ঢাকা ০২:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া বাসায় মাদক পার্টি, আটক ৮৫ জনের কারাদণ্ড সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে হবে : শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, আমরা সবাই বাংলাদেশি : প্রধানমন্ত্রী জানাল জেদ্দা কনস্যুলেট পৃথক অভিযোগে সৌদির কারাগারে ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নজরুল-সুইটি হাজারো ডিসেম্বর আসবে, কিন্তু শেখ হাসিনা আসবে না ৩৮ হাজার আখচাষিকে প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য নয়, সবার পরিচয় বাংলাদেশি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নভেম্বর থেকে ঢাকায় নতুন নিয়ম, এক রুটে চলবে এক কোম্পানির বাস ইয়েমেনে হুথিদের হামলায় নিহত ৭৩ বেগম খালেদা জিয়া আইএইচএফ নেশন্স ট্রফির ফাইনালে বাংলাদেশ ও ভারত

নভেম্বর থেকে ঢাকায় নতুন নিয়ম, এক রুটে চলবে এক কোম্পানির বাস

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:১১:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১০ বার

রাজধানীর সড়কে একই পথে একাধিক কোম্পানির বাসের প্রতিযোগিতা, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার চিত্র দীর্ঘদিনের। এসব অনিয়মের কারণে যানজটের পাশাপাশি গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলাও বেড়েছে। পরিস্থিতি বদলাতে এবার ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতিতে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে রাজধানীর ছয়টি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিষেবা।

নতুন ব্যবস্থায় একই রুটে একাধিক কোম্পানির পরিবহনের পরিবর্তে একটি কোম্পানির অধীনে সমন্বিতভাবে বাস পরিচালনা করা হবে। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি নন-এসি ও একটি এসি রুটে এই কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সাধারণ বাস রুট ছয়টি এবং সার্কুলার রুট তিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে। সার্কুলার রুটে বাস চালু হতে আরও দুই মাস সময় লাগবে। এসব রুটে নতুন বাস দিয়ে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) গত ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগরীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন বিষয়ক বৈঠকের নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে বাসের রুট, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বাসের সংখ্যা ও স্টপেজ নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হয় গত ১৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে।

ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর থেকে সাধারণ ছয়টি রুটে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ভিত্তিতে বাস চলাচল শুরু হবে। সার্কুলার বাস চালু হতে আরও দুই মাস সময় লাগবে। এসব রুটে নতুন বাস দিয়ে সেবা দেওয়া হবে।

কোন রুটে কোন কোম্পানি

প্রথম পর্যায়ে প্রস্তাবিত ৩২টি প্রধান বাস রুটের মধ্যে ছয়টি এবং ২৫টি সার্কুলার রুটের মধ্যে পাঁচটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রাথমিক তালিকায় ছয়টি সাধারণ বাস রুট ছিল– গাজীপুর চৌরাস্তা-ঢাকেশ্বরী মন্দির, গাবতলী-ডেমরা, দুয়ারীপাড়া-সদরঘাট, ঘাটারচর-ডেমরা, ঘাটারচর-কাঁচপুর এবং মিরপুর-১২-মাওয়া।

এ ছাড়া পাঁচটি প্রধান সার্কুলার বাস রুট ছিল– ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুর-পলাশী, কদম চত্বর-পঞ্চবটি, গুলশান-২-আমতলী এবং গুলশান-১-আমতলী। তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সাধারণ রুট ছয়টি এবং সার্কুলার রুট তিনটি রাখা হয়েছে।

গাজীপুর চৌরাস্তা-ঢাকেশ্বরী মন্দির : শিববাড়ী থেকে টঙ্গী, বিমানবন্দর, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নিউমার্কেট হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ভিআইপি পরিবহন ও বিকাশ পরিবহনের বাস ‘ভি.আই.পি পরিবহন’ কোম্পানির আওতায় পরিচালিত হবে। বাসের সংখ্যা ২৫৩টি।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে ঢাকার ছয়টি সাধারণ বাস রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা। নতুন নিয়মে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের পরিবর্তে একটি কোম্পানির অধীনে সমন্বিতভাবে বাস চলবে। এর লক্ষ্য একই সড়কে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও বিশৃঙ্খলা কমানো। তবে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো এবং নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

মিরপুর-কেরানীগঞ্জ : চিড়িয়াখানা, মিরপুর-১, কল্যাণপুর, কলাবাগান, শাহবাগ, জিরো পয়েন্ট ও বাবুবাজার হয়ে বাস চলবে। এ রুটে দিশারী পরিবহন, তানজিল পরিবহন ও মেট্রো লিংক ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ কোম্পানির আওতায় চলবে। বাসের সংখ্যা ১৩৩টি।

ঘাটারচর-ডেমরা : মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, মৎস্য ভবন, রাজমনি, মৌচাক, রামপুরা ও বনশ্রী হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ‘রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ’ কোম্পানির অধীনে ৭০টি বাস পরিচালিত হবে।

ঘাটারচর-কাঁচপুর : মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শাহবাগ, পল্টন, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড হয়ে বাস চলবে। এ রুটে রজনীগন্ধ্যা পরিবহন, মালঞ্চ পরিবহন, সময় পরিবহন ও মিডলাইন পরিবহনের বাস ‘ফোর স্টার বাস লাইন’ কোম্পানির আওতায় চলবে। বাসের সংখ্যা ১৫০টি।

ঘাটারচর-ধউর : মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কালশী, বিমানবন্দর ও আব্দুল্লাহপুর হয়ে বাস চলবে। এ রুটে পরিস্থান পরিবহন ও প্রজাপতি পরিবহনের বাস ‘পিএনপি সিটি সার্ভিস’ কোম্পানির আওতায় পরিচালিত হবে। বাসের সংখ্যা ১৯০টি।

টঙ্গী-ঢাকেশ্বরী : কলেজগেট, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, ফার্মগেট, আসাদগেট, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির অধীনে ২০টি বাস চলাচল করবে।

সার্কুলার তিন রুট

সর্বশেষ পরিকল্পনায় তিনটি সার্কুলার বাস রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব রুটে নির্দিষ্ট পথে বাস চালিয়ে বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফার্মগেট-পলাশী : পান্থপথ সিগন্যাল, সেন্ট্রাল রোড, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুর হয়ে বাস চলাচল করবে। এ রুটে ‘ঢাকা চাকা’ বাস কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে। বাসের সংখ্যা ২০টি।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড-পলাশী : আসাদগেট, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, পলাশী, নিউমার্কেট, জিগাতলা ও শংকর হয়ে বাস মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাবে। এ রুটেও ‘ঢাকা চাকা’ বাস কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে। বাসের সংখ্যা ২০টি।

কদম চত্বর-পঞ্চবটি : জমজম টাওয়ার, হাউজ বিল্ডিং, সুইচ গেট, কামারপাড়া, খালপাড়, মেট্রোরেল ডিপো, নর্থ স্টেশন ও সেন্ট্রাল স্টেশন হয়ে বাস পঞ্চবটিতে পৌঁছাবে। এ রুটে ‘উত্তরা চাকা’ বাস কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে। বাসের সংখ্যা ২০টি।

এ ব্যবস্থায় যানজট তেমন কমবে না, প্রয়োজন আরও যেসব উদ্যোগ

নতুন ব্যবস্থায় শুধু বাস পরিচালনা নয়, স্টপেজ ও সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিএমপি ও দুই সিটি করপোরেশনকে বাসস্টপেজ চিহ্নিত করা, টিকিট কাউন্টার স্থাপন, ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৮ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিটিসিএ।

তবে শুধু রুট নির্ধারণ বা কোম্পানি গঠন করলেই যানজট কমবে না। নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো, পরিবহন কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সড়কে আইন প্রয়োগ এবং যাত্রীদের জন্য সুশৃঙ্খল সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১ নভেম্বর ছয়টি সাধারণ রুটে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হবে।

‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বাসস্টপেজ নির্ধারণ, টিকিট কাউন্টার স্থাপন ও ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা সরানো এবং বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে অভিযানও পরিকল্পনার অংশ। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোম্পানি নির্ধারণ করলেই যানজট কমবে না; নির্ধারিত রুটে অন্য বাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কে আইন প্রয়োগও প্রয়োজন। বাস চলাচলে সিগন্যালে অগ্রাধিকারসহ সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে নতুন ব্যবস্থার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

ডিটিসিএর বৈঠকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, মহানগরীতে বাস চলাচলে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১১ অক্টোবর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সহায়তায় ১৭টি স্থানে অবৈধ ও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এতে ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে আইন অমান্যকারী বাসচালক ও পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এসব স্থানে সপ্তাহে সাত দিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখনো সব বাসস্টপেজ নির্ধারণ ও নির্মাণ সম্পন্ন করেনি। তবে যেসব স্থানে বাসস্টপেজ রয়েছে, সেখানেও বাস না থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। স্টপেজ ছাড়া অন্য কোথাও বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তত্ত্বাবধানে ডিএমপি, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বয়ে নির্ধারিত রুটগুলোতে ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতিতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যক্রম সফল করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব মালিক ও শ্রমিক সহযোগিতা করবেন।

তিনি বলেন, একটি রুটে শুধু একটি কোম্পানির বাস চলবে, অন্য কোনো কোম্পানির বাস চলবে না। এতে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বাস পরিচালনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সড়কে বাসের মধ্যে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা এবং একে অপরকে পেছনে ফেলার প্রবণতা কমাতে রুটভিত্তিক বাস পরিচালনা জরুরি। একবারে সব রুটে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে সব রুটকে এর আওতায় আনার চেষ্টা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালু করলেই যানজট কমবে না। এজন্য নির্ধারিত রুটে অন্য বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাস চলাচলে সিগন্যালে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নিতে হবে। যানজট কমাতে এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া বাসায় মাদক পার্টি, আটক ৮৫ জনের কারাদণ্ড

নভেম্বর থেকে ঢাকায় নতুন নিয়ম, এক রুটে চলবে এক কোম্পানির বাস

আপডেট টাইম : ১২:১১:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানীর সড়কে একই পথে একাধিক কোম্পানির বাসের প্রতিযোগিতা, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং নির্ধারিত স্টপেজ না মানার চিত্র দীর্ঘদিনের। এসব অনিয়মের কারণে যানজটের পাশাপাশি গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলাও বেড়েছে। পরিস্থিতি বদলাতে এবার ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ নীতিতে বাস পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে রাজধানীর ছয়টি রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিষেবা।

নতুন ব্যবস্থায় একই রুটে একাধিক কোম্পানির পরিবহনের পরিবর্তে একটি কোম্পানির অধীনে সমন্বিতভাবে বাস পরিচালনা করা হবে। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি নন-এসি ও একটি এসি রুটে এই কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সাধারণ বাস রুট ছয়টি এবং সার্কুলার রুট তিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে। সার্কুলার রুটে বাস চালু হতে আরও দুই মাস সময় লাগবে। এসব রুটে নতুন বাস দিয়ে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) গত ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঢাকা মহানগরীতে বাস রুট রেশনালাইজেশন বিষয়ক বৈঠকের নথি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে বাসের রুট, পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, বাসের সংখ্যা ও স্টপেজ নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হয় গত ১৮ অক্টোবর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে।

ডিটিসিএর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার ধ্রুব আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর থেকে সাধারণ ছয়টি রুটে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ভিত্তিতে বাস চলাচল শুরু হবে। সার্কুলার বাস চালু হতে আরও দুই মাস সময় লাগবে। এসব রুটে নতুন বাস দিয়ে সেবা দেওয়া হবে।

কোন রুটে কোন কোম্পানি

প্রথম পর্যায়ে প্রস্তাবিত ৩২টি প্রধান বাস রুটের মধ্যে ছয়টি এবং ২৫টি সার্কুলার রুটের মধ্যে পাঁচটি রুট চিহ্নিত করা হয়েছিল। প্রাথমিক তালিকায় ছয়টি সাধারণ বাস রুট ছিল– গাজীপুর চৌরাস্তা-ঢাকেশ্বরী মন্দির, গাবতলী-ডেমরা, দুয়ারীপাড়া-সদরঘাট, ঘাটারচর-ডেমরা, ঘাটারচর-কাঁচপুর এবং মিরপুর-১২-মাওয়া।

এ ছাড়া পাঁচটি প্রধান সার্কুলার বাস রুট ছিল– ফার্মগেট-পলাশী, মোহাম্মদপুর-পলাশী, কদম চত্বর-পঞ্চবটি, গুলশান-২-আমতলী এবং গুলশান-১-আমতলী। তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে সাধারণ রুট ছয়টি এবং সার্কুলার রুট তিনটি রাখা হয়েছে।

গাজীপুর চৌরাস্তা-ঢাকেশ্বরী মন্দির : শিববাড়ী থেকে টঙ্গী, বিমানবন্দর, মহাখালী, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও নিউমার্কেট হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ভিআইপি পরিবহন ও বিকাশ পরিবহনের বাস ‘ভি.আই.পি পরিবহন’ কোম্পানির আওতায় পরিচালিত হবে। বাসের সংখ্যা ২৫৩টি।

আগামী ১ নভেম্বর থেকে ঢাকার ছয়টি সাধারণ বাস রুটে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা। নতুন নিয়মে একই রুটে একাধিক কোম্পানির বাসের পরিবর্তে একটি কোম্পানির অধীনে সমন্বিতভাবে বাস চলবে। এর লক্ষ্য একই সড়কে বাসের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা ও বিশৃঙ্খলা কমানো। তবে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করতে নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো এবং নিয়ম ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

মিরপুর-কেরানীগঞ্জ : চিড়িয়াখানা, মিরপুর-১, কল্যাণপুর, কলাবাগান, শাহবাগ, জিরো পয়েন্ট ও বাবুবাজার হয়ে বাস চলবে। এ রুটে দিশারী পরিবহন, তানজিল পরিবহন ও মেট্রো লিংক ‘চিড়িয়াখানা সিটি বাস’ কোম্পানির আওতায় চলবে। বাসের সংখ্যা ১৩৩টি।

ঘাটারচর-ডেমরা : মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, মৎস্য ভবন, রাজমনি, মৌচাক, রামপুরা ও বনশ্রী হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ‘রমজান আলী এন্টারপ্রাইজ’ কোম্পানির অধীনে ৭০টি বাস পরিচালিত হবে।

ঘাটারচর-কাঁচপুর : মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, শাহবাগ, পল্টন, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার, মাতুয়াইল ও সাইনবোর্ড হয়ে বাস চলবে। এ রুটে রজনীগন্ধ্যা পরিবহন, মালঞ্চ পরিবহন, সময় পরিবহন ও মিডলাইন পরিবহনের বাস ‘ফোর স্টার বাস লাইন’ কোম্পানির আওতায় চলবে। বাসের সংখ্যা ১৫০টি।

ঘাটারচর-ধউর : মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, টেকনিক্যাল, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, কালশী, বিমানবন্দর ও আব্দুল্লাহপুর হয়ে বাস চলবে। এ রুটে পরিস্থান পরিবহন ও প্রজাপতি পরিবহনের বাস ‘পিএনপি সিটি সার্ভিস’ কোম্পানির আওতায় পরিচালিত হবে। বাসের সংখ্যা ১৯০টি।

টঙ্গী-ঢাকেশ্বরী : কলেজগেট, আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, এক্সপ্রেসওয়ে, ফার্মগেট, আসাদগেট, সায়েন্স ল্যাব ও আজিমপুর হয়ে বাস চলবে। এ রুটে ‘ঢাকা চাকা’ কোম্পানির অধীনে ২০টি বাস চলাচল করবে।

সার্কুলার তিন রুট

সর্বশেষ পরিকল্পনায় তিনটি সার্কুলার বাস রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব রুটে নির্দিষ্ট পথে বাস চালিয়ে বিভিন্ন এলাকার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফার্মগেট-পলাশী : পান্থপথ সিগন্যাল, সেন্ট্রাল রোড, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট ও আজিমপুর হয়ে বাস চলাচল করবে। এ রুটে ‘ঢাকা চাকা’ বাস কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে। বাসের সংখ্যা ২০টি।

মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড-পলাশী : আসাদগেট, ধানমন্ডি-২৭, কলাবাগান, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, পলাশী, নিউমার্কেট, জিগাতলা ও শংকর হয়ে বাস মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাবে। এ রুটেও ‘ঢাকা চাকা’ বাস কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে। বাসের সংখ্যা ২০টি।

কদম চত্বর-পঞ্চবটি : জমজম টাওয়ার, হাউজ বিল্ডিং, সুইচ গেট, কামারপাড়া, খালপাড়, মেট্রোরেল ডিপো, নর্থ স্টেশন ও সেন্ট্রাল স্টেশন হয়ে বাস পঞ্চবটিতে পৌঁছাবে। এ রুটে ‘উত্তরা চাকা’ বাস কোম্পানি অনুমোদন পেয়েছে। বাসের সংখ্যা ২০টি।

এ ব্যবস্থায় যানজট তেমন কমবে না, প্রয়োজন আরও যেসব উদ্যোগ

নতুন ব্যবস্থায় শুধু বাস পরিচালনা নয়, স্টপেজ ও সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডিএমপি ও দুই সিটি করপোরেশনকে বাসস্টপেজ চিহ্নিত করা, টিকিট কাউন্টার স্থাপন, ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৮ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিটিসিএ।

তবে শুধু রুট নির্ধারণ বা কোম্পানি গঠন করলেই যানজট কমবে না। নির্ধারিত স্টপেজে বাস থামানো, পরিবহন কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সড়কে আইন প্রয়োগ এবং যাত্রীদের জন্য সুশৃঙ্খল সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১ নভেম্বর ছয়টি সাধারণ রুটে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ শুরু হবে।

‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি বাসস্টপেজ নির্ধারণ, টিকিট কাউন্টার স্থাপন ও ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা সরানো এবং বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে অভিযানও পরিকল্পনার অংশ। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোম্পানি নির্ধারণ করলেই যানজট কমবে না; নির্ধারিত রুটে অন্য বাসের চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কে আইন প্রয়োগও প্রয়োজন। বাস চলাচলে সিগন্যালে অগ্রাধিকারসহ সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে নতুন ব্যবস্থার সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

ডিটিসিএর বৈঠকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল আলম বলেন, মহানগরীতে বাস চলাচলে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১১ অক্টোবর থেকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন যৌথভাবে অভিযান শুরু করেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সহায়তায় ১৭টি স্থানে অবৈধ ও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচলকারী বাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এতে ট্রাফিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে আইন অমান্যকারী বাসচালক ও পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এসব স্থানে সপ্তাহে সাত দিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখনো সব বাসস্টপেজ নির্ধারণ ও নির্মাণ সম্পন্ন করেনি। তবে যেসব স্থানে বাসস্টপেজ রয়েছে, সেখানেও বাস না থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। স্টপেজ ছাড়া অন্য কোথাও বাস থামানো ও যাত্রী ওঠানামা বন্ধের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী ও পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তত্ত্বাবধানে ডিএমপি, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বয়ে নির্ধারিত রুটগুলোতে ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতিতে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কার্যক্রম সফল করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সব মালিক ও শ্রমিক সহযোগিতা করবেন।

তিনি বলেন, একটি রুটে শুধু একটি কোম্পানির বাস চলবে, অন্য কোনো কোম্পানির বাস চলবে না। এতে সড়কে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বাস পরিচালনায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। একই সড়কে বাসের মধ্যে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা এবং একে অপরকে পেছনে ফেলার প্রবণতা কমাতে রুটভিত্তিক বাস পরিচালনা জরুরি। একবারে সব রুটে এ ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে সব রুটকে এর আওতায় আনার চেষ্টা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু ‘এক রুট, এক কোম্পানি’ ব্যবস্থা চালু করলেই যানজট কমবে না। এজন্য নির্ধারিত রুটে অন্য বাস চলাচল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অন্যান্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাস চলাচলে সিগন্যালে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নিতে হবে। যানজট কমাতে এসব উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।