ঢাকা ০১:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকায় যে এলাকার বায়ু সবচে দূষিত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:১৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ জানুয়ারী ২০১৭
  • ৮৭৯ বার

রাজধানী ঢাকার বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতিনিয়তেই কমে, বাড়ছে ধুলিকণার পরিমাণ। তবে ঢাকা মহানগরীর ফার্মগেট এলাকার বাতাস সবচেয়ে দূষিত। এই এলাকার বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস আর ধূলিকণার মাত্রা সবচেয়ে বেশি। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ‘নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ প্রকল্প’ (ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট-সিএএসই)-এর মাসিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই সিএএসসি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের ৮টি শহরে ১১টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশনের (সিএএমএস) মাধ্যমে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে বায়ুদূষণ সৃষ্টিকারী কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ওজন, সালফার ডাই-অক্সাইড ও পার্টিকুলার ম্যাটার বা ক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা দেখা হয়। এ পর্যবেক্ষণের ফলাফল নিয়ে প্রতি মাসে

প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংসদ ভবন, ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় স্থাপিত সিএএমএস থেকে ঢাকার বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হয়। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকার ফার্মগেট এলাকার বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস ও বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। আর সংসদ ভবন এলাকায় দূষণের মাত্রা অপেক্ষাকৃত কম।

২০০৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর গৃহীত ‘ন্যাশনাল এমবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড’ (এনএএকিউএস) বা বাতাসের মান পরীক্ষার জাতীয় মানদণ্ড অনুসারে বাতাসে নাইট্রোজেন অক্সাইডের মাত্রা ৫৩পিপিবির (পার্টিকেলস পার বিলিয়ন) নিচে হলে সেই বাতাস নিরাপদ। তবে গত এক বছরে প্রতি মাসে গড়ে নয় দিন বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস নাইট্রোজেন অক্সাইড নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে, এনএএকিউএস অনুসারে বাতাসে ‘পার্টিকেল ম্যাটার’ বা অতি ক্ষুদ্রকণা পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম থাকা উচিত। তবে গত এক বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১২ দিন ফার্মগেট এলাকার বাতাসে পিএম২.৫-এর মাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএম২.৫-এর অনিরাপদ মাত্রাই শ্বাসকষ্ট রোগের প্রধান কারণ।

এ বিষয়ে সিএএসইর পরিচালক মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, ঢাকার বাতাসের দূষণের মূল কারণ হলো এর আশপাশের ইটভাটাগুলো। এ ছাড়া যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণাধীন ভবন আর রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি থেকে ওড়া ধুলাবালিও ঢাকার বাতাস দূষণের জন্য দায়ী। সিএএসইর এক বছরের প্রতিবেদন থেকে ঢাকার বাতাসের ঋতুভিত্তিক ধরনও পাওয়া যায়। এ প্রতিবেদনগুলোর প্রতি মাসের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকার বাতাস সবচেয়ে নির্মল থাকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সময়ে বাতাসের গতি ও বৃষ্টিপাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দূষণকারী পদার্থগুলো ছড়িয়ে পড়ে ও ধুয়ে যায়। ভেজা মাটি থেকেও ধুলা ওড়ে না। তাই বাতাসে দূষণের মাত্রাও কমে যায়।

গত এক বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ তিন মাসে ঢাকার বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, ওজন ও পার্টিকুলার ম্যাটার (পিএম) বা ক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেনি। এক বছরের প্রতিবেদন অনুসারে জুলাই মাসের বাতাস সবচেয়ে পরিষ্কার ছিল। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) ২০১৫ সালের জুলাই মাসের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, পুরো মাসের ৫০ শতাংশ সময়েই একিউআই অনুযায়ী ঢাকার সংসদ ভবন ও দারুস সালাম এলাকায় বাতাসের মান ছিল ‘ভালো’। আর ফার্মগেট এলাকার বাতাস মাসের ৫৫ শতাংশ সময়জুড়েই ‘মডারেট’ বা সহনীয় ছিল। তবে সিএএসইর হিসাবে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বাতাসে দূষণ উপাদানের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার বাতাস ছিল সবচেয়ে দূষিত।

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের হিসাব অনুযায়ী, ফার্মগেট এলাকায় ওই ৮০ শতাংশ সময়েই বাতাসের মান ছিল ‘এক্সট্রিমলি আনহেলদি’ বা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। সংসদ ভবন ও দারুস সালাম এলাকায় ডিসেম্বর মাসের ৪৫ শতাংশ ও ৫০ শতাংশ দিনেই বাতাসের মান ছিল ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’।

ঢাকার বাতাসের মান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশনের গবেষণা সহযোগী ও রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার বাতাসে নাইট্রোজেন বাদে অন্য কোনো গ্যাসের মাত্রা বিপদসীমা ছাড়ায়নি। তবে ধুলাবালির মাত্রা খুবই বেশি। এ এই ধূলিকণা থেকেই শ্বাসের রোগগুলো হয়। তাই এটার নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং।’ মঞ্জুরুল হান্নান বলেন, ‘বাতাসের দূষণজনিত রোগে শহরগুলোতে সারা বছরে ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মানুষ মারা যায়। তারপরও ভারত-চীনের চেয়ে আমরা এখনো ভালো অবস্থায় আছি। তবে দূষণ রোধে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ঢাকায় যে এলাকার বায়ু সবচে দূষিত

আপডেট টাইম : ১২:১৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ জানুয়ারী ২০১৭

রাজধানী ঢাকার বায়ুতে অক্সিজেনের পরিমাণ প্রতিনিয়তেই কমে, বাড়ছে ধুলিকণার পরিমাণ। তবে ঢাকা মহানগরীর ফার্মগেট এলাকার বাতাস সবচেয়ে দূষিত। এই এলাকার বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস আর ধূলিকণার মাত্রা সবচেয়ে বেশি। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত ‘নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ প্রকল্প’ (ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট-সিএএসই)-এর মাসিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই সিএএসসি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের ৮টি শহরে ১১টি কন্টিনিউয়াস এয়ার মনিটরিং স্টেশনের (সিএএমএস) মাধ্যমে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ প্রকল্পে বায়ুদূষণ সৃষ্টিকারী কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ওজন, সালফার ডাই-অক্সাইড ও পার্টিকুলার ম্যাটার বা ক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা দেখা হয়। এ পর্যবেক্ষণের ফলাফল নিয়ে প্রতি মাসে

প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংসদ ভবন, ফার্মগেট ও দারুস সালাম এলাকায় স্থাপিত সিএএমএস থেকে ঢাকার বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ করা হয়। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঢাকার ফার্মগেট এলাকার বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস ও বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। আর সংসদ ভবন এলাকায় দূষণের মাত্রা অপেক্ষাকৃত কম।

২০০৫ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর গৃহীত ‘ন্যাশনাল এমবিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ড’ (এনএএকিউএস) বা বাতাসের মান পরীক্ষার জাতীয় মানদণ্ড অনুসারে বাতাসে নাইট্রোজেন অক্সাইডের মাত্রা ৫৩পিপিবির (পার্টিকেলস পার বিলিয়ন) নিচে হলে সেই বাতাস নিরাপদ। তবে গত এক বছরে প্রতি মাসে গড়ে নয় দিন বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাস নাইট্রোজেন অক্সাইড নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে, এনএএকিউএস অনুসারে বাতাসে ‘পার্টিকেল ম্যাটার’ বা অতি ক্ষুদ্রকণা পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬৫ মাইক্রোগ্রাম থাকা উচিত। তবে গত এক বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১২ দিন ফার্মগেট এলাকার বাতাসে পিএম২.৫-এর মাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পিএম২.৫-এর অনিরাপদ মাত্রাই শ্বাসকষ্ট রোগের প্রধান কারণ।

এ বিষয়ে সিএএসইর পরিচালক মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, ঢাকার বাতাসের দূষণের মূল কারণ হলো এর আশপাশের ইটভাটাগুলো। এ ছাড়া যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণাধীন ভবন আর রাস্তার খোঁড়াখুঁড়ি থেকে ওড়া ধুলাবালিও ঢাকার বাতাস দূষণের জন্য দায়ী। সিএএসইর এক বছরের প্রতিবেদন থেকে ঢাকার বাতাসের ঋতুভিত্তিক ধরনও পাওয়া যায়। এ প্রতিবেদনগুলোর প্রতি মাসের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকার বাতাস সবচেয়ে নির্মল থাকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সময়ে বাতাসের গতি ও বৃষ্টিপাতের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দূষণকারী পদার্থগুলো ছড়িয়ে পড়ে ও ধুয়ে যায়। ভেজা মাটি থেকেও ধুলা ওড়ে না। তাই বাতাসে দূষণের মাত্রাও কমে যায়।

গত এক বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ তিন মাসে ঢাকার বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, ওজন ও পার্টিকুলার ম্যাটার (পিএম) বা ক্ষুদ্র ধূলিকণার মাত্রা নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেনি। এক বছরের প্রতিবেদন অনুসারে জুলাই মাসের বাতাস সবচেয়ে পরিষ্কার ছিল। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে (একিউআই) ২০১৫ সালের জুলাই মাসের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, পুরো মাসের ৫০ শতাংশ সময়েই একিউআই অনুযায়ী ঢাকার সংসদ ভবন ও দারুস সালাম এলাকায় বাতাসের মান ছিল ‘ভালো’। আর ফার্মগেট এলাকার বাতাস মাসের ৫৫ শতাংশ সময়জুড়েই ‘মডারেট’ বা সহনীয় ছিল। তবে সিএএসইর হিসাবে ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে বাতাসে দূষণ উপাদানের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ঢাকার বাতাস ছিল সবচেয়ে দূষিত।

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের হিসাব অনুযায়ী, ফার্মগেট এলাকায় ওই ৮০ শতাংশ সময়েই বাতাসের মান ছিল ‘এক্সট্রিমলি আনহেলদি’ বা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। সংসদ ভবন ও দারুস সালাম এলাকায় ডিসেম্বর মাসের ৪৫ শতাংশ ও ৫০ শতাংশ দিনেই বাতাসের মান ছিল ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’।

ঢাকার বাতাসের মান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি মনিটরিং স্টেশনের গবেষণা সহযোগী ও রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকার বাতাসে নাইট্রোজেন বাদে অন্য কোনো গ্যাসের মাত্রা বিপদসীমা ছাড়ায়নি। তবে ধুলাবালির মাত্রা খুবই বেশি। এ এই ধূলিকণা থেকেই শ্বাসের রোগগুলো হয়। তাই এটার নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং।’ মঞ্জুরুল হান্নান বলেন, ‘বাতাসের দূষণজনিত রোগে শহরগুলোতে সারা বছরে ১ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মানুষ মারা যায়। তারপরও ভারত-চীনের চেয়ে আমরা এখনো ভালো অবস্থায় আছি। তবে দূষণ রোধে নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে।’