ঢাকা ১১:৩৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

লোকসানে কাহিল বিটিভি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:২১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫
  • ৩৭০ বার

লোকসানে কাহিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। লাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে খুঁড়িয়ে চলছে রাষ্ট্রীয় এ প্রচারমাধ্যমটি। এক দশক আগেও (২০০৩-০৪) বিটিভির বছরে লাভ ছিল ৫২ কোটি টাকা, আর এখন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। বিটিভির আয় কমার পাশাপাশি দর্শকসংখ্যাও কমছে। বাধ্য না হলে এখন কেউ বিটিভি দেখে না। এটা মূলত সরকার ও সরকারি দলের নেতা-সমর্থকদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। মানহীন অনুষ্ঠানের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এসব সমস্যা নিয়ে বেশ কয়েকবার উষ্মা প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাদের উষ্মা কাজে আসেনি। বিটিভি চলছে তার মান্ধাতা আমলের স্টাইলেই। এসব বিষয়ে কথা বলতে চান না বিটিভির মহাপরিচালক আব্দুল মান্নান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আপনার যে বিষয়ে রিপোর্ট করার দরকার ওই বিষয়ে রিপোর্ট করবেন- এটাই স্বাভাবিক। এখানে আমার কি করার আছে? মিডিয়া জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এমআরবি বাংলাদেশের (সাবেক সিরিয়াস মার্কেটিং অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ) দর্শক জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় বিটিভির দর্শক খুবই কম। তাদের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর এলাকায় টেলিভিশন দর্শকরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সময় দেশীয় টিভি চ্যানেলের সঙ্গে থাকেন। খেলা বা বিশেষ কোন কারণে এটা মাঝে মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়। বাকি অংশের দর্শকরা বিদেশী চ্যানেল দেখেন। তাদের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার দর্শকরা যতক্ষণ টিভি দেখেন, তার মধ্যে ৭০ দশমিক ২৪ শতাংশ সময় তাদের চোখ থাকে বিদেশী চ্যানেলগুলোর ওপর। বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ সময় স্থানীয় চ্যানেলগুলোর সঙ্গে থাকেন। এই স্থানীয় চ্যানেলগুলোতে থাকা দর্শকের মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ সময় দেন বিটিভি দেখার জন্য। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বেসরকারি চ্যানেলের দর্শক সংখ্যা বাড়ে। ভিন্নচিত্র বিটিভি’র ক্ষেত্রে, তাদের দর্শক সংখ্যা ওই সময় কমে যায়। ২০১২ সালে রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কারণে বিটিভির পর্দায় সময় দিতেন দুই দশমিক ১১ শতাংশ। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বিটিভির দর্শক কমে দাঁড়ায় এক দশমিক ৩। এর কারণ ওই সময় বিটিভিতে ঠিকভাবে রাজনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এক দশক আগেও বিটিভির লাভ ছিল ৫২ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে লোকসান শুরু হয়। ওই বছরে বিটিভির আয় ছিল প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই বছর ব্যয় ছিল ১৪৩ কোটি টাকা। ওই বছর লোকসান হয় ১১ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট আয় হয়েছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। বাকি ১১০ কোটি টাকার মধ্যে তরঙ্গ ফিসহ অন্যান্য খরচ ৮০ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে বিটিভির ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এদিকে এক দশক আগে অর্থাৎ ২০০৩-০৪ অর্থবছরে বিজ্ঞাপন থেকে বিটিভির আয় হয়েছিল ৮৩ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিজ্ঞাপন থেকে আয় ছিল ১০০ কোটি টাকা। বছর শেষে মোটা অঙ্কের অর্থ ঘাটতি দেখা দেয়। বিজ্ঞাপনের আয় কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিটিভির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, অনেক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল থাকায় বিজ্ঞাপন ভাগ হয়ে গেছে। এছাড়া, সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় নিয়মের বাইরে বিটিভি বিজ্ঞাপন নিতে পারে না। এদিকে অনুষ্ঠানের গুণগত মানের দিক থেকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের তুলনায় সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভি পিছিয়ে আছে বলে মনে করছে তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তারা বিটিভির অনুষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েক দফা সুপারিশ করেছে। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা বিটিভিকে জানান, বেসরকারি টেলিভিশনে যারা কাজ করে, তারা কেউ বিদেশ থেকে আসেনি। তারা যদি উন্নতমানের দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান করতে পারে, তবে বিটিভি কেন পারবে না। একাধিক সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ও উষ্মা কোন কাজে আসছে না। কারণ বিটিভি চলছে তার নিজস্ব স্টাইলে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

লোকসানে কাহিল বিটিভি

আপডেট টাইম : ১২:২১:১৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫

লোকসানে কাহিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। লাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে খুঁড়িয়ে চলছে রাষ্ট্রীয় এ প্রচারমাধ্যমটি। এক দশক আগেও (২০০৩-০৪) বিটিভির বছরে লাভ ছিল ৫২ কোটি টাকা, আর এখন লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকা। বিটিভির আয় কমার পাশাপাশি দর্শকসংখ্যাও কমছে। বাধ্য না হলে এখন কেউ বিটিভি দেখে না। এটা মূলত সরকার ও সরকারি দলের নেতা-সমর্থকদের প্রচারযন্ত্রে পরিণত হয়েছে। মানহীন অনুষ্ঠানের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এসব সমস্যা নিয়ে বেশ কয়েকবার উষ্মা প্রকাশ করেছে। কিন্তু তাদের উষ্মা কাজে আসেনি। বিটিভি চলছে তার মান্ধাতা আমলের স্টাইলেই। এসব বিষয়ে কথা বলতে চান না বিটিভির মহাপরিচালক আব্দুল মান্নান। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আপনার যে বিষয়ে রিপোর্ট করার দরকার ওই বিষয়ে রিপোর্ট করবেন- এটাই স্বাভাবিক। এখানে আমার কি করার আছে? মিডিয়া জরিপকারী প্রতিষ্ঠান এমআরবি বাংলাদেশের (সাবেক সিরিয়াস মার্কেটিং অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ) দর্শক জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় বিটিভির দর্শক খুবই কম। তাদের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর এলাকায় টেলিভিশন দর্শকরা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সময় দেশীয় টিভি চ্যানেলের সঙ্গে থাকেন। খেলা বা বিশেষ কোন কারণে এটা মাঝে মধ্যে ৫০ শতাংশে উন্নীত হয়। বাকি অংশের দর্শকরা বিদেশী চ্যানেল দেখেন। তাদের জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার দর্শকরা যতক্ষণ টিভি দেখেন, তার মধ্যে ৭০ দশমিক ২৪ শতাংশ সময় তাদের চোখ থাকে বিদেশী চ্যানেলগুলোর ওপর। বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ সময় স্থানীয় চ্যানেলগুলোর সঙ্গে থাকেন। এই স্থানীয় চ্যানেলগুলোতে থাকা দর্শকের মাত্র ১ দশমিক ২ শতাংশ সময় দেন বিটিভি দেখার জন্য। ২০১০ সালে এই হার ছিল ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বেসরকারি চ্যানেলের দর্শক সংখ্যা বাড়ে। ভিন্নচিত্র বিটিভি’র ক্ষেত্রে, তাদের দর্শক সংখ্যা ওই সময় কমে যায়। ২০১২ সালে রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের কারণে বিটিভির পর্দায় সময় দিতেন দুই দশমিক ১১ শতাংশ। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার সময় বিটিভির দর্শক কমে দাঁড়ায় এক দশমিক ৩। এর কারণ ওই সময় বিটিভিতে ঠিকভাবে রাজনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এক দশক আগেও বিটিভির লাভ ছিল ৫২ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে লোকসান শুরু হয়। ওই বছরে বিটিভির আয় ছিল প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই বছর ব্যয় ছিল ১৪৩ কোটি টাকা। ওই বছর লোকসান হয় ১১ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট আয় হয়েছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। বাকি ১১০ কোটি টাকার মধ্যে তরঙ্গ ফিসহ অন্যান্য খরচ ৮০ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে বিটিভির ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০ কোটি টাকা। এদিকে এক দশক আগে অর্থাৎ ২০০৩-০৪ অর্থবছরে বিজ্ঞাপন থেকে বিটিভির আয় হয়েছিল ৮৩ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিজ্ঞাপন থেকে আয় ছিল ১০০ কোটি টাকা। বছর শেষে মোটা অঙ্কের অর্থ ঘাটতি দেখা দেয়। বিজ্ঞাপনের আয় কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে বিটিভির শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, অনেক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল থাকায় বিজ্ঞাপন ভাগ হয়ে গেছে। এছাড়া, সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় নিয়মের বাইরে বিটিভি বিজ্ঞাপন নিতে পারে না। এদিকে অনুষ্ঠানের গুণগত মানের দিক থেকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের তুলনায় সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভি পিছিয়ে আছে বলে মনে করছে তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। তারা বিটিভির অনুষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কয়েক দফা সুপারিশ করেছে। সংসদীয় কমিটির সদস্যরা বিটিভিকে জানান, বেসরকারি টেলিভিশনে যারা কাজ করে, তারা কেউ বিদেশ থেকে আসেনি। তারা যদি উন্নতমানের দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান করতে পারে, তবে বিটিভি কেন পারবে না। একাধিক সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ও উষ্মা কোন কাজে আসছে না। কারণ বিটিভি চলছে তার নিজস্ব স্টাইলে।