ঢাকা ০৯:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বৃহত্তর ময়মনসিংহের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর অস্তিত্বসংকটে বুড়িগঙ্গা ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রবাস থেকে যত প্রতিরোধ মেঘনার এক ইলিশ বিক্রি হলো ১০ হাজার টাকায় মাওলানা মাহমুদ মাদানী ইসরাইলে অস্ত্র সরবরাহ মানবতা ও ভারতের নৈতিক মর্যাদার জন্য কলঙ্ক অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে ৫ আগস্ট সংবাদপত্রে ছুটি বাংলাদেশে কারিগরি ও ক্রীড়া শিক্ষায় সহযোগিতার আগ্রহ অস্ট্রেলিয়ার আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার সমন্বয়ে কাজ করবে আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট : সেনাপ্রধান শেখ হাসিনা যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারে: দিনেশ ত্রিবেদীকে হুমায়ুন কবির

ভুল নীতিতে বিপর্যস্ত আবাসন খাত

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:৪৭:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • ১৭ বার

দীর্ঘদিন থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়ে ধস, খেলাপির ঝুঁকিতে ব্যাংক খাত, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতিতে বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনীতিকে দুর্বল করে রেখেছে। আর তাই দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বেশ কয়েক বছর ধরে নানা সংকটে নিমজ্জিত। মন্দায় আক্রান্ত শিল্পে ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর নানা ব্যবস্থা নিয়েও যেখানে যখন রফতানি-রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি ব্যবসায়ীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা দেশের অভ্যন্তরীণ বা দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছে। অথচ দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এমনকি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস আবাসন খাত ভুল নীতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জাতীয় বাজেটে এই খাতটি উপেক্ষিত থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০০ সহযোগী শিল্প জড়িত। রড, সিমেন্ট, ইট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের মতো এই শিল্পগুলো আবাসন নির্মাণ থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। অথচ দীর্ঘদিন থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর, রাজউকের স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানিতে বিপর্যস্ত আবাসন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তা না কাটলেও নতুন অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যের ওপর যে নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা হয়েছে, যা এই খাতের গতিকে আরো শ্লথ করে দেবে। এমনিতেই দীর্ঘদিন থেকে দেশে কর্মসংস্থান কমে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যেখানে শিক্ষিত যুব সমাজের মধ্যে এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। সরকারি খাতে নতুন নিয়োগ সীমিত হওয়া এবং বেসরকারি ও শিল্প খাতে স্থবিরতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা আবাসন খাত সঠিক নীতি সহায়তা পেলে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারতো।

নতুন বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল ও নতুন করে ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স) আরোপ, যা দীর্ঘদিন থেকে বিপর্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ প্রবাহকে আরো শ্লথ করে দিবে এবং কর্মসংস্থানে বিরুপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। কারন আবাসন খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ জড়িত। সরাসরি জড়িত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। এই খাত আরো স্থবির হলে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্প আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে আবাসন শিল্পের ৪৫৮ উপখাত আরো ঝুঁঁকিতে পড়বে। অথচ বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের জুড়ি নেই। মূলধনের সঞ্চালন ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে এটি মোট দেশজ উৎপাদনে-জিডিপি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের সংকট বাড়লে অর্থনীতিকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি নীতি-সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তাই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের অন্যতম নাম আবাসন খাতে এখনই বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে দেশের কর্মসংস্থানে বড় একটি প্রভাব পড়বে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের পরই দেশের অর্থনীতি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সুবিধাগুলো একযোগে হারিয়ে যাবে, তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানো, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রফতানিতে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপÑ সব মিলিয়ে এলডিসি-পরবর্তী সময় স্বল্পমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করার আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। আর তাই এই সময়ের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমানও মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখনই দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের রফতানি ও বিনিয়োগ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। যা দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে আরো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
দেশে বিনিয়োগে খরা চলছে। শিল্প খাতে নেই গতি। নতুন শিল্প যেমন গড়ে উঠছে না, তেমনি পুরোনো শিল্পগুলোর বেশিরভাগ বেকায়দায় আছে। টিকে থাকার কৌশল হিসেবে অনেকে খরচ কমাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো সহজ পথ বেছে নিয়েছে। সরকারি খাতেও নতুন কাজের খোঁজ নেই। অন্যদিকে বিগত সরকারের সময়ের প্রভাবশালীদের মালিকানাধীন অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে দেশে কর্মসংস্থানে গতি নেই। ফলে বাড়ছে বেকারত্ব। যা সমগ্র অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণমূলক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি কোনো খাতেই কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দেশে বেকারত্ব বাড়ার মূল কারণ, বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তাদের বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে। তাহলে দ্রুত শিল্পায়ন হবে। এতে কর্মসংস্থান হবে। বেকারত্ব কমবে।
অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন (ইধারএফ)-এর সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম ইনকিলাবকে বলেন, সহজ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অন্যতম নাম আবাসন খাত। আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৫শ’ উপখাত আছে। বর্তমানে এই খাতগুলো ঝুঁঁকিতে রয়েছে। যার প্রভাবে কর্মসংস্থান কমছে, সার্বিক অর্থনীতি বিপাকে। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্য বাস্তবায়নে দ্রুত আবাসনের মত খাতকে নীতি সহায়তা দিয়ে চাঙ্গা রাখার তাগিদ দেন।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে দীর্ঘদিন থেকে আবাসন খাত স্থবির। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর দাম গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। রড, সিমেন্ট, কেবলসহ সব উপকরণেই বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় ডেভেলপার ও ক্রেতা উভয়েই চাপে রয়েছেন। ফলে আবাসন খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। এর সঙ্গে বাজেটে নতুন করে ১৫ শতাংশ করের বোঝা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। তিনি আবাসনখাতকে চাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সূত্র মতে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় বিপর্যস্ত দেশের শ্রমবাজার পরিস্থিতি। জনশক্তি রফতানি ইস্যুতে মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিদিনই কমছে, যা আগামী দিনে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে। কারণ শ্রমিকরা বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসার অংক ধীরে ধীরে কমে যাবে। সদ্য শেষ হওয়া জুন মাসে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ধাক্কায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ দেশে এসেছে দুই দশমিক ৮০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের দুই দশমিক ৮২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কম।

এদিকে রফতানি আয়ে পতনের ধারা নিয়েই শেষ হয়েছে বিদায়ী অর্থবছর। কাটায় কাটায় ৪৮ বিলিয়ন বা চার হাজার আট কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ২০ কোটি ডলার এবং শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সঙ্কটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে কারখানাগুলো সক্ষমতার অর্ধেক পর্যন্ত উৎপাদন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কেমিক্যাল ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে পরিবহন ব্যয় ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। একই সাথে সময়মতো রফতানি আদেশ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লেগেছে। এ সময়ে রফতানি আয় কমেছে ৮ শতাংশের বেশি। শুধু আয়ই নয়, কমেছে রফতানির পরিমাণ এবং পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও। বিপরীতে একই সময়ে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়ার পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
উদ্যোক্তাদের মতে, চীন ও ভারতের রফতানি কমে তৈরি হওয়া সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট, উচ্চ করহার এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ সেই সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারেনি। এমনকি দেশে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এড়াতে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিদেশি বা ডলারভিত্তিক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশীয় ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশের বেশি হলেও বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৮ শতাংশের মধ্যে।

এছাড়া সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ঘাটতি প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। যদিও এটিই চূড়ান্ত নয়; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন চূড়ান্ত হিসাব শেষে এই অঙ্ক আরো বাড়তে পারে। আর তাই স্বৈরাচার হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের থেকেও রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে রাজস্ব আয়ের ‘সোনার হাস’ আবাসন খাতকে ধ্বংস করা। দীর্ঘদিন থেকে এই খাতটি বিপাকে, নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই খাতের জন্য বিশেষ কোন ছাড় থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।

খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যের ওপর যে নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা হয়েছে, তা এই খাতের গতিকে যেমন শ্লথ করে দেবে। তেমনি আগামী দিনে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি আরো বাড়াবে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছর ছিল স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তখন নানাবিধ কারনে দেশে অস্থিরতা লেগেছিল। তারপরও ওই সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪৭ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। একই ভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪৪ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক আলোচনায় বলেছে, রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব ও অর্থনীতিতে চাপলক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব কম আদায় হওয়ায় সরকারের সার্বিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় গভীর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা এবং সুদ পরিশোধের চাপ আরো বাড়িয়ে দেবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের-বিআইডিএস সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি খাত। এর মধ্যে আবাসন খাত অন্যতম। এই খাত রুগ্ন হয়ে পড়লে বা মন্দায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। একই সঙ্গে দেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গার অন্যতম খাত আবাসন খাত চাঙ্গা করাও সরকারের দায়িত্ব।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বৃহত্তর ময়মনসিংহের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

ভুল নীতিতে বিপর্যস্ত আবাসন খাত

আপডেট টাইম : ১২:৪৭:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘদিন থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয়ে ধস, খেলাপির ঝুঁকিতে ব্যাংক খাত, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতিতে বিনিয়োগে স্থবিরতা অর্থনীতিকে দুর্বল করে রেখেছে। আর তাই দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বেশ কয়েক বছর ধরে নানা সংকটে নিমজ্জিত। মন্দায় আক্রান্ত শিল্পে ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর নানা ব্যবস্থা নিয়েও যেখানে যখন রফতানি-রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সম্ভব হচ্ছে না। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি ব্যবসায়ীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা দেশের অভ্যন্তরীণ বা দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছে। অথচ দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এমনকি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস আবাসন খাত ভুল নীতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জাতীয় বাজেটে এই খাতটি উপেক্ষিত থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০০ সহযোগী শিল্প জড়িত। রড, সিমেন্ট, ইট, সিরামিক, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং আসবাবপত্রের মতো এই শিল্পগুলো আবাসন নির্মাণ থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান ও সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। অথচ দীর্ঘদিন থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়, এনবিআর, রাজউকের স্বেচ্ছাচারিতা ও হয়রানিতে বিপর্যস্ত আবাসন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তা না কাটলেও নতুন অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যের ওপর যে নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা হয়েছে, যা এই খাতের গতিকে আরো শ্লথ করে দেবে। এমনিতেই দীর্ঘদিন থেকে দেশে কর্মসংস্থান কমে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যেখানে শিক্ষিত যুব সমাজের মধ্যে এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। সরকারি খাতে নতুন নিয়োগ সীমিত হওয়া এবং বেসরকারি ও শিল্প খাতে স্থবিরতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা আবাসন খাত সঠিক নীতি সহায়তা পেলে দেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে অন্যতম হাতিয়ার হতে পারতো।

নতুন বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল ও নতুন করে ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স) আরোপ, যা দীর্ঘদিন থেকে বিপর্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ প্রবাহকে আরো শ্লথ করে দিবে এবং কর্মসংস্থানে বিরুপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। কারন আবাসন খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ জড়িত। সরাসরি জড়িত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। এই খাত আরো স্থবির হলে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্প আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে আবাসন শিল্পের ৪৫৮ উপখাত আরো ঝুঁঁকিতে পড়বে। অথচ বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের জুড়ি নেই। মূলধনের সঞ্চালন ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে এটি মোট দেশজ উৎপাদনে-জিডিপি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের সংকট বাড়লে অর্থনীতিকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি নীতি-সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তাই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের অন্যতম নাম আবাসন খাতে এখনই বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে দেশের কর্মসংস্থানে বড় একটি প্রভাব পড়বে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু এই অর্জনের পরই দেশের অর্থনীতি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সুবিধাগুলো একযোগে হারিয়ে যাবে, তাহলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানো, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রফতানিতে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপÑ সব মিলিয়ে এলডিসি-পরবর্তী সময় স্বল্পমেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরো তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত করার আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। আর তাই এই সময়ের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমানও মনে করেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখনই দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের রফতানি ও বিনিয়োগ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে। যা দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিতে আরো বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
দেশে বিনিয়োগে খরা চলছে। শিল্প খাতে নেই গতি। নতুন শিল্প যেমন গড়ে উঠছে না, তেমনি পুরোনো শিল্পগুলোর বেশিরভাগ বেকায়দায় আছে। টিকে থাকার কৌশল হিসেবে অনেকে খরচ কমাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো সহজ পথ বেছে নিয়েছে। সরকারি খাতেও নতুন কাজের খোঁজ নেই। অন্যদিকে বিগত সরকারের সময়ের প্রভাবশালীদের মালিকানাধীন অনেক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে দেশে কর্মসংস্থানে গতি নেই। ফলে বাড়ছে বেকারত্ব। যা সমগ্র অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণমূলক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি কোনো খাতেই কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দেশে বেকারত্ব বাড়ার মূল কারণ, বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তাদের বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসবে। তাহলে দ্রুত শিল্পায়ন হবে। এতে কর্মসংস্থান হবে। বেকারত্ব কমবে।
অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন (ইধারএফ)-এর সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম ইনকিলাবকে বলেন, সহজ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অন্যতম নাম আবাসন খাত। আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৫শ’ উপখাত আছে। বর্তমানে এই খাতগুলো ঝুঁঁকিতে রয়েছে। যার প্রভাবে কর্মসংস্থান কমছে, সার্বিক অর্থনীতি বিপাকে। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি লক্ষ্য বাস্তবায়নে দ্রুত আবাসনের মত খাতকে নীতি সহায়তা দিয়ে চাঙ্গা রাখার তাগিদ দেন।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর দামের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে দীর্ঘদিন থেকে আবাসন খাত স্থবির। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর দাম গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। রড, সিমেন্ট, কেবলসহ সব উপকরণেই বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় ডেভেলপার ও ক্রেতা উভয়েই চাপে রয়েছেন। ফলে আবাসন খাত বর্তমানে গভীর সংকটে রয়েছে। এর সঙ্গে বাজেটে নতুন করে ১৫ শতাংশ করের বোঝা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। তিনি আবাসনখাতকে চাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সূত্র মতে, বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় বিপর্যস্ত দেশের শ্রমবাজার পরিস্থিতি। জনশক্তি রফতানি ইস্যুতে মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিদিনই কমছে, যা আগামী দিনে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে। কারণ শ্রমিকরা বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসার অংক ধীরে ধীরে কমে যাবে। সদ্য শেষ হওয়া জুন মাসে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ধাক্কায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ দেশে এসেছে দুই দশমিক ৮০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের দুই দশমিক ৮২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কম।

এদিকে রফতানি আয়ে পতনের ধারা নিয়েই শেষ হয়েছে বিদায়ী অর্থবছর। কাটায় কাটায় ৪৮ বিলিয়ন বা চার হাজার আট কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ২০ কোটি ডলার এবং শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সঙ্কটের কারণে শিল্প খাতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও অনিয়মিত সরবরাহের কারণে কারখানাগুলো সক্ষমতার অর্ধেক পর্যন্ত উৎপাদন করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল, কেমিক্যাল ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। প্রতিযোগী দেশগুলো থেকে পরিবহন ব্যয় ও জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। একই সাথে সময়মতো রফতানি আদেশ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় একক রফতানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য ধাক্কা লেগেছে। এ সময়ে রফতানি আয় কমেছে ৮ শতাংশের বেশি। শুধু আয়ই নয়, কমেছে রফতানির পরিমাণ এবং পোশাকের গড় ইউনিট মূল্যও। বিপরীতে একই সময়ে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে কম্বোডিয়ার পোশাক রফতানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
উদ্যোক্তাদের মতে, চীন ও ভারতের রফতানি কমে তৈরি হওয়া সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ নানা সংকট, উচ্চ করহার এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ সেই সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারেনি। এমনকি দেশে ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এড়াতে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিদেশি বা ডলারভিত্তিক ঋণ নেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশীয় ব্যাংক ঋণের সুদহার ১৫-১৬ শতাংশের বেশি হলেও বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৮ শতাংশের মধ্যে।

এছাড়া সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ঘাটতি প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা। যদিও এটিই চূড়ান্ত নয়; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ বলছেন চূড়ান্ত হিসাব শেষে এই অঙ্ক আরো বাড়তে পারে। আর তাই স্বৈরাচার হাসিনা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের থেকেও রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে রাজস্ব আয়ের ‘সোনার হাস’ আবাসন খাতকে ধ্বংস করা। দীর্ঘদিন থেকে এই খাতটি বিপাকে, নতুন সরকার ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই খাতের জন্য বিশেষ কোন ছাড় থাকবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো।

খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপকালে তারা সতর্ক করে বলেছেন যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্ল্যাটের সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যের ওপর যে নতুন ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করা হয়েছে, তা এই খাতের গতিকে যেমন শ্লথ করে দেবে। তেমনি আগামী দিনে রাজস্ব আয়ের ঘাটতি আরো বাড়াবে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছর ছিল স্বৈরাচার হাসিনার ভারতে পলায়ন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তখন নানাবিধ কারনে দেশে অস্থিরতা লেগেছিল। তারপরও ওই সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪৭ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। একই ভাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৪৪ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এক আলোচনায় বলেছে, রাজস্ব ঘাটতির প্রভাব ও অর্থনীতিতে চাপলক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব কম আদায় হওয়ায় সরকারের সার্বিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় গভীর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা এবং সুদ পরিশোধের চাপ আরো বাড়িয়ে দেবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের-বিআইডিএস সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি খাত। এর মধ্যে আবাসন খাত অন্যতম। এই খাত রুগ্ন হয়ে পড়লে বা মন্দায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। একই সঙ্গে দেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গার অন্যতম খাত আবাসন খাত চাঙ্গা করাও সরকারের দায়িত্ব।