বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে সামনে এসেছে নতুন তথ্য। মৃত্যুর আগের রাতে বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশা (১৯) ও শাহরিয়ার দীপকে (২৩) নিয়ে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁ ও বারে গিয়েছিলেন তিনি।
তবে লাইসেন্স থাকার পর মদ সেবন না করেননি তাহসিফ। সেখানে তিনজন প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করে রাতের খাবার খেয়ে বের হন তারা। পরে দিশাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তিনি। তবে কী কারণে তারা সেখানে গিয়েছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেরিকা তাসনিম দিশা তাহসিফের বান্ধবী। তারা তিনজন মিলে বারে দেড় ঘণ্টা সময় কাটান। পরে দিশাকে উত্তরার বাসায় পৌঁছে দিয়ে দীপকে সঙ্গে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যান তাহসিফ। সেখান থেকে কীভাবে তুরাগ নদে গেলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
এদিকে রোববার (১ নভেম্বর) রাত ২টার দিকে নিজ বাসা থেকে নারী পুলিশের সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন।
তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে হত্যাকাণ্ডের আগে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার একটি বারে যাওয়া, খাবারের দোকানে অবস্থান এবং বিভিন্ন জায়গায় মোটরসাইকেলে ঘোরাঘুরির তথ্য মিলেছে। এ ঘটনায় জেরিকাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে জেরিকা তাসনিম দিশার পরিচয় হিসেবে তার বাবার নাম দিদারুল আলম দিদার এবং মায়ের নাম জেসমিন আক্তার উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাসা রাজধানীর কাফরুল থানার ইব্রাহিমপুরের মমিন সরণিতে।
নেস্ট বারের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্তোঁরা ও বারের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে যান তাহসিফ ও তার বান্ধবী। অন্য একটি মোটরসাইকেলে ছিলেন দীপ।
রেস্টুরেন্টের আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও তার বান্ধবী লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর সাদা হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছান দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাদের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান তারা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেস্টুরেন্ট থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফের বান্ধবীকে তার বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাহসিফ ও দীপ যান টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায়। ওই এলাকায় তাদের অবস্থান ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সূত্র খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
বারের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালবেলাকে জানিয়েছে, নেস্ট বারে লাইসেন্স ছাড়া প্রবেশ ও মদপানের সুযোগ নেই। নেস্ট বারে প্রবেশের পরে তাহসিফ সাউরি তার মদপানের লাইসেন্স দেখান। তবে সেদিন তিনি মদ পান করেননি। তিনজনে মিলে রাতের খাবার খেয়েছেন। পরে তারা সেখান থেকে চলে যান।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল থেকে বিভিন্ন সংস্থা বারের সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে আসে। কয়েকটি সংস্থা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চলে গেলেও তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সিসিটিভি ক্যামেরার ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার (ডিভিআর) নিয়ে গেছেন। বার থেকে তদন্তের প্রয়োজনে দুটি ডিভিআর নেওয়া হয়েছে।
তদন্তের অংশ হিসেবে ওই রাতে বিভিন্ন স্থানে তাহসিফের অবস্থান, তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে নতুন পাওয়া ফুটেজের বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ দিকে তাহসিফের রহস্যঘেরা মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। শনিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দীপের বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপ জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত অব্যাহত। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন। আসামি জামিনে মুক্তি পেলে পলাতক হয়ে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তার করার জন্য সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা প্রয়োজন।
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। শুক্রবার রাতে তাকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং শুক্রবার রাতেই তাহসিফের বাবার করা হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
উল্লেখ্য, ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। এর আগের দিন ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় আসামি দীপের ডাকে বাসার নিচে নামেন এবং নিজের বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যান।
দীপ আটকের পর বলেছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। তার দেওয়া তথ্যেই গত ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকারও করেন দীপ। একপর্যায়ে তাকে নিয়ে টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
Reporter Name 




















