ঢাকা ১২:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

উপমহাদেশের প্রভাবশালী ১০ সুফি সাধক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৫৪:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ১ বার

উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও ক্রমবিকাশের সঙ্গে সুফি সাধকদের নিবিড় সম্পর্ক আছে। ভারতবর্ষে রাজনৈতিকভাবে ইসলাম আগমনের বহু আগে সুফি সাধকদের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটেছিল।

মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরও সুফিরাই ছিলেন ইসলামের প্রধান ধারক, বাহক ও প্রচারক। ফলে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে সুফি সাধকদের গভীর প্রভাব রয়েছে। নিম্নে উপমহাদেশের প্রভাবশালী ১০ জন সুফি সাধকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো-

১. আলী হুজভিরি (রহ.) : ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি সাধক আলী হুজভিরি (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম আবুল হাসান আলী ইবনে উসমান জুল্লাবি হুজভিরি (রহ.)। তিনি দাতা সাহেব বা দাতা গঞ্জেবখশ নামেও পরিচিত। তিনি ১০০৯ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের গজনিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতবর্ষসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম প্রসারে অবদান রাখেন। তাঁর রচিত ‘কাশফুল মাহজুব’ সুফি ধারার গুরুত্বপূর্ণ বই।

আলী হুজভিরি (রহ.) ইলমে দ্বিন অর্জনের জন্য মক্কা-মদিনা, হিজাজ, কিরমানসহ সমকালীন মুসলিম বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেন। মুহাম্মদ আল খাত্তালি (রহ.)-এর কাছে তিনি আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা পান। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি পাকিস্তানের লাহোরে দ্বিন ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ৮ আগস্ট ১০৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। লাহোরেই তাঁকে দাফন করা হয়।

২. খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) : সুলতানুল হিন্দ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-কে উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি আলেম মনে করা হয়। তিনি ১১৪২ খ্রিস্টাব্দে ইরানের সিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বুখারা, সমরখন্দ ও নিশাপুরের বিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে ইলমে দ্বিন অর্জন করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন খাজা উসমান হারুন (রহ.)। তিনি তাঁর সান্নিধ্যে থেকে দীর্ঘ ২০ বছর আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) স্বীয় পীরের নির্দেশে ভারতবর্ষে আগমন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় চিশতিয়া তরিকা ভারতবর্ষের প্রধান সুফিধারায় উন্নীত হয় এবং অসংখ্য মানুষ ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। তিনি ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকালে করেন এবং ভারতের আজমিরে তাঁকে দাফন করা হয়।

৩. বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (রহ.) : বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (রহ.) ছিলেন প্রভাবশালী সুফি আলেম ও কবি। তিনি বাহাউল হক নামেও পরিচিত। তিনি উপমহাদেশে সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিধারা প্রতিষ্ঠা করেন। বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (রহ.) ১১৬১ খ্রিস্টাবে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় পাঞ্জাবের বিপুলসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। ১২২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুলতানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সুলতান ইলতুিমস তাঁকে শায়খুল ইসলাম উপাধিতে ভূষিত করেন। সোহরাওয়ার্দি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এর কাছে আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা লাভ করেন। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুলতানে ইন্তেকাল করেন।

৪. খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) : ভারতীয় উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার উজ্জ্বল প্রদীপ ছিলেন খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম সুলতানুল মাশায়েখ মুহাম্মদ বিন আহমদ আলী বাদায়ুনি (রহ.)। তিনি ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদায়ুন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান মেধাবী আলেম। খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) মাত্র ২০ বছর বয়সে ফরিদুদ্দিন গঞ্জেশকর (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন তাঁর দরবারে অবস্থান করে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও খিলাফত লাভ করেন। তিনি দিল্লি অঞ্চলে ইলমে দ্বিন ও মারেফাতের শিক্ষা প্রদান করেন। তিনি ৩ এপ্রিল ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে দিল্লিতে দাফন করা হয়।

৫. শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.) : তাঁর পূর্ণ নাম শাহ মুহাম্মদ জালালুদ্দিন মুজাররদ (রহ.)। তিনি প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি ছিলেন। ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনে জন্মগ্রহণ করেন। ৩২ বছর বয়সে ইসলাম প্রচারের জন্য সিলেট অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি উত্পীড়ক শাসক গৌর গোবিন্দকে পরাজিত করেন এবং সিলেটে প্রথম আজান দেন। তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দি তরিকার পীর সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এর মুরিদ ও খলিফা। তিনি ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৬. নুর কুতবুল আলম (রহ.) : বাংলা অঞ্চলের প্রভাবশালী সুফি সাধক ছিলেন নুর কুতবুল আমল (রহ.)। তিনি প্রাচীন বাংলার হজরত পাণ্ডুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আলাউল হক (রহ.) ছিলেন সুলতান সিকান্দার শাহের দরবারের বিশিষ্ট আলেম। তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলার মুসলমানরা রাজা গণেশের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায় এবং গণেশের পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নুর কুতবুল আলম (রহ.)-এর মাদরাসা, মসজিদ ও খানকা পরিচালনার জন্য কয়েকটি গ্রাম দান করেন। তিনি চিশতিয়া তরিকার সুফি ও পীর ছিলেন। তিনি ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৭. খান জাহান আলী (রহ.) : বাংলা অঞ্চলের প্রভাবশালী সুফি ও শাসক ছিলেন খান জাহান আলী (রহ.)। উলুঘ খান ও খান-ই-আজম তাঁর উপাধি। তিনি ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লির বিখ্যাত আলেম ও সুফি শাহ নেয়ামতুল্লাহ (রহ.)-এর কাছে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। খান জাহান আলী (রহ.) একজন সেনাপতি ও ধর্ম প্রচারক হিসেবে বাংলায় আগমন করেন। তিনি বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে খলিফাতাবাদ নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ করেন। তিনি বেশ কয়েকটি শহর, মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, সরাইখানা, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করেন। অসংখ্য দিঘি খনন করে মানুষের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করেন। তাঁর উন্নয়ন কর্মের অনেক নিদর্শন এখনো টিকে আছে। তিনি ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৮. মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.) : ইমামে রব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.)-এর পূর্ণ নাম ছিল আবুল বারাকাত বদরুদ্দিন আহমদ সেরহিন্দ। তিনি ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পাঞ্জাবের সেরহিন্দ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতাও ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও পীর। তিনি সম্রাট আকবরের দ্বিনে এলাহির বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেন। এ জন্য তাঁকে দীর্ঘদিন কারাভোগও করতে হয়। আধ্যাত্মিকতার জগতে তিনি নকশাবন্দি তরিকার অনুসারী ছিলেন। দিল্লির বিখ্যাত সুফি আলেম খাজা বাকিবিল্লাহ নকশাবন্দি (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং খিলাফত লাভ করেন। জ্ঞান সাধনা, আত্মিক পরিশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি তথা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বলা হয়। তিনি ১০ ডিসেম্বর ১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৯. সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) : ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসের একজন বৈপ্লবিক পুরুষ, আধ্যাত্মিক সাধক ও যুগসংস্কারক আলেম সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)। তাঁর গড়ে তোলা আন্দোলন তরিকায়ে মুহাম্মদি উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনে প্রাণসঞ্চার করেছিল। সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ১৭৮৬ সালে ভারতের রাইবেরিলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ধর্মীয় জ্ঞান ও নেতৃত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল। তিনি ছিলেন শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি (রহ.)-এর বিশিষ্ট শাগরেদ। তিনি ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন ফিরিয়ে আনতে খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা করেন। ফলে তিনি একই সঙ্গে শিখ ও ব্রিটিশ শাসকদের শত্রুতে পরিণত হন। আধ্যাত্মিকতার ধারায় তিনি প্রধানত নকশাবন্দি তরিকার অনুসারী ছিলেন। তবে চিশতিয়া ও কাদেরিয়া তরিকার সঙ্গে তিনি সংযুক্ত ছিলেন। ৬ মে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে শিখদের সঙ্গে এক লড়াইয়ের তিনি ঐতিহাসিক বালাকোট প্রান্তরে শহীদ হন।

১০. হাজি এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি (রহ.) : তিনি ছিলেন প্রভাবশালী আলেম, সুফি সাধক ও ভারতবর্ষের আজাদি আন্দোলনের অগ্রসেনানী। তিনি ভারতের সাহরানপুরের নানুতা অঞ্চলে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শাহ মুহাম্মদ ইসহাক (রহ.)-এর শিষ্য এবং চিশতিয়া তরিকার বিশিষ্ট পীর মিয়াজি নুর মুহাম্মদ ঝাঞ্জানযি (রহ.)-এর খলিফা ছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শামলির যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। উপমহাদেশের অনেক প্রভাবশালী আলেম তাঁর মুরিদ ছিলেন। যাঁদের মধ্যে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি, কাসেম নানুতবি ও আশরাফ আলী থানভি (রহ.) অন্যতম। ১৮৫৭ সালের বিপর্যয়ের পর তিনি স্থায়ীভাবে মক্কায় হিজরত করেন। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় তাঁর ইন্তেকাল হয়।

আল্লাহ তাঁদের সবার কবরকে শীতল করুন। আমিন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

জর্জিনাকে রোনালদো ‘মানুষ তোমাকে নিয়ে হিংসা করবে, এটাই স্বাভাবিক’

উপমহাদেশের প্রভাবশালী ১০ সুফি সাধক

আপডেট টাইম : ১১:৫৪:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও ক্রমবিকাশের সঙ্গে সুফি সাধকদের নিবিড় সম্পর্ক আছে। ভারতবর্ষে রাজনৈতিকভাবে ইসলাম আগমনের বহু আগে সুফি সাধকদের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটেছিল।

মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পরও সুফিরাই ছিলেন ইসলামের প্রধান ধারক, বাহক ও প্রচারক। ফলে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে সুফি সাধকদের গভীর প্রভাব রয়েছে। নিম্নে উপমহাদেশের প্রভাবশালী ১০ জন সুফি সাধকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হলো-

১. আলী হুজভিরি (রহ.) : ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি সাধক আলী হুজভিরি (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম আবুল হাসান আলী ইবনে উসমান জুল্লাবি হুজভিরি (রহ.)। তিনি দাতা সাহেব বা দাতা গঞ্জেবখশ নামেও পরিচিত। তিনি ১০০৯ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের গজনিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ভারতবর্ষসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম প্রসারে অবদান রাখেন। তাঁর রচিত ‘কাশফুল মাহজুব’ সুফি ধারার গুরুত্বপূর্ণ বই।

আলী হুজভিরি (রহ.) ইলমে দ্বিন অর্জনের জন্য মক্কা-মদিনা, হিজাজ, কিরমানসহ সমকালীন মুসলিম বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণ করেন। মুহাম্মদ আল খাত্তালি (রহ.)-এর কাছে তিনি আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা পান। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি পাকিস্তানের লাহোরে দ্বিন ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ৮ আগস্ট ১০৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইন্তেকাল করেন। লাহোরেই তাঁকে দাফন করা হয়।

২. খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) : সুলতানুল হিন্দ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-কে উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি আলেম মনে করা হয়। তিনি ১১৪২ খ্রিস্টাব্দে ইরানের সিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বুখারা, সমরখন্দ ও নিশাপুরের বিখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে ইলমে দ্বিন অর্জন করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন খাজা উসমান হারুন (রহ.)। তিনি তাঁর সান্নিধ্যে থেকে দীর্ঘ ২০ বছর আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.) স্বীয় পীরের নির্দেশে ভারতবর্ষে আগমন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় চিশতিয়া তরিকা ভারতবর্ষের প্রধান সুফিধারায় উন্নীত হয় এবং অসংখ্য মানুষ ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে। তিনি ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকালে করেন এবং ভারতের আজমিরে তাঁকে দাফন করা হয়।

৩. বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (রহ.) : বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (রহ.) ছিলেন প্রভাবশালী সুফি আলেম ও কবি। তিনি বাহাউল হক নামেও পরিচিত। তিনি উপমহাদেশে সোহরাওয়ার্দিয়া সুফিধারা প্রতিষ্ঠা করেন। বাহাউদ্দিন জাকারিয়া (রহ.) ১১৬১ খ্রিস্টাবে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় পাঞ্জাবের বিপুলসংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। ১২২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুলতানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সুলতান ইলতুিমস তাঁকে শায়খুল ইসলাম উপাধিতে ভূষিত করেন। সোহরাওয়ার্দি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এর কাছে আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা লাভ করেন। ১২৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি মুলতানে ইন্তেকাল করেন।

৪. খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) : ভারতীয় উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার উজ্জ্বল প্রদীপ ছিলেন খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.)। তাঁর পূর্ণ নাম সুলতানুল মাশায়েখ মুহাম্মদ বিন আহমদ আলী বাদায়ুনি (রহ.)। তিনি ১২৩৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের উত্তর প্রদেশের বাদায়ুন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রতিভাবান মেধাবী আলেম। খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া (রহ.) মাত্র ২০ বছর বয়সে ফরিদুদ্দিন গঞ্জেশকর (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন তাঁর দরবারে অবস্থান করে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও খিলাফত লাভ করেন। তিনি দিল্লি অঞ্চলে ইলমে দ্বিন ও মারেফাতের শিক্ষা প্রদান করেন। তিনি ৩ এপ্রিল ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে দিল্লিতে দাফন করা হয়।

৫. শাহজালাল ইয়েমেনি (রহ.) : তাঁর পূর্ণ নাম শাহ মুহাম্মদ জালালুদ্দিন মুজাররদ (রহ.)। তিনি প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি ছিলেন। ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেনে জন্মগ্রহণ করেন। ৩২ বছর বয়সে ইসলাম প্রচারের জন্য সিলেট অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। তিনি উত্পীড়ক শাসক গৌর গোবিন্দকে পরাজিত করেন এবং সিলেটে প্রথম আজান দেন। তিনি ছিলেন সোহরাওয়ার্দি তরিকার পীর সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দি (রহ.)-এর মুরিদ ও খলিফা। তিনি ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৬. নুর কুতবুল আলম (রহ.) : বাংলা অঞ্চলের প্রভাবশালী সুফি সাধক ছিলেন নুর কুতবুল আমল (রহ.)। তিনি প্রাচীন বাংলার হজরত পাণ্ডুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আলাউল হক (রহ.) ছিলেন সুলতান সিকান্দার শাহের দরবারের বিশিষ্ট আলেম। তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলার মুসলমানরা রাজা গণেশের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায় এবং গণেশের পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নুর কুতবুল আলম (রহ.)-এর মাদরাসা, মসজিদ ও খানকা পরিচালনার জন্য কয়েকটি গ্রাম দান করেন। তিনি চিশতিয়া তরিকার সুফি ও পীর ছিলেন। তিনি ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৭. খান জাহান আলী (রহ.) : বাংলা অঞ্চলের প্রভাবশালী সুফি ও শাসক ছিলেন খান জাহান আলী (রহ.)। উলুঘ খান ও খান-ই-আজম তাঁর উপাধি। তিনি ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দিল্লির বিখ্যাত আলেম ও সুফি শাহ নেয়ামতুল্লাহ (রহ.)-এর কাছে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। খান জাহান আলী (রহ.) একজন সেনাপতি ও ধর্ম প্রচারক হিসেবে বাংলায় আগমন করেন। তিনি বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে খলিফাতাবাদ নামে একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং জনকল্যাণমূলক অনেক কাজ করেন। তিনি বেশ কয়েকটি শহর, মসজিদ, মাদরাসা, খানকা, সরাইখানা, মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ করেন। অসংখ্য দিঘি খনন করে মানুষের সুপেয় পানির কষ্ট দূর করেন। তাঁর উন্নয়ন কর্মের অনেক নিদর্শন এখনো টিকে আছে। তিনি ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৮. মুজাদ্দিদ আলফে সানি (রহ.) : ইমামে রব্বানি মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.)-এর পূর্ণ নাম ছিল আবুল বারাকাত বদরুদ্দিন আহমদ সেরহিন্দ। তিনি ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পাঞ্জাবের সেরহিন্দ নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতাও ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও পীর। তিনি সম্রাট আকবরের দ্বিনে এলাহির বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেন। এ জন্য তাঁকে দীর্ঘদিন কারাভোগও করতে হয়। আধ্যাত্মিকতার জগতে তিনি নকশাবন্দি তরিকার অনুসারী ছিলেন। দিল্লির বিখ্যাত সুফি আলেম খাজা বাকিবিল্লাহ নকশাবন্দি (রহ.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করেন এবং খিলাফত লাভ করেন। জ্ঞান সাধনা, আত্মিক পরিশুদ্ধি ও সমাজ সংস্কারে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি তথা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বলা হয়। তিনি ১০ ডিসেম্বর ১৬২৪ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

৯. সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) : ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম ইতিহাসের একজন বৈপ্লবিক পুরুষ, আধ্যাত্মিক সাধক ও যুগসংস্কারক আলেম সাইয়েদ আহমদ শহীদ (রহ.)। তাঁর গড়ে তোলা আন্দোলন তরিকায়ে মুহাম্মদি উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনে প্রাণসঞ্চার করেছিল। সৈয়দ আহমদ শহীদ (রহ.) ১৭৮৬ সালে ভারতের রাইবেরিলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ধর্মীয় জ্ঞান ও নেতৃত্বের জন্য বিখ্যাত ছিল। তিনি ছিলেন শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি (রহ.)-এর বিশিষ্ট শাগরেদ। তিনি ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন ফিরিয়ে আনতে খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা করেন। ফলে তিনি একই সঙ্গে শিখ ও ব্রিটিশ শাসকদের শত্রুতে পরিণত হন। আধ্যাত্মিকতার ধারায় তিনি প্রধানত নকশাবন্দি তরিকার অনুসারী ছিলেন। তবে চিশতিয়া ও কাদেরিয়া তরিকার সঙ্গে তিনি সংযুক্ত ছিলেন। ৬ মে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে শিখদের সঙ্গে এক লড়াইয়ের তিনি ঐতিহাসিক বালাকোট প্রান্তরে শহীদ হন।

১০. হাজি এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি (রহ.) : তিনি ছিলেন প্রভাবশালী আলেম, সুফি সাধক ও ভারতবর্ষের আজাদি আন্দোলনের অগ্রসেনানী। তিনি ভারতের সাহরানপুরের নানুতা অঞ্চলে ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শাহ মুহাম্মদ ইসহাক (রহ.)-এর শিষ্য এবং চিশতিয়া তরিকার বিশিষ্ট পীর মিয়াজি নুর মুহাম্মদ ঝাঞ্জানযি (রহ.)-এর খলিফা ছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শামলির যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। উপমহাদেশের অনেক প্রভাবশালী আলেম তাঁর মুরিদ ছিলেন। যাঁদের মধ্যে রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি, কাসেম নানুতবি ও আশরাফ আলী থানভি (রহ.) অন্যতম। ১৮৫৭ সালের বিপর্যয়ের পর তিনি স্থায়ীভাবে মক্কায় হিজরত করেন। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় তাঁর ইন্তেকাল হয়।

আল্লাহ তাঁদের সবার কবরকে শীতল করুন। আমিন।