ঢাকা ০৪:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মানুষের হাতে বাড়ছে নগদ টাকা, তারল্য ও ঋণপ্রবাহে বাড়তে পারে চাপ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:৩২:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • ১৩ বার

ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। একই সময়ে বেড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ মানি বা ছাপানো টাকার পরিমাণও।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানির ঈদ ঘিরে ব্যাপক নগদ লেনদেন এবং কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার সংকট এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। মে মাসে তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, এক মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

একই সময়ে রিজার্ভ মানি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো টাকার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিল শেষে রিজার্ভ মানি ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। মে মাস শেষে তা বেড়ে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে এক মাসে রিজার্ভ মানি বেড়েছে ৫০ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, এক মাসে মানুষের হাতে নগদ অর্থ এতটা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের প্রবণতা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। এটিও একটি কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, দুটি কারণে মে মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে থাকতে পারে। প্রথমত, মে মাসের শেষদিকে কোরবানির ঈদ হওয়ায় পশু কেনাবেচাসহ বিভিন্ন লেনদেনে মানুষ ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলেছে। দ্বিতীয়ত, কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার সংকট থাকায় অনেকে সতর্কতামূলকভাবে আমানত তুলে হাতে রেখেছেন।

তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয়, এই টাকা আবার ব্যাংকে ফেরত আসে কি না। যদি দীর্ঘ সময় ব্যাংকের বাইরে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলোর আমানত কমবে, ঋণ বিতরণে চাপ তৈরি হবে এবং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছিল। জানুয়ারিতে ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা এবং মার্চে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। তবে এপ্রিলে তা কমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। এরপর মে মাসে আবার বড় উল্লম্ফন দেখা যায়।

ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বলতে বোঝায়, গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর যে অর্থ আর ব্যাংকে জমা দেননি এবং যা চলতি লেনদেনে মানুষের হাতে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমেছিল। ওই সময়ে ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা কিছুটা ফিরে আসায় আমানতও বাড়ছিল।

তবে মার্চ থেকে আবার নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে সামান্য কমলেও মে মাসে তা আবার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদকেন্দ্রিক মৌসুমি নগদ চাহিদা শেষ হওয়ার পর জুন ও পরবর্তী মাসগুলোতে এই অর্থ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসে কি না, সেটিই হবে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জানতে চাইলে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ ফেলো ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের কারণে সাময়িকভাবে মানুষের হাতে নগদ অর্থ বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই অর্থ যদি ঈদের পরও ব্যাংকে ফিরে না আসে, তাহলে তা ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেবে।

‘এতে আমানত সংগ্রহ, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও ঋণপ্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসের তথ্যই বলে দেবে, এটি মৌসুমি প্রভাব নাকি আস্থাজনিত দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা’—যোগ করেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

মানুষের হাতে বাড়ছে নগদ টাকা, তারল্য ও ঋণপ্রবাহে বাড়তে পারে চাপ

আপডেট টাইম : ১১:৩২:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। একই সময়ে বেড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ মানি বা ছাপানো টাকার পরিমাণও।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোরবানির ঈদ ঘিরে ব্যাপক নগদ লেনদেন এবং কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার সংকট এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত মুদ্রানীতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল শেষে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। মে মাসে তা বেড়ে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, এক মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা, যা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

একই সময়ে রিজার্ভ মানি বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাপানো টাকার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিল শেষে রিজার্ভ মানি ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। মে মাস শেষে তা বেড়ে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি ১০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে এক মাসে রিজার্ভ মানি বেড়েছে ৫০ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, এক মাসে মানুষের হাতে নগদ অর্থ এতটা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলনের প্রবণতা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। এটিও একটি কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, দুটি কারণে মে মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে থাকতে পারে। প্রথমত, মে মাসের শেষদিকে কোরবানির ঈদ হওয়ায় পশু কেনাবেচাসহ বিভিন্ন লেনদেনে মানুষ ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলেছে। দ্বিতীয়ত, কয়েকটি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থার সংকট থাকায় অনেকে সতর্কতামূলকভাবে আমানত তুলে হাতে রেখেছেন।

তিনি বলেন, এখন দেখার বিষয়, এই টাকা আবার ব্যাংকে ফেরত আসে কি না। যদি দীর্ঘ সময় ব্যাংকের বাইরে থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলোর আমানত কমবে, ঋণ বিতরণে চাপ তৈরি হবে এবং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকেই মানুষের হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছিল। জানুয়ারিতে ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা এবং মার্চে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। তবে এপ্রিলে তা কমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকায় নেমে আসে। এরপর মে মাসে আবার বড় উল্লম্ফন দেখা যায়।

ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বলতে বোঝায়, গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর যে অর্থ আর ব্যাংকে জমা দেননি এবং যা চলতি লেনদেনে মানুষের হাতে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে কমেছিল। ওই সময়ে ব্যাংক খাতে মানুষের আস্থা কিছুটা ফিরে আসায় আমানতও বাড়ছিল।

তবে মার্চ থেকে আবার নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। এপ্রিলে সামান্য কমলেও মে মাসে তা আবার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, ঈদকেন্দ্রিক মৌসুমি নগদ চাহিদা শেষ হওয়ার পর জুন ও পরবর্তী মাসগুলোতে এই অর্থ আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসে কি না, সেটিই হবে ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জানতে চাইলে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ ফেলো ব্যাংক খাত বিশ্লেষক হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের কারণে সাময়িকভাবে মানুষের হাতে নগদ অর্থ বাড়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই অর্থ যদি ঈদের পরও ব্যাংকে ফিরে না আসে, তাহলে তা ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেবে।

‘এতে আমানত সংগ্রহ, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও ঋণপ্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসের তথ্যই বলে দেবে, এটি মৌসুমি প্রভাব নাকি আস্থাজনিত দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা’—যোগ করেন তিনি।