওয়ান ইলেভেনের জরুরি সরকারের অর্থ উপদেষ্টা। ঠাকুরগাঁওয়ের মির্জা পরিবারের প্রধান ছিলেন এরশাদ সরকারের মন্ত্রী মির্জা রুহুল আমিন (চোখা মিয়া)। তার বড় ছেলে হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছোট ছেলে মির্জা ফয়সল জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতা। মির্জা আলমগীরের বোনজামাই হলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান। আবার বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী মির্জা গোলাম হাফিজ এবং ভাষাসৈনিক ও কমিউনিস্ট নেতা প্রয়াত মির্জা নুরুল হুদা কাদের বকস হলেন মির্জা আলমগীরের সম্পর্কে চাচা।
মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম প্রধান সংগঠক ও জাতীয় চার নেতার একজন শহীদ এ এইচ এম কামরুজ্জামান। তার ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের এমপি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক প্রতিমন্ত্রী এ বি এম তাজুল ইসলাম জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানের ভায়রা। ফলে তিনি লিটনের খালু। আবার লালমনিরহাট-৩ আসনের এমপি আবু সালেহ মোহাম্মদ সাইদ জাতীয় নেতা কামরুজ্জামানের মেয়ের জামাই এবং রাজশাহী-৫ আসনের এমপি সাবেক প্রতিমন্ত্রী ওমর ফারুক চৌধুরী হলেন কামরুজ্জামানের ভাগনে।
রাজনীতিক ও দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার দুই ছেলে হলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। মইনুল হোসেন বঙ্গবন্ধু সরকারের এমপি ও ওয়ান ইলেভেন সরকারের আইন উপদেষ্টা ছিলেন। মানিক মিয়ার ছোট ছেলে জাতীয় পার্টি (জেপি) সভাপতি ও আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি এরশাদ ও শেখ হাসিনার সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিএনপির প্রথম আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তার স্ত্রী তাসমীমা হোসেন নিজেও একজন সাবেক এমপি। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর আপন মামা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। জাতীয় পার্টির নির্বাহী এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তার স্ত্রী পারভিন পিকেএসএফ-এর ডেপুটি ম্যানেজার। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের শাশুড়ি শামসুন নাহার পরাণ নিজে নারী নেত্রী ও ঘাসফুল এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা। পরাণের ভাই হলেন মে. জেনারেল (অব.) সাঈদ। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের শ্বশুরপক্ষীয় আত্মীয় হলেন জাতীয় পার্টি (জাফর)-এর সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর। আর কাজী জাফরের চাচা কাজী জহিরুল কাইয়ুম ছিলেন কুমিল্লা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও ১৯৭০-এর এমএনএ। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বেয়াই হলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। ব্যারিস্টার মইনুলের ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন ব্যারিস্টার আনিস।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদ ছিলেন। তার পিতা গমিরউদ্দিন প্রধান ছিলেন পাকিস্তানের সর্বশেষ বাঙালি স্পিকার। শফিউল আলম প্রধানের নানি ও বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর মা হলেন আপন দুই বোন। সেই সূত্রে টুকু হলেন প্রধানের মামা এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রী প্রয়াত ডা. মতিন হলেন খালু। আওয়ামী লীগ সরকারের এমপি রওশন জাহান সাথী হলেন জাসদের প্রয়াত শীর্ষ নেতা কাজী আরেফ আহমেদ। আবার সাথীর পিতা মশিউর রহমান ছিলেন যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটের মাওলানা আবুল হাসনাত। তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের প্রয়াত চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ছেলে। আমিনী হলেন মাওলানা মাহমুদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের মেয়ের জামাই। আবার হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে হলেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমীর মাওলানা আহমুল্লাহ আশরাফ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ও আইসিসির পদত্যাগকারী সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল। তার ভায়রা হলেন ঝালকাঠির এমপি ও ব্যবসায়ী বিএইচ হারুন। কামাল ও হারুনের শ্যালক হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক এমপি ডা. এইচ বি ইকবাল। আবার বিএইচ হারুন এমপি ও দৈনিক ইনকিলাবের প্রকাশক-সম্পাদক ও জমিয়তুল মোদার্রেছিনের সভাপতি এ এম এম বাহাউদ্দিন পরস্পরের বেয়াই। হারুনের ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন বাহাউদ্দিন। বাহাউদ্দিনের পিতা ছিলেন মাওলানা মান্নান জিয়া সরকারের এমপি ও এরশাদ সরকারের ধর্মমন্ত্রী।
কক্সবাজারের মহেষখালী-কুতুবদিয়ার সাবেক এমপি ও বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ। ফরিদের ভায়রা হলেন টেকনাফের বিখ্যাত এমপি আওয়ামী লীগের আবদুর রহমান বদি। ফরিদের জেঠাতো ভাইয়ের ছেলে বর্তমান আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি আশেক উল্লাহ। ফরিদের চাচা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের এমপি প্রার্থী ড. আনসারুল করিম। তার সম্পর্কে ভাই হলেন মুসলিম লীগ নেতা মৌলভী জাকারিয়া। কক্সবাজার সদর আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি লুৎফর রহমান কাজলের শ্বশুর হলেন মহেশখালী আসনের আওয়ামী লীগ সাবেক এমপি ইসহাক মিয়া। কক্সবাজারের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি ও পরে গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলামের ভায়রা হলেন একই আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি প্রয়াত মোজাম্মেল হক, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আহমদ হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজ মোস্তফা সম্পর্কে ভায়রা।
রাজধানীর মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী মোল্লা পরিবারের প্রতিষ্ঠা হলেন কুজরতউল্লাহ মোল্লা। তিনি টানা ২৭ বছর মিরপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তার ছেলে প্রয়াত হারুন উর রশিদ মোল্লা আওয়ামী লীগ নেতা ও মিরপুর পৌরসভার একাধিকবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে তার বদলে ড. কামাল হোসেনকে মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হন। হারুন মোল্লার দুই ছেলে এখলাস উদ্দিন মোল্লা ও ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। ইলিয়াস মোল্লা ঢাকা-১৬ আসনের এমপি এবং তার ভাই এখলাস মোল্লা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়। আবার কুজরত উল্লাহ মোল্লার নাতিন জামাই হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডক্টর মাহদী আমিন। মাহদীর নানা আবদুল আউয়াল ছিলেন বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কুমিল্লা পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। মাহদীর নানীর চাচাত ভাই জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী আবদুর রশিদ ইঞ্জিনিয়ার এবং আরেক ভাইয়ের বেয়াই হলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মাহদী আমিনের ছোট বোনের নানা শ্বশুর শিল্পপতি ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন। আপন চাচাতো বোনের শ্বশুর হলেন জাতীয় পার্টির ও বিএনপির সাবেক এমপি শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর। মাহদী আমিনের শাশুড়ির দাদা আবদুল হামিদ চিশতি ছিলেন গুলশান পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ও বনানী চেয়ারম্যান বাড়ির জনক। এই সূত্র ধরে মাহদী আমিনের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে আওয়ামী লীগের এমপি ও সাবেক চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ। আবার বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী শিল্পপতি হারুনার রশিদ খান মুন্নু। তার মেয়ের জামাই হলেন বিএনপি সরকারের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ও দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক কারান্তরীণ প্রকৌশলী মাহমুদুর রহমান। তারেক আরেক মেয়ে আফরোজা খান রিতা হলেন মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর