ঢাকা ১২:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
হামলা-দখল-চাঁদাবাজি থামবে কিভাবে: রাজনীতিতে ভিন্নতা থাকলেও অপরাধ মিলেমিশে আইটি ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘লগইন ইনটু ইন্ডাস্ট্রি নেক্সট’ টানা পাঁচদিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অটোরিকশায় রক্তাক্ত মহাসড়ক গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের অধিকার সুরক্ষার তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর কবর দেওয়ার কত দিন পর একই কবরে দাফন করা যাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই: ডেপুটি স্পিকার ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী নতুন দায়িত্ব পেলেন সারজিস-আসিফ-মিতু

রেলের গতি বাড়াতে আসছে ৩০ ইঞ্জিন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৫৩:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • ৪ বার

নিরাপদ ভ্রমণের জন্য যাত্রীদের প্রথম পছন্দ ট্রেনযাত্রা। পণ্য পরিবহনেও ভরসার নাম রেলওয়ে। এসব কারণে রেলের গতি বাড়াতে এবং রেলসেবাকে আরও জনকল্যাণমুখী করতে নানান উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এরই অংশ হিসেবে রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্য ও আন্তঃনগর যাত্রী পরিবহনের চাহিদা পূরণে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংগ্রহ করা হবে। প্রতিটির দাম পড়বে ৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩০টি লোকোমোটিভ কিনতে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৭০ কোটি টাকা।

তবে এসব রেলইঞ্জিন কেনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা কোম্পানির কথা উল্লেখ নেই। ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে এসব ইঞ্জিন কেনা হবে।

চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ প্রকল্পের আওতায় এগুলো কেনা হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) দেবে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, যাত্রী, পার্সেল এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়কপথের তুলনায় রেলপথে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় নিরাপদ ও দ্রুত আন্তঃনগর যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা বজায় রাখার লক্ষ্যে রেলখাতের উন্নয়ন অপরিহার্য। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত আধুনিক ও উপযুক্ত মানের মিটারগেজ লোকোমোটিভ (রেলইঞ্জিন) সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

মেকানিক্যাল কোড-ম্যানুয়েল অনুযায়ী, একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর। বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে ব্যবহৃত ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রস্তাবিত ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্য ও আন্তঃনগর যাত্রী পরিবহনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও জানায়, রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় ২০৫৫-৬০ সাল পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা করতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য প্রস্তাবিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য

পুরোনো এবং জরাজীর্ণ লোকোমোটিভ প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ এবং প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রাংশ এবং সরঞ্জাম সংগ্রহ; উন্নত ট্রেন পরিষেবার জন্য আধুনিক, নিরাপদ লোকোমোটিভ সরবরাহ; বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা বৃদ্ধিকরণ; যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন উভয় ক্ষেত্রে বর্ধিত ট্রাফিক চাহিদা পূরণ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অর্জন বা জ্ঞান স্থানান্তর করা।

প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে মোট ২৯২টি লোকোমোটিভ রয়েছে (১৬৪টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ)। মেকানিক্যাল কোড-ম্যানুয়েল অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর। বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

এছাড়া ৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে, যা এখনো ট্রেন চালনায় ব্যবহৃত হয়। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং নির্ভরযোগ্যতা কম।

প্রস্তাবিত ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্য ও আন্তঃনগর যাত্রী পরিবহনের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে ট্রেন পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চলাচলরত পুরোনো লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ কঠিন ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে লোকোমোটিভগুলো দীর্ঘসময় ধরে অচল বা পরিষেবার বাইরে পড়ে থাকে। মিটারগেজ ট্রেন সময়ানুবর্তিতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভগুলো অবিলম্বে প্রতিস্থাপন করা জরুরি। অন্যথায় লোকোমোটিভের অভাবে বেশকিছু ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভগুলো ৩০ বছর সেবা দেওয়ার পর প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন হয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৭৯টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ যেগুলো ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সার্ভিসে রয়েছে সেগুলো অবিলম্বে প্রতিস্থাপন করা জরুরি।

রেলওয়ে জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ের সেকশনাল ক্যাপাসিটি এবং যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। সার্বিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে ট্রেনের পরিচালন নিশ্চিতকরণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসহ ব্যয় হ্রাস পাবে এবং পরিবহন সক্ষমতা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমসমূহ

৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ; লোকোমোটিভগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল ও কনজুমেবল স্পেয়ার্স, টুলস এবং ইক্যুইপমেন্ট সরবরাহ; বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী ও সুপারভাইজারদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৌশল জ্ঞানের হস্তান্তর; প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি বিশেষজ্ঞদলের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন কর্মীদের স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে কারিগরি সেবা প্রদান।

প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের যৌক্তিকতা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে দেশের পরিবহন খাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মার্কেট শেয়ার কম। ফলে সড়ক ও মহাসড়কের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে যদি পরিবহন খাতে তার মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি করতে পারে, তবে সরকার সড়ক পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবে।

তবে এক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমানে ডিজেল লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথ বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত মিটারগেজ রেল করিডোর। বর্তমান সড়ক ও রেলপথের সক্ষমতা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

বিদ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে এবং প্রতি ট্রেনের পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই অঞ্চলে পরিবহন খাতের উন্নয়নের ফলে স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে। এসব কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্ণিত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মিটারগেজ সেকশন নির্বাচন করা হয়েছে।

প্রকল্পের বিষয়ে, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান (রেল পরিবহন) মো. নাজমুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় কমবে, পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন ব্যয় কমবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।’

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই অঞ্চলে পরিবহন খাতের উন্নয়নের ফলে স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে বলেও জানান মো. নাজমুল হাসান।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রেলওয়েতে যাত্রী-পণ্য সেবা বৃদ্ধি করতেই প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে এআইআইবি’র ঋণে। প্রকল্পটি অনুমোদনের পরেই ক্রয় সংক্রান্ত বিষয় চূড়ান্ত হবে।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

হামলা-দখল-চাঁদাবাজি থামবে কিভাবে: রাজনীতিতে ভিন্নতা থাকলেও অপরাধ মিলেমিশে

রেলের গতি বাড়াতে আসছে ৩০ ইঞ্জিন

আপডেট টাইম : ১০:৫৩:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

নিরাপদ ভ্রমণের জন্য যাত্রীদের প্রথম পছন্দ ট্রেনযাত্রা। পণ্য পরিবহনেও ভরসার নাম রেলওয়ে। এসব কারণে রেলের গতি বাড়াতে এবং রেলসেবাকে আরও জনকল্যাণমুখী করতে নানান উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

এরই অংশ হিসেবে রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্য ও আন্তঃনগর যাত্রী পরিবহনের চাহিদা পূরণে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) সংগ্রহ করা হবে। প্রতিটির দাম পড়বে ৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩০টি লোকোমোটিভ কিনতে মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৭০ কোটি টাকা।

তবে এসব রেলইঞ্জিন কেনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা কোম্পানির কথা উল্লেখ নেই। ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে এসব ইঞ্জিন কেনা হবে।

চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি বুধবার (৭ অক্টোবর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ প্রকল্পের আওতায় এগুলো কেনা হবে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ হিসেবে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) দেবে ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, যাত্রী, পার্সেল এবং পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়কপথের তুলনায় রেলপথে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় নিরাপদ ও দ্রুত আন্তঃনগর যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা বজায় রাখার লক্ষ্যে রেলখাতের উন্নয়ন অপরিহার্য। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মূলত আধুনিক ও উপযুক্ত মানের মিটারগেজ লোকোমোটিভ (রেলইঞ্জিন) সংগ্রহের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

মেকানিক্যাল কোড-ম্যানুয়েল অনুযায়ী, একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর। বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে ব্যবহৃত ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু এরই মধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রস্তাবিত ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্য ও আন্তঃনগর যাত্রী পরিবহনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও জানায়, রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের কাজ বিলম্বিত হওয়ায় ২০৫৫-৬০ সাল পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা করতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য প্রস্তাবিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য

পুরোনো এবং জরাজীর্ণ লোকোমোটিভ প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ এবং প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রাংশ এবং সরঞ্জাম সংগ্রহ; উন্নত ট্রেন পরিষেবার জন্য আধুনিক, নিরাপদ লোকোমোটিভ সরবরাহ; বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা বৃদ্ধিকরণ; যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন উভয় ক্ষেত্রে বর্ধিত ট্রাফিক চাহিদা পূরণ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অর্জন বা জ্ঞান স্থানান্তর করা।

প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে মোট ২৯২টি লোকোমোটিভ রয়েছে (১৬৪টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ)। মেকানিক্যাল কোড-ম্যানুয়েল অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর। বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু এরই মধ্যে শেষ হয়েছে।

এছাড়া ৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছরের ঊর্ধ্বে, যা এখনো ট্রেন চালনায় ব্যবহৃত হয়। এসব মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং নির্ভরযোগ্যতা কম।

প্রস্তাবিত ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে দ্রুত বর্ধনশীল পণ্য ও আন্তঃনগর যাত্রী পরিবহনের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে ট্রেন পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চলাচলরত পুরোনো লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ কঠিন ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে লোকোমোটিভগুলো দীর্ঘসময় ধরে অচল বা পরিষেবার বাইরে পড়ে থাকে। মিটারগেজ ট্রেন সময়ানুবর্তিতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভগুলো অবিলম্বে প্রতিস্থাপন করা জরুরি। অন্যথায় লোকোমোটিভের অভাবে বেশকিছু ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভগুলো ৩০ বছর সেবা দেওয়ার পর প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন হয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৭৯টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ যেগুলো ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সার্ভিসে রয়েছে সেগুলো অবিলম্বে প্রতিস্থাপন করা জরুরি।

রেলওয়ে জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রেলওয়ের সেকশনাল ক্যাপাসিটি এবং যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। সার্বিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে ট্রেনের পরিচালন নিশ্চিতকরণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণসহ ব্যয় হ্রাস পাবে এবং পরিবহন সক্ষমতা ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমসমূহ

৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ; লোকোমোটিভগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল ও কনজুমেবল স্পেয়ার্স, টুলস এবং ইক্যুইপমেন্ট সরবরাহ; বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী ও সুপারভাইজারদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৌশল জ্ঞানের হস্তান্তর; প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি বিশেষজ্ঞদলের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন কর্মীদের স্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রদান এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে কারিগরি সেবা প্রদান।

প্রকল্প এলাকা নির্বাচনের যৌক্তিকতা

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এখানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। বর্তমানে দেশের পরিবহন খাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মার্কেট শেয়ার কম। ফলে সড়ক ও মহাসড়কের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে যদি পরিবহন খাতে তার মার্কেট শেয়ার বৃদ্ধি করতে পারে, তবে সরকার সড়ক পরিবহন খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ব্যয় সাশ্রয় করতে পারবে।

তবে এক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্তমানে ডিজেল লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথ বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত মিটারগেজ রেল করিডোর। বর্তমান সড়ক ও রেলপথের সক্ষমতা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।

বিদ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় ও ব্যয় হ্রাস পাবে এবং প্রতি ট্রেনের পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই অঞ্চলে পরিবহন খাতের উন্নয়নের ফলে স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে। এসব কারণে বাংলাদেশ রেলওয়ের বর্ণিত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মিটারগেজ সেকশন নির্বাচন করা হয়েছে।

প্রকল্পের বিষয়ে, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান (রেল পরিবহন) মো. নাজমুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হবে। সেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় কমবে, পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিবহন ব্যয় কমবে। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ে দ্রুততর, অধিক সাশ্রয়ী ও অধিক সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা সড়ক পরিবহনের ওপর বিদ্যমান চাপ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়তা করবে।’

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এই অঞ্চলে পরিবহন খাতের উন্নয়নের ফলে স্থানীয় জনগণের জীবনমানের উন্নতি ঘটবে বলেও জানান মো. নাজমুল হাসান।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রেলওয়েতে যাত্রী-পণ্য সেবা বৃদ্ধি করতেই প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে এআইআইবি’র ঋণে। প্রকল্পটি অনুমোদনের পরেই ক্রয় সংক্রান্ত বিষয় চূড়ান্ত হবে।’