দেশ পরিচালনা করা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অফিস করার মতো কোনো কাজ নয়। গভীর রাতের বৈঠক, ভোরের ব্রিফিং, জরুরি পরিস্থিতি, সভা, বক্তৃতা ও নিয়মিত বিদেশ সফর মিলিয়ে বিশ্বনেতাদের কর্মসূচি প্রায়ই চলে ঘড়ির কাঁটার বাইরে। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যে বিশ্বনেতারা আসলে কত ঘণ্টা ঘুমান?
বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের এক প্রতিবেদনে বিশ্বের কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতার ঘুমের অভ্যাস তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ঘুমের অভ্যাস নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জুলাইয়ে এক সরকারি ছুটির দিনে একটানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পেরে তিনি সেটিকে বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সাধারণত রাতে শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়েছেন তিনি।

তাকাইচির এই মন্তব্য জাপানে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশটিতে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুর ঘটনা কয়েক দশক ধরে বড় সামাজিক সমস্যা। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কম ঘুম কি সত্যিই রাজনৈতিক নেতাদের কর্মদক্ষতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ, নাকি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত ঘুম তাদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
ডোনাল্ড ট্রাম্প: ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে স্বল্প ঘুমানো ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে আসছেন। ২০১৭ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রায়ই রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান।

সে সময় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প সাধারণত মধ্যরাত বা রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতেন এবং ভোর ৫টার দিকে ঘুম থেকে উঠতেন।
নরেন্দ্র মোদি: ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও দীর্ঘদিন ধরে কম ঘুমানোর কথা বলে আসছেন।

২০১৯ সালে অভিনেতা অক্ষয় কুমারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের ঘুমের অভ্যাসের কথা জানান মোদি। তিনি বলেন, তার শারীরিক চক্র এমন যে সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমান এবং ওই সময় গভীর ঘুমে থাকেন।
ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ: ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁরও কম ঘুমানোর অভ্যাসের কথা উঠে এসেছে। ২০১৮ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যস্ত সময়সূচির মধ্যে তিনি রাতে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমাতেন।

তখনকার প্রতিবেদনে তাকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করা এবং সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
বারাক ওবামা: প্রায় ৫ ঘণ্টা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও রাতে কাজ করতে পছন্দ করতেন। ২০১৬ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি সাধারণত রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন।

পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার শেষ করার পর গভীর রাত পর্যন্ত একা কাজ করতেন ওবামা। এ সময় ব্রিফিং পেপার পড়া, লেখা এবং পরের দিনের প্রস্তুতিতে সময় দিতেন তিনি।
অ্যাঞ্জেলা মার্কেল: কয়েক ঘণ্টা
জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলও ব্যস্ত সময়ের কম ঘুম সামলানোর ক্ষমতার কথা বলেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পরবর্তীতে ঘুম পূরণের সুযোগ থাকলে কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েও তিনি কয়েক দিন কাজ চালিয়ে নিতে পারতেন।

তবে মার্কেলের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি স্থায়ীভাবে কম ঘুমানোর দাবি করেননি। বরং কাজের চাপ বেশি থাকলে ঘুমের ঘাটতি তৈরি হলেও পরে তা পূরণ করার চেষ্টা করতেন।
মার্গারেট থ্যাচার: প্রায় ৪ ঘণ্টা
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারও কম ঘুমানোর জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, রাতে প্রায় চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানো তার জন্য কঠিন ছিল।
১৯৮৯ সালে দ্য সানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে থ্যাচার বলেছিলেন, ‘আজকাল আমার পক্ষে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানো আসলে খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’ তার সাবেক প্রেস সচিব স্যার বার্নার্ড ইনগামও তাকে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কম ঘুমকে অনেক সময় কর্মশক্তি, উৎপাদনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এত সরল নয়। অল্প কিছু মানুষ স্বাভাবিকভাবেই খুব কম ঘুমিয়েও ভালোভাবে কাজ করতে পারেন। গবেষণায় এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জিনগত কারণের ভূমিকার কথাও উঠে এসেছে। তবে তারা ব্যতিক্রম।
বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুম কোনো সুবিধা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের প্রতিদিন অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিশ্বনেতারা কত ঘণ্টা জেগে থাকতে পারেন, সেটিই মূল প্রশ্ন নয়। বরং কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তারা কতটা পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারেন, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Reporter Name 
























