হাওর বার্তা ডেস্কঃ ইসলাম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ধর্ম। এ ধর্মে জ্ঞানার্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কারণ জ্ঞানার্জন ব্যতীত মানুষ চিরন্তন সত্য তথা মহান স্রষ্টার পরিচয়, মানব সৃষ্টির কারণ, রিসালাত, আখেরাতে পুনরুজ্জীবন, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি সম্পর্কে অনুধাবন বা উপলব্ধি করতে পারে না, পারবে না। একই সঙ্গে পার্থিব জীবনেও প্রকৃত সুখ-শান্তি তথা সফলতা অর্জন করতে পারবে না। আর তা না পারলে মানুষের জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এ জন্যই তো তিনি মানুষকে অজানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছেন। যেমন পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’ (সূরা আলাক : ৪-৫)। পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘তিনি কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন বর্ণনা বা ভাষা।’ (সূরা আর রহমান : ২-৪)। সুতরাং দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক সফলতার জন্য জ্ঞানার্জন করা, বিশেষ করে মৌলিক ইলম অর্জন করা খুবই জরুরি।
জ্ঞান, কর্মদক্ষতা, চরিত্র ও মানসিক শক্তি বিকাশের প্রয়াসই হলো শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। যুগে যুগে মনীষীরা নানাভাবে শিক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। দার্শনিক সক্রেটিসের ভাষায় শিক্ষা হলো ‘মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।’ প্লেটোর মতে শিক্ষা হলো ‘দেহ ও আত্মার পূর্ণতা সাধনের প্রয়াস।’ অ্যারিস্টটল বলেন ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হলো শিক্ষা।’ ড. জন পার্ক বলেন, ‘নিদর্শন ও অধ্যয়নের মাধ্যমে জ্ঞান আর অভ্যাস অর্জন ও প্রদানের কৌশলই শিক্ষা।’
যেহেতু ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম; যেহেতু ‘যে শিক্ষার মাধ্যমে নিজেকে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে চিনতে পারা যায় এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় তাই ইসলাম শিক্ষা।
ইলমে শিক্ষার গুরুত্ব এতই বেশি যে, মহান আল্লাহ মাটি দ্বারা সৃষ্ট আদিপিতা আদম (আ.) কে শুধু এ শিক্ষার বদৌলতে (স্বীয় ইচ্ছায়) নুরের তৈরি ফেরেশতা ও আগুনের তৈরি জিন জাতির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছিলেন। যেমন পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে ‘আর তিনি (আল্লাহ) আদমকে সবকিছুর নাম শিক্ষা দিলেন, তারপর তা ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। অতঃপর বললেন, তোমরা আমাকে এগুলোর নাম জানাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’ তারা (ফেরেশতারা) বলল, ‘আপনি পবিত্র মহান। আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন, তা ছাড়া আমাদের কোনো জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ তিনি (আল্লাহ) বললেন ‘হে আদম, এগুলোর নাম তাদের জানাও।’ সুতরাং যখন সে (আদম আ.) এগুলোর নাম তাদের জানাল, তিনি (আল্লাহ) বললেন ‘আমি কি তোমাদের বলিনি, নিশ্চয়ই আমি আসমান ও জমিনের গায়েব (অদৃশ্য) জানি এবং জানি, যা তোমরা প্রকাশ করো এবং যা তোমরা গোপন করতে?’ (সূরা বাকারা : ৩১-৩৩)।
আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে অবতীর্ণ করেছেন কোরআন মজিদ। কোরআন মজিদে আয়াতের সংখ্যা ৬ হাজার ২৩৬। এতে সর্বপ্রথম যে আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেছেন, সেগুলো হলো ইলম বা জ্ঞানার্জন সম্পর্কিত। আরও লক্ষণীয় বিষয় যে, প্রথম অবতীর্ণ আয়াতগুলোর মধ্যে প্রথম আয়াতের প্রথম শব্দটি হলো ‘ইকরা’, তথা পড়। অর্থাৎ ইলম অর্জনের গুরুত্ব এতই বেশি যে, মহান আল্লাহর প্রথম হুকুম বা নির্দেশ হলো, ‘পড়! তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাটবাঁধা রক্ত থেকে।’ (সূরা আলাক : ১-২)।
এ জ্ঞানার্জন (মৌলিক ইলম) প্রত্যেক নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর ফরজ। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর ফরজ।’ (বোখারি)। অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ইলমে ফারায়েজ ও কোরআন শিক্ষা কর। কেননা আমাকে উঠিয়ে নেওয়া হবে। অর্থাৎ চিরদিন তোমাদের মাঝে অবস্থান করব না।’ (তিরমিজি)।
জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে মূলনীতি হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়ে পা-িত্য অর্জন করার অধিকার সবার রয়েছে; কিন্তু সবার ওপর তা ফরজে আইন নয়। এ দায়িত্ব সমাজের কিছুসংখ্যক মানুষের ওপর বর্তায়। যেমন আল্লাহপাক বলেছেন, ‘তোমাদের মাঝ থেকে একটি দল কেন বেরিয়ে আসে না, এ উদ্দেশ্যে যে, তারা দ্বীন সম্পর্কে গভীর ও ব্যাপক জ্ঞান লাভ করবে এবং নিজেদের লোকদের মাঝে ফিরে এসে তাদের সেই জ্ঞান দ্বারা সতর্ক করে তুলবে।’ (সূরা তওবা : ১২২)।
ইসলামি শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের তফাত অর্থাৎ পুরুষকে প্রাধান্য দেওয়া ও নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। নারীরা যদি ইসলামের মৌলিক হুকুম পর্দা পালন করে জ্ঞানার্জন (যত উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত সম্ভব) করে তাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো উম্মুল মোমিনিন হজরত আয়েশা (রা.)। তিনি ২ হাজার ২১০টি হাদিস বর্ণনা করেন। তার কাছ থেকে বহু সাহাবি ও তাবেয়ি হাদিস বর্ণনা করেন এবং দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করেন। সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন প্রথম শিক্ষিকা ও মুফতি।
ইসলাম শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর ফজিলত ইসলামি জ্ঞানার্জনের ফজিলতও অন্যান্য আমলের তুলনায় অনেক বেশি। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাতে এক ঘণ্টা (কিছু সময়) জ্ঞানচর্চা করা রাতভর নফল ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (মেশকাত, দারিমি)। জ্ঞানীর মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘(হে নবী!) আপনি বলে দিন তোমাদের মধ্যে যারা জানে (অর্থাৎ আলেম) আর যারা জানে না তারা উভয়ে কি এক সমান হতে পারে?’ (সূরা জুমার : ৭)। এ জ্ঞান অর্জনকারীর মর্যাদা মহান আল্লাহ নিজ কুদরতেই বাড়িয়ে দেন। যেমন কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের ইলম দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেবেন বহুগুণ।’ (সূরা মুজাদালা : ১১)।
মহান আল্লাহ যে বান্দার কল্যাণ চান, তাকেই এ জ্ঞানার্জনের তৌফিক দেওয়া হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যাকে প্রভূত কল্যাণ দিতে চান তাকে দ্বীনের প্রজ্ঞা দান করেন।’ (বোখারি)। ইসলাম ও উম্মাহর সেবার উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জনকারী ব্যক্তি যতক্ষণ জ্ঞানার্জন করবে, ততক্ষণ সে আল্লাহর রাস্তায় অধিষ্ঠিত বলে বিবেচিত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইলমে দ্বীন অন্বেষণে বের হয়েছে, সে ফিরে আসা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় রয়েছে।’ (তিরমিজি)।
দ্বীনি ইলম অর্জনকারী শিক্ষার্থীর ফজিলত এতই বেশি যে, তাদের জন্য ফেরেশতারা ও পৃথিবীর সব প্রাণিকুল তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা ও দোয়া করেন। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশতের কোনো পথে পৌঁছে দেন এবং ফেরেশতারা দ্বীনি ইলম অর্জনকারীদের সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানাগুলো বিছিয়ে দেন। এছাড়াও যারা আলেম তাদের জন্য আসমান ও জমিনে যারা আছেন সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা ও দোয়া করে থাকেন। এমনকি গভীর পানির মৎস্যকুলও ক্ষমাপ্রার্থনা করে থাকে।’ (আবু দাউদ)।
অন্য হাদিসে এসেছে ইসলাম শিক্ষা অর্জনকারীর পূর্ববর্তী সগিরা গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমলের নিয়তে ইলমে দ্বীন অন্বেষণ শুরু করবে, তা তার জন্য বিগত সগিরা গোনাহ ও পাপের কাফফারা হয়ে যাবে।’ (তিরমিজি)।
ইসলাম শিক্ষা অর্জনের পথ অবলম্বন করলে জান্নাতের পথ সুগম হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষার জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে আল্লাহ তার জান্নাতের পথ আসান করে দেন।’ (মুসলিম)।
অন্য হাদিসে ইলম অর্জন করা অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির মৃতু্যু এসে পৌঁছেছে এ অবস্থায়, যখন সে ইসলামকে জিন্দা করার উদ্দেশ্যে ইলম অন্বেষণে ব্যস্ত ছিল, তাহলে তার ও নবীদের মধ্যে জান্নাতে শুধু একটি স্তরের পার্থক্য থাকবে।’ (দারেমি)।
আর যারা ছাত্রজীবন পার করে ইসলামি শিক্ষায় গভীর জ্ঞানার্জন করবে তাদের নবীদের উত্তরাধিকারী বলা হয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ।’ (তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)।
Reporter Name 

























