বিরল পরিযায়ী বড় শে^ত-কপাল রাজহাঁসের খোঁজে চুয়াডাঙ্গার পাখিপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ ও তার দুই সঙ্গীকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের ভারত সীমান্তবর্তী চরইল বিলে এসেছি। আগের দিন রহনপুরের বিশিষ্ট পাখি সংরক্ষক ও স্কুলশিক্ষক মাশওয়ারুল হক জিকেনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি বিপ্লব মাঝিকে বলে রেখেছিলেন পাখি দেখার ব্যবস্থা করতে। বিলের কোথায় কোন পাখি পাওয়া যায় তা তার নখদর্পণে। রাজশাহী থেকে ভোর ৬টা ১০ মিনিটে লোকাল ট্রেনে উঠে ঠিক দুই ঘণ্টা ২০ মিনিটে রহনপুর পৌঁছলাম। স্টেশনের পাশে নাস্তা সেরে পুনর্ভবা নদী পার হয়ে অটোতে করে ৬ কিলোমিটার দূরের চরইল বিলে পৌঁছলাম সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে।
ঘাটে নৌকা বাঁধাই ছিল। বিপ্লব, মিলন ও নির্বাচন এই তিন মাঝির তিনটি নৌকা নিয়ে আমাদেরসহ মোট তিনটি দল নিয়ে একসঙ্গে রওনা হলো। কিন্তু পুরো বিলজুড়ে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট ঘুরেও রাজহাঁসটির দেখা পেলাম না। তবে এর মধ্যেই ২৫-৩০ প্রজাতির জলচর পাখির ছবি তুলে ফেলেছি যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হাঁসও ছিল। অবশ্য বেলা ১১টা ৩১ মিনিটে রাজহাঁসেরও দেখা পেয়ে গেলাম। হাঁসের মিশ্র ঝাঁক বিলের পানি থেকে যখন উড়ছিল তখন পুরো আকাশজুড়ে যেন হাঁসের মেলা বসে গিয়েছিল! হাঁসের ঝাঁকে চখাচখি, পিনপুচ্ছ, সোনা দিঘেরি, পিয়ং, খুন্তে, বামুনিয়া ও মৌলভী হাঁস ছিল। সবচেয়ে বেশি ছিল লালচে-কমলা রঙের চখাচখি। সতেরো জানুয়ারি ২০২৬-এর ঘটনা এটি। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েক প্রজাতির হাঁসের পরিচয় এখানে দেওয়া হলো।
চখাচখি : বাংলাদেশের প্রকৃতিতে প্রথম এদের দেখি রাজশাহীর পদ্মা নদীর চরে ২০১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি। এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী হাঁসটি চকা-চকি, লাল চখা, লালা বা মানিকজোড় হাঁস নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Ruddy Shelduck ev Brahminy Duck। বৈজ্ঞানিক নাম Tadorna ferruginea (টাডরনা ফেরুজিনিয়া) । দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ থেকে মধ্য এশিয়া, বৈকাল হ্রদ ও মঙ্গোলিয়া হয়ে চীনের পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত এরা বিস্তৃত। তবে পশ্চিম আফ্রিকা ও ইথিওপিয়াতেও কিছু আবাসিক পাখি দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৫৮-৭০ সেন্টিমিটার (সেমি), প্রসারিত ডানা ১১০-১৩৫ সেমি ও ওজন ৯২৫-১,৬৪০ গ্রাম।
পিনপুচ্ছ হাঁস : পিনের আগার মতো চোখা লেজের সুদর্শন হাঁসগুলোর প্রথম দেখি ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটে। এরপর ২০১৪ সালের শীতে বিশাল ঝাঁক দেখলাম মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্য ও জুড়ির হাকালুকি হাওরে। সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী হাঁসটির অন্য নাম কালদিঘেড়ি, দিগহাঁস, শোলবড়ো, শোলঞ্চ বা লেনজা হাঁস। পশ্চিমবঙ্গে বলে বড় দিগর। বৈজ্ঞানিক নাম Anas acuta (অ্যানাস অ্যাকুটা)। মূলত আলাস্কা, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সাইবেরিয়া ও মঙ্গোলিয়ার বাসিন্দা। দৈর্ঘ্যে হাঁসা ৫৯-৭৬ ও হাঁসি ৫২-৬৪ সেমি হয়। হাঁসার ওজন ৪৫০-১,৩৬০ ও হাঁসির ওজন ৪৫৪-১,১৩৫ গ্রাম।
পান্তামুখী হাঁস : বেলচার মতো ঠোঁটের চমৎকার হাঁসগুলোকে প্রথম দেখি ওদের মূল আবাস কানাডাতে ১৯৯৮ সালে। এরপর বহুবার বাইক্কা বিল, টাঙ্গুয়ার হাওর, রাজশাহীর পদ্মার চর ও কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে দেখেছি। সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী হাঁসটি খুন্তে, চামচঠুঁটি, কোদাইল্লা হাঁস বা চোরাট নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম Spatula clypeata (স্প্যাচুলা ক্লাইপিয়েটা)। মূল আবাস ইউরোপ, সাইবেরিয়া, মধ্য এশিয়া ও উত্তর আমেরিকা। দৈর্ঘ্য ৪৪-৫২ সেমি। ওজনে হাঁসা ও হাঁসি যথাক্রমে ৪৭০-১,০০০ ও ২৪০-৫৮৫ গ্রাম।
সোনা দিঘেরি : ছোট্ট এই হাঁস প্রজাতিটিকে প্রথম দেখি ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলে। সচরাচর দৃশ্যমান হাঁসটি বিশে^র অন্যতম ক্ষুদ্রাকার হাঁস। নারৈব, পাতারি, পেরি, সবুজডানা হাঁস বা তুলসিবিগ্রি (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম অহধং পৎবপপধ (অ্যানাস ক্রিক্কা)। মূলত যুক্তরাজ্যসহ উত্তর গোলার্ধের বাসিন্দা। দৈর্ঘ্য ৩৪-৩৮ সেমি। হাঁসা ও হাঁসির ওজন যথাক্রমে ২৫০-৪৫০ ও ২০০-৪০০ গ্রাম।
নাইরলি হাঁস : এ দেশের বহুল দৃশ্যমান পরিযায়ী হাঁসটিকে প্রথম দেখি শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলে ২০১৪ সালের ১৬ জানুয়ারি। গাঙ রৈব, জিরিয়া বা ইটাপেরি হাঁস নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম ঝঢ়ধঃঁষধ য়ঁবৎয়ঁবফঁষধ (স্প্যাচুলা কোয়েরকোয়েডুলা)। মূল আবাস ইউরোপ ও সাইবেরিয়ার তুন্দ্রা অঞ্চলে। দৈর্ঘ্য ৩৭-৪১ সেমি। হাঁসা ও হাঁসির ওজন যথাক্রমে ২৬০-৫২০ ও ২৪০-৫৮৫ গ্রাম।
পিয়ং হাঁস : একসময় মিরপুরের বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে অন্য প্রজাতির হাঁসের সঙ্গে প্রচুর পিয়ং হাঁস দেখেছি। কিন্তু নানা কারণে এখন ওরা চিড়িয়াখানার লেকে আসে না। সর্বশেষ ২০১১ সালে লেকে ১৮টি হাঁস দেখেছিলাম। সচরাচর দৃশ্যমান পরিযায়ী হাঁসটি পিয়াং, পিইং (পশ্চিমবঙ্গ) বা পেঁচি নাইরলি হাঁস নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিক নাম গধৎবপধ ংঃৎবঢ়বৎধ (মারেকা স্ট্রেপেরা)। মূলত উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও সাইবেরিয়ার আবাসিক পাখি এরা। দেহের দৈর্ঘ্য ৪৬-৫৬ সেমি। ওজনে হাঁসা ও হাঁসি যথাক্রমে ৯৯০ ও ৮৫০ গ্রাম।
চরইল বিলে দেখা বিভিন্ন প্রজাতির হাঁসগুলো প্রচণ্ড শীতের কবল ও খাদ্যাভাব থেকে বাঁচার জন্য শীতে পরিযায়ী হয়ে এ দেশে আসে। যুগ যুগ ধরেই চরইল বিলসহ দেশের বিভিন্ন বিল-হাওর-বাঁওড়-নদী-জলাশয়ে এরা আসছে। এরা মোটেও এ দেশের অতিথি নয়, বরং জীববৈচিত্র্যের অংশ। তবে প্রতি শীতে কিছু লোভী পাখি শিকারি সুন্দর এই হাঁসগুলোকে শিকারের জন্য ওত পেতে থাকে। এসব শিকারির হাত থেকে এদের রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।
Reporter Name 
























