দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১৫ আগস্ট দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে এ অর্থ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও প্রথম ধাপেই শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের সম্পূর্ণ পাওনা হাতে পাচ্ছেন না। সীমিত অর্থের সংস্থান থাকায় এবার আংশিক অর্থ দেওয়া হবে। পরবর্তী সময়ে অর্থের সংস্থান অনুযায়ী অবশিষ্ট পাওনা পরিশোধ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অবসর সুবিধা বোর্ড ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে এ অর্থ পাঠানো হবে। ফলে অর্থ পাওয়ার জন্য সুবিধাভোগীদের অফিসে এসে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করা কিংবা কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন হবে না।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব অধ্যক্ষ মো. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, আগামী ১৫ আগস্ট থেকে আটকে থাকা অর্থ বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রোববার (৯ আগস্ট) ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের আটকে থাকা টাকা আগামী ১৫ আগস্ট থেকে বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন। আমরা ১৫ আগস্টের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং দিন-রাত কাজ করছি।
তবে প্রথম ধাপে পুরো পাওনা দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন বোর্ড সচিব। অর্থ এককালীন নাকি পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে– এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথম ধাপে নির্ধারিত সংখ্যক আবেদনকারীর অর্থ দেওয়া হবে। পুরো টাকা দেওয়া হবে না। আজকের মিটিংয়ের পর বিস্তারিত জানানো হবে।
এছাড়া অর্থের পরিমাণ ও বিতরণের পদ্ধতি নিয়ে রোববারের বৈঠকে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত হবে বলেও জানান তিনি।
অর্থ পেতে শিক্ষক-কর্মচারীদের অফিসে গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে না। ইএফটি ও আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমবে। এবার অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার ১১৯টি এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অর্থ পরিশোধের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। দুই প্রতিষ্ঠানে মোট আবেদনের সংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৯৬টি।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার অবসর সুবিধা বোর্ডের ৭০ হাজার ১১৯টি এবং কল্যাণ ট্রাস্টের ৫৩ হাজার ৪৭৭টি আবেদন অর্থ পরিশোধের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে। দুই প্রতিষ্ঠানের আবেদন মিলিয়ে মোট আবেদনসংখ্যা ১ লাখ ২৩ হাজার ৫৯৬টি। তবে এই সংখ্যাকে সুবিধাভোগী শিক্ষক-কর্মচারীর মোট সংখ্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একই শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা ও কল্যাণসুবিধা—দুইটির জন্যই আবেদন করতে পারেন।
চাকরিকালে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারে চাঁদা নিয়ে অবসর ও কল্যাণ তহবিল গঠন করা হয়। প্রচলিত ব্যবস্থায় অবসর সুবিধার জন্য মূল বেতনের ৬ শতাংশ এবং কল্যাণসুবিধার জন্য ৪ শতাংশ হারে চাঁদা জমা হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেও নির্ধারিত অর্থ সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট তহবিলে জমা দেওয়া হয়। এসব অর্থের পাশাপাশি সরকারের বিশেষ বরাদ্দ এবং তহবিলে থাকা অর্থের ব্যবস্থাপনা থেকেও সুবিধা দেওয়ার অর্থ জোগাড় করা হয়।
কিন্তু প্রতি মাসে নতুন করে যে পরিমাণ আবেদন জমা পড়ে, সেগুলো নিষ্পত্তির জন্য যে অর্থ প্রয়োজন, তহবিলে তার তুলনায় অর্থের প্রবাহ কম। ফলে একদিকে নতুন আবেদন জমতে থাকে, অন্যদিকে পুরোনো আবেদন নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ঘাটতি তৈরি হয়। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে অবসর ও কল্যাণসুবিধার আবেদনজট বড় হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে অবসর সুবিধা বোর্ডে প্রায় ৬৭ হাজার আবেদন অনিষ্পন্ন ছিল। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৮ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বিপরীতে অবসর তহবিলে ছিল প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৭ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। একই সময়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টেও বিপুলসংখ্যক আবেদন জমে আছে। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকার তথ্যও জানিয়েছিল সংশ্লিষ্টরা। এসব আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানানো হয়।
অর্থাৎ সরকারের বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে এবার বড় পরিসরে অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দীর্ঘদিনের সব আবেদন একবারে নিষ্পত্তি করার মতো অর্থ এখনো হাতে নেই। এ কারণেই প্রথম ধাপে আংশিক অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি পাওনা পরবর্তী সময়ে অর্থের সংস্থান অনুযায়ী পরিশোধ করা হবে।

অবসর সুবিধা বোর্ডের অর্থসংকটের পেছনে তহবিলের একটি বড় অংশ বিভিন্ন ব্যাংকে বিনিয়োগ করে আটকে থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সিটিজেনস ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে শিক্ষকদের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে। এসব অর্থ ফেরত পাওয়া বা আদায় নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় তহবিল ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যাংকে আটকে থাকা এই অর্থের কারণে অবসর সুবিধা বোর্ডের তারল্য পরিস্থিতিও চাপে পড়েছে। ফলে আবেদন যাচাই-বাছাই শেষ হলেও অনেক ক্ষেত্রে অর্থের সংস্থান না থাকায় আবেদনকারীদের পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। এর প্রভাব পড়েছে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর। চাকরি শেষে যে অর্থ তাদের আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম বড় অবলম্বন হওয়ার কথা, সেটিই দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।
অর্থসংকট আরও বাড়িয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে থাকা শিক্ষকদের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে থাকা এই অর্থ ফেরত পাওয়া বা আদায়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় অবসর তহবিলের তারল্য পরিস্থিতি চাপে পড়েছে।
অর্থসংকটের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জটিলতাও আবেদন নিষ্পত্তির গতি কমিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতির পর বোর্ডের পুরোনো সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পূর্ববর্তী তথ্যভাণ্ডারের উৎস ও কারিগরি কাঠামো সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় আগের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবেদন যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অনেক আবেদন ফাইল ধরে ধরে যাচাই-বাছাই করতে হচ্ছে। এতে একদিকে সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে প্রয়োজন হচ্ছে অতিরিক্ত জনবলের।
সম্প্রতি শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধার বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা পাওনা অর্থ না পেয়ে দুর্ভোগে ছিলেন। তাদের কষ্ট লাঘবের জন্য সরকার এ বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সরাসরি ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

এর আগে, অবসর ও কল্যাণসুবিধার অর্থ আটকে থাকার বিষয়ে এর আগে গত ৪ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের পর থেকে বন্ধ থাকা অবসরভাতা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি এ খাতে সরকারের ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের কথাও জানিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে রোববার (৯ আগস্ট) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. আবদুল খালেকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
Reporter Name 

























