ঢাকা ০২:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছেই, আলোর মুখ দেখে না প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগ

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:১৩:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ৪ বার

আকাশে মেঘ করলেই মনের অজান্তে এখন এক শঙ্কা কাজ করে, ‘বজ্রপাত হবে না তো?’ কার্যত বাংলাদেশে এখন বজ্রপাত নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে, যা প্রতি বছর কেড়ে নিচ্ছে শতশত মানুষের প্রাণ। একসময় এটিকে মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রকোপ ও প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বজ্রপাতে এখন সারাবছরই ঘটছে প্রাণহানি।

বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জনের মতো মানুষ মারা যাচ্ছে। চলতি বছরের চার মাস অতিবাহিত না হতেই মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। কিন্তু, বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল রোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প প্রণয়ন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও খুব একটা কাজে আসেনি। যদিও বজ্রপাতে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের মে মাসে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

প্রতীকী ছবি

আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটাসহ নানান কারণে বজ্রপাত বেড়ে গেছে, এতে মৃত্যুও বাড়ছে। প্রতি বছর শতশত কৃষক, প্রান্তিক মানুষ মারা যাচ্ছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে সচেতনতা। সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি প্রকল্প নেওয়ার কাজও চলছে।

গত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে নেত্রকোনার ডিসি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে সেই প্রস্তাবের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তা পাঠানো হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে। এরপর অধিদপ্তর এটা নিয়ে কাজ করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন করে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণ করা হবে। আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। প্রকল্প প্রণয়নের জন্য উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে প্রকল্প চূড়ান্ত করা হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ রোববার (২৬ এপ্রিল) দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।এর মধ্যে গাইবান্ধায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুজন, জামালপুরে দুজন, ঠাকুরগাঁওয়ে দুজন, বগুড়ায় একজন, নাটোরে একজন ও পঞ্চগড়ে একজন মারা গেছেন। এসব ঘটনায় অনেকে আহত হয়েছেন।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল (৫ বৈশাখ) একদিনে বজ্রপাতে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু হয়। বৈশাখের আগেও বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছিল কমপক্ষে ৩০ জনের। ৪৩ জনের মধ্যে পুরুষ ৩৮ জন; নারী দুজন আর তিনজন শিশুও মারা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনই কৃষক।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাধারণত মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিকে বজ্রপাতের মৌসুম শুরু হয়। জুন ও জুলাই পর্যন্ত তা থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেখা গেছে, এখন বজ্রপাতের কোনো হিসাব মিলছে না। বর্ষাকালেও এখন বজ্রপাত হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বজ্রপাতের বিষয়ে মানুষের সচেতন করার কাজটি করছি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। আমাদের এক পৃষ্ঠার একটি সতর্কবার্তা আছে, সেটা আমরা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি যেন মানুষ সচেতন হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছি।’

বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে হাওড়াঞ্চলে

অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ‘২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় টিআর কর্মসূচির আওতায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এ টাকা দিয়ে ওই এলাকায় ৩৪৩টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর একটি প্রকল্প প্রণয়নে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণ করা হবে। এ শেডে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। এ শেড কৃষকরা ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের জন্য ধান মজুতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা হবে।’

মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন আরও বলেন, ‘সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার জেলার সব উপজেলা থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে আমরা প্রকল্প নেবো। প্রাথমিকভাবে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। তবে জেলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সব প্রস্তাব পাওয়ার পর একটার সম্ভাব্যতা যাচাই হবে।’

‘মাঠ ও হাওরের কৃষকরা যেখানে কাজ করেন, আশপাশে কোথাও আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই, সেখানে এ মাল্টিপারপাস শেডগুলো নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক বিঘা জমির ‍ওপর এটা হবে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘প্রতিটি শেড করতে কত টাকা লাগবে, পুরো প্রকল্পের কত ব্যয় হবে, কতটি শেড নির্মাণ হবে- সেসব বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রকল্প তৈরি হবে। এরপর বলা যাবে। আমাদের আরও দুই মাস সময় লাগবে। আমরা প্রকল্প চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়কে দেবো। তারা তাদের পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করবে। কিছুটা সময় তো লাগবেই।’

বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বড় উপায় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি মন্তব্য করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক আরও বলেন, ‘মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। এটা তো সচেতনতার অভাব। আর যেখানে স্বল্প সময়ের মধ্যে কৃষকরা আশ্রয় নিতে পারেন না, সেখানে শেড নির্মাণ করবো।’

বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমাতে কাজ করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’। ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বজ্রপাতে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৯৮ জন মৃত্যুবরণ করেছে। এদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর গড়ে ৩০০-৩৫০ জন লোকের প্রাণহানি ঘটে।’

তিনি বলেন, ‘বজ্রপাত থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে সচেতনতা। আমাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত লোকজনও বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় জানেন না। আকাশে কালো মেঘ দেখা গেলে এবং বৃষ্টি হলে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নিষেধ। অথচ কৃষকসহ বহু মানুষ তা উপেক্ষা করে কাজ করেন। এমনকি শিক্ষিত মানুষও বৃষ্টি হলে গাছের নিচে অবস্থান করেন। অথচ গাছের নিচে অবস্থান করা মানে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।’

রাশিম মোল্লা বলেন, ‘বজ্রপাত থেকে মানুষের মৃত্যু কমাতে আমরা পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা, বজ্রপাতের অন্তত ৩০ মিনিট আগে পূর্বাভাস জানা যায়— এ তথ্য দ্রুত হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশের মানুষকে টেলিফোনের মাধ্যমে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া, সচেতনতা বাড়াতে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পর্যাপ্ত সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা, মাঠে মাঠে শেল্টার সেন্টার স্থাপন এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’

বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে হাওড়াঞ্চলে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলো অনুমোদন পায়নি। মাঠে কাজ করতে দিয়ে যেখানে কৃষকরা মারা যান, সেখানে আসলে তেমন কোনো স্থাপনা নেই।’

তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কোনো প্রকল্প মন্ত্রণালয় পর্যায়ে উপস্থাপন করলে হয়তো তখন তা পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য বিবেচনা করা হবে।’

বজ্রপাতে এক যুগে ৩৪২৫ জনের মৃত্যু

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে গত ১২ বছরে দেশে ৩ হাজার ৪২৫ জন মারা গেছেন। তবে বলা হয়, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩০৭ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ১৫৮ জন, ২০২০ সালে ২৫৫ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩৫০ জন, ২০২৪ সালে ২৪৩ ও ২০২৫ সালে ২৬৬ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন।

ব্যর্থ যত সব উদ্যোগ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর) টাকা দিয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটেনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়েছে। বলতে গেলে এ পদক্ষেপ কাজে আসেনি। এতে অনিয়ম-দুর্নীতি তো ছিলই। বজ্রপাত ঠেকাতে তালগাছ রোপণের কর্মসূচিও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাতিল করা হয়। এছাড়া বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কয়েক দফা প্রকল্প নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।

টিআর নীতিমালা সংশোধন করে বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি রোধে ১৫টি জেলায় ‘বজ্র নিরোধক দণ্ড, বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার)’ স্থাপনে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

টাকা খরচ দেখানো হলেও অনেক জায়গায় বসেনি কোনো বজ্র নিরোধক দণ্ড ও বজ্রনিরোধক যন্ত্র। এ নিয়ে বহু চিঠি চালাচালি ও তদন্তও করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জেলায় ৩৪৩টি বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্র নিরোধক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব দণ্ডের বেশিরভাগই হাওরের মাঝখানে বা মূল ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না বসিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার বা বসতিপূর্ণ এলাকায় বসানো হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব দণ্ডও অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে।

২০২২ সালে বজ্রপাতপ্রবণ ১৫ জেলায় মৃত্যু ঠেকাতে একটি প্রকল্প নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় এক ডেসিমেল জায়গায় কনক্রিটের শেল্টার করা হবে। বজ্রপাতের সময় মাঠে কাজ করা বা খোলা জায়গায় থাকা মানুষ সেখানে আশ্রয় নেবে। এক কিলোমিটার অন্তর অন্তর নির্মাণ করা হবে একেকটি শেল্টার। একই সঙ্গে বসানো হবে বজ্র নিরোধক যন্ত্র, এসব যন্ত্র ১০০ মিটার এলাকা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দেবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ১৫ জেলায় বজ্রপাতের ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আগে মানুষের মোবাইল ফোনে সতর্ক করে মেসেজ যাবে। কিন্তু, প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়নি।

সচেতনতা তৈরি: সাড়া দিচ্ছেন না ডিসিরা

বজ্রপাতের ঝুঁকি নিরসনে জনসচেতনতা বাড়াতে গত মাসে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে চিঠি দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের লেখা চিঠিতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিগত বছরগুলোতে বজ্রপাতে কমবেশি ৩০০ থেকে ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এ ধারাবাহিকতা চলমান। জনসচেনতা বৃদ্ধিই বজ্রপাতে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকরী পন্থা।

দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯ (এসওডি) অনুযায়ী, ফোকাল পয়েন্ট অপারেশনাল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (এফপিওসিজি) সভায় জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানের সময় বজ্রবৃষ্টি ও বজ্রপাতের সতর্কীকরণ জরুরি বার্তা প্রচারের সুপারিশ করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সর্বসাধারণের জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি মসজিদে প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে সুবিধাজনক সময়ে বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ক সতর্কবার্তা প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। এছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় উপসনালয়েও সুবিধাজনক সময়ে একই ধরনের সতর্কীকরণ বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এ সংক্রান্ত গৃহীত কার্যক্রমের ওপর মাসিক প্রতিবেদন আবশ্যিকভাবে প্রেরণ করতে হবে।

এমতাবস্থায়, জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ক সতর্কীকরণ কার্যক্রম গ্রহণ এবং এ সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ডিসিদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছেই, আলোর মুখ দেখে না প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগ

আপডেট টাইম : ১২:১৩:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

আকাশে মেঘ করলেই মনের অজান্তে এখন এক শঙ্কা কাজ করে, ‘বজ্রপাত হবে না তো?’ কার্যত বাংলাদেশে এখন বজ্রপাত নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে, যা প্রতি বছর কেড়ে নিচ্ছে শতশত মানুষের প্রাণ। একসময় এটিকে মৌসুমি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রকোপ ও প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। বজ্রপাতে এখন সারাবছরই ঘটছে প্রাণহানি।

বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রতি বছর গড়ে ৩০০ জনের মতো মানুষ মারা যাচ্ছে। চলতি বছরের চার মাস অতিবাহিত না হতেই মৃত্যু হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষের। কিন্তু, বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল রোধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প প্রণয়ন করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও খুব একটা কাজে আসেনি। যদিও বজ্রপাতে মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৬ সালের মে মাসে বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

প্রতীকী ছবি

আবহাওয়া ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়া, পরিবেশ দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটাসহ নানান কারণে বজ্রপাত বেড়ে গেছে, এতে মৃত্যুও বাড়ছে। প্রতি বছর শতশত কৃষক, প্রান্তিক মানুষ মারা যাচ্ছেন।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে সচেতনতা। সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে একটি প্রকল্প নেওয়ার কাজও চলছে।

গত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে নেত্রকোনার ডিসি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে সেই প্রস্তাবের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। মন্ত্রণালয় থেকে তা পাঠানো হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে। এরপর অধিদপ্তর এটা নিয়ে কাজ করছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন করে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণ করা হবে। আকাশে বজ্রমেঘ দেখলেই কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারবেন। প্রকল্প প্রণয়নের জন্য উপজেলা পর্যায় থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে প্রকল্প চূড়ান্ত করা হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ রোববার (২৬ এপ্রিল) দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।এর মধ্যে গাইবান্ধায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুজন, জামালপুরে দুজন, ঠাকুরগাঁওয়ে দুজন, বগুড়ায় একজন, নাটোরে একজন ও পঞ্চগড়ে একজন মারা গেছেন। এসব ঘটনায় অনেকে আহত হয়েছেন।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল (৫ বৈশাখ) একদিনে বজ্রপাতে সর্বাধিক ১৩ জনের মৃত্যু হয়। বৈশাখের আগেও বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছিল কমপক্ষে ৩০ জনের। ৪৩ জনের মধ্যে পুরুষ ৩৮ জন; নারী দুজন আর তিনজন শিশুও মারা গেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনই কৃষক।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাধারণত মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর দিকে বজ্রপাতের মৌসুম শুরু হয়। জুন ও জুলাই পর্যন্ত তা থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেখা গেছে, এখন বজ্রপাতের কোনো হিসাব মিলছে না। বর্ষাকালেও এখন বজ্রপাত হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা বজ্রপাতের বিষয়ে মানুষের সচেতন করার কাজটি করছি। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। আমাদের এক পৃষ্ঠার একটি সতর্কবার্তা আছে, সেটা আমরা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি যেন মানুষ সচেতন হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও এ সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করছি।’

বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে হাওড়াঞ্চলে

অতিরিক্ত সচিব আরও বলেন, ‘২০২১-২২ অর্থবছরে ১৫টি বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় টিআর কর্মসূচির আওতায় ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এ টাকা দিয়ে ওই এলাকায় ৩৪৩টি বজ্র নিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর একটি প্রকল্প প্রণয়নে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতে মৃত্যুরোধে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণ করা হবে। এ শেডে বজ্র নিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। এ শেড কৃষকরা ধান মাড়াই, স্বল্প সময়ের জন্য ধান মজুতসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা হবে।’

মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন আরও বলেন, ‘সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার জেলার সব উপজেলা থেকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাব পেলে আমরা প্রকল্প নেবো। প্রাথমিকভাবে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। তবে জেলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সব প্রস্তাব পাওয়ার পর একটার সম্ভাব্যতা যাচাই হবে।’

‘মাঠ ও হাওরের কৃষকরা যেখানে কাজ করেন, আশপাশে কোথাও আশ্রয় নেওয়ার জায়গা নেই, সেখানে এ মাল্টিপারপাস শেডগুলো নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক বিঘা জমির ‍ওপর এটা হবে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক বলেন, ‘প্রতিটি শেড করতে কত টাকা লাগবে, পুরো প্রকল্পের কত ব্যয় হবে, কতটি শেড নির্মাণ হবে- সেসব বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়। প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রকল্প তৈরি হবে। এরপর বলা যাবে। আমাদের আরও দুই মাস সময় লাগবে। আমরা প্রকল্প চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়কে দেবো। তারা তাদের পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করবে। কিছুটা সময় তো লাগবেই।’

বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুরোধে সবচেয়ে বড় উপায় হলো সচেতনতা বৃদ্ধি মন্তব্য করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক আরও বলেন, ‘মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়ে বজ্রপাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। এটা তো সচেতনতার অভাব। আর যেখানে স্বল্প সময়ের মধ্যে কৃষকরা আশ্রয় নিতে পারেন না, সেখানে শেড নির্মাণ করবো।’

বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমাতে কাজ করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরাম’। ফোরামের সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বজ্রপাতে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৫৯৮ জন মৃত্যুবরণ করেছে। এদের ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর গড়ে ৩০০-৩৫০ জন লোকের প্রাণহানি ঘটে।’

তিনি বলেন, ‘বজ্রপাত থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে সচেতনতা। আমাদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষিত লোকজনও বজ্রপাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার উপায় জানেন না। আকাশে কালো মেঘ দেখা গেলে এবং বৃষ্টি হলে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নিষেধ। অথচ কৃষকসহ বহু মানুষ তা উপেক্ষা করে কাজ করেন। এমনকি শিক্ষিত মানুষও বৃষ্টি হলে গাছের নিচে অবস্থান করেন। অথচ গাছের নিচে অবস্থান করা মানে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।’

রাশিম মোল্লা বলেন, ‘বজ্রপাত থেকে মানুষের মৃত্যু কমাতে আমরা পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত বিষয়ক অধ্যায় যুক্ত করা, বজ্রপাতের অন্তত ৩০ মিনিট আগে পূর্বাভাস জানা যায়— এ তথ্য দ্রুত হাওরাঞ্চলসহ সারাদেশের মানুষকে টেলিফোনের মাধ্যমে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া, সচেতনতা বাড়াতে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পর্যাপ্ত সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা, মাঠে মাঠে শেল্টার সেন্টার স্থাপন এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’

বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে হাওড়াঞ্চলে

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব আবু দাউদ মো. গোলাম মোস্তফা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বজ্রপাতে মৃত্যু প্রতিরোধে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলো অনুমোদন পায়নি। মাঠে কাজ করতে দিয়ে যেখানে কৃষকরা মারা যান, সেখানে আসলে তেমন কোনো স্থাপনা নেই।’

তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কোনো প্রকল্প মন্ত্রণালয় পর্যায়ে উপস্থাপন করলে হয়তো তখন তা পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য বিবেচনা করা হবে।’

বজ্রপাতে এক যুগে ৩৪২৫ জনের মৃত্যু

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে গত ১২ বছরে দেশে ৩ হাজার ৪২৫ জন মারা গেছেন। তবে বলা হয়, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৭০ জন, ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩০৭ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ১৫৮ জন, ২০২০ সালে ২৫৫ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩৫০ জন, ২০২৪ সালে ২৪৩ ও ২০২৫ সালে ২৬৬ জন বজ্রপাতে মারা গেছেন।

ব্যর্থ যত সব উদ্যোগ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির (টিআর) টাকা দিয়ে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটেনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করা হয়েছে। বলতে গেলে এ পদক্ষেপ কাজে আসেনি। এতে অনিয়ম-দুর্নীতি তো ছিলই। বজ্রপাত ঠেকাতে তালগাছ রোপণের কর্মসূচিও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাতিল করা হয়। এছাড়া বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় কয়েক দফা প্রকল্প নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি।

টিআর নীতিমালা সংশোধন করে বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি রোধে ১৫টি জেলায় ‘বজ্র নিরোধক দণ্ড, বজ্রনিরোধক যন্ত্র (লাইটনিং অ্যারেস্টার)’ স্থাপনে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। এক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

টাকা খরচ দেখানো হলেও অনেক জায়গায় বসেনি কোনো বজ্র নিরোধক দণ্ড ও বজ্রনিরোধক যন্ত্র। এ নিয়ে বহু চিঠি চালাচালি ও তদন্তও করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ জেলায় ৩৪৩টি বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্র নিরোধক যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব দণ্ডের বেশিরভাগই হাওরের মাঝখানে বা মূল ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না বসিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার বা বসতিপূর্ণ এলাকায় বসানো হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব দণ্ডও অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে।

২০২২ সালে বজ্রপাতপ্রবণ ১৫ জেলায় মৃত্যু ঠেকাতে একটি প্রকল্প নেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় এক ডেসিমেল জায়গায় কনক্রিটের শেল্টার করা হবে। বজ্রপাতের সময় মাঠে কাজ করা বা খোলা জায়গায় থাকা মানুষ সেখানে আশ্রয় নেবে। এক কিলোমিটার অন্তর অন্তর নির্মাণ করা হবে একেকটি শেল্টার। একই সঙ্গে বসানো হবে বজ্র নিরোধক যন্ত্র, এসব যন্ত্র ১০০ মিটার এলাকা বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দেবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় ১৫ জেলায় বজ্রপাতের ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আগে মানুষের মোবাইল ফোনে সতর্ক করে মেসেজ যাবে। কিন্তু, প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন পায়নি।

সচেতনতা তৈরি: সাড়া দিচ্ছেন না ডিসিরা

বজ্রপাতের ঝুঁকি নিরসনে জনসচেতনতা বাড়াতে গত মাসে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে চিঠি দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের লেখা চিঠিতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিগত বছরগুলোতে বজ্রপাতে কমবেশি ৩০০ থেকে ৪০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এ ধারাবাহিকতা চলমান। জনসচেনতা বৃদ্ধিই বজ্রপাতে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকরী পন্থা।

দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি ২০১৯ (এসওডি) অনুযায়ী, ফোকাল পয়েন্ট অপারেশনাল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (এফপিওসিজি) সভায় জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানের সময় বজ্রবৃষ্টি ও বজ্রপাতের সতর্কীকরণ জরুরি বার্তা প্রচারের সুপারিশ করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

সর্বসাধারণের জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি মসজিদে প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে সুবিধাজনক সময়ে বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ক সতর্কবার্তা প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক। এছাড়া অন্যান্য ধর্মীয় উপসনালয়েও সুবিধাজনক সময়ে একই ধরনের সতর্কীকরণ বার্তা প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং এ সংক্রান্ত গৃহীত কার্যক্রমের ওপর মাসিক প্রতিবেদন আবশ্যিকভাবে প্রেরণ করতে হবে।

এমতাবস্থায়, জেলার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বজ্রপাতে করণীয় বিষয়ক সতর্কীকরণ কার্যক্রম গ্রহণ এবং এ সংক্রান্ত মাসিক প্রতিবেদন প্রেরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ডিসিদের অনুরোধ জানিয়েছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।