ভবনজুড়ে জরাজীর্ণতার ছাপ, নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ—অফিসে নেই প্রয়োজনীয় জনবল
উদ্বোধনের প্রায় দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি কিশোরগঞ্জের হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ে। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, জলাভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে নির্মিত সরকারি এই কার্যালয়টি এখন নিজেই সংকটে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কার্যক্রম প্রায় অচল; দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ভবন ও স্থাপনা।
কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব তারাপাশা এলাকায় প্রায় ৬৫ শতাংশ জায়গার ওপর নির্মিত এ কার্যালয়ে রয়েছে আটটি অফিস কক্ষ এবং কর্মকর্তাদের জন্য ছয়টি কোয়ার্টার। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন। এর মধ্যে নিয়মিত অফিসে দায়িত্ব পালন করছেন মূলত একজন নিরাপত্তা প্রহরী। কার্যালয়ের দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক ঢাকায় অবস্থান করে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় আঞ্চলিক দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
ভবনের করুণ দশা
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। টিনের চালের বিভিন্ন অংশও নষ্ট হয়ে পড়েছে। ভবনের দেয়াল ও আশপাশে জন্মেছে আগাছা-লতাপাতা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অফিস কক্ষের চেয়ার-টেবিলসহ মূল্যবান আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
অরক্ষিত ভবনের ভেতর ও আশপাশে অবাধে ছাগলের বিচরণও দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একসময় হাওর উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা থাকলেও এখন স্থাপনাটি অনেকটা পরিত্যক্ত ভবনের রূপ নিয়েছে।
‘শুধু নামেই আঞ্চলিক কার্যালয়’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আজাদ বলেন, হাওরের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও হাওরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি গবেষণার জন্যও এই কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারী না থাকায় এর কোনো কার্যকর কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না। এত বড় স্থাপনা নির্মাণের পরও যদি কার্যক্রমই না থাকে, তাহলে এর সুফল মানুষ পাবে কীভাবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কিশোরগঞ্জের ছয়টি উপজেলা হাওরাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। অথচ বছরের পর বছর ধরে এই আঞ্চলিক কার্যালয়ের কার্যক্রম সাধারণ মানুষের চোখে পড়ছে না। এটি এখন অনেকটাই ‘শুধু নামেই আঞ্চলিক অফিস’ হয়ে আছে।
তিনি বলেন, ভবনটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভেতরে থাকা সরকারি মালামালও নষ্ট হচ্ছে। এমনকি জায়গাটি এখন ছাগল বিচরণের স্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত সংস্কার ও কার্যক্রম চালু না করলে সরকারি সম্পদের আরও ক্ষতি হবে।
হাওরের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা চান আন্দোলনকারীরা
হাওর রক্ষা আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক এনামুল হক ইদ্রিস বলেন, দেশের বোরো ধান উৎপাদনে হাওরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। হাওরের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও জলাভূমি রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই কিশোরগঞ্জে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কার্যালয়টি হাওরের উন্নয়নে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের পাশাপাশি কার্যালয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করে হাওরকেন্দ্রিক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন অরক্ষিত পড়ে থাকায় কার্যালয়টি নেশাগ্রস্তদের আড্ডাস্থলেও পরিণত হয়েছে। এতে সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংস্কারের উদ্যোগ, আশ্বাস জনবল নিয়োগের
কিশোরগঞ্জ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা উপ-পরিচালক মোহাম্মদ তানভীরুল হক বলেন, তিনি বর্তমানে কার্যালয়টির অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। জরুরি কোনো প্রয়োজন হলে সেখানে যেতে হয়। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কার্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি জানান, ভবনটি সংস্কারের জন্য ইতোমধ্যে বরাদ্দ পাওয়া গেছে। অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রকৌশলী না থাকায় কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং ভবন সংস্কারের মাধ্যমে আঞ্চলিক কার্যালয়টির কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাওরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু সংস্কার কিংবা জনবল নিয়োগের আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে এই আঞ্চলিক কার্যালয়কে সচল করা হবে। কারণ, হাওরের উন্নয়নের জন্য নির্মিত একটি সরকারি কার্যালয় যদি দুই দশকেও কার্যকরভাবে চালু না হয়, তাহলে এর সুফল থেকে বঞ্চিত হবে হাওরাঞ্চলের মানুষই।
Reporter Name 
























