ঢাকা ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
যেসব জেলায় বইছে তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির পূর্বাভাসে যা জানাল আবহাওয়া অফিস সোহরাওয়ার্দীতে খেলাফত মজলিসের সমাবেশে মানুষের ঢল আকাশ ভরা হাঁসের মেলা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আগামীকাল, অংশ নিচ্ছেন সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী মোজতবা খামেনির বার্তা ইরানের শক্তিশালী ‘জাতীয় ঐক্য’ শত্রুপক্ষের জন্য বড় ‘ধাক্কা’ বিগত সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হয়েছিলো: আইনমন্ত্রী শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে: জাতিসংঘ শিক্ষিকার সঙ্গে বিএনপি নেতার হাতাহাতির নেপথ্যে কী আশ্বাসের পরও অন্ধকারে পাহাড়ের ‘অনাথ’ জনপদ, ১২ দিন ধরে কাঁধে অসুস্থ রোগী, মিলছে না ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা সিলেটে বিশেষ অভিযানে ৩২ ঘণ্টায় আটক ৭৭

আশ্বাসের পরও অন্ধকারে পাহাড়ের ‘অনাথ’ জনপদ, ১২ দিন ধরে কাঁধে অসুস্থ রোগী, মিলছে না ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৩:৩৫:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • ২ বার

Oplus_16908288

রাজেন্দ্র দেব মন্টুঃ পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই—এমনই এক করুণ চিত্র ভেসে উঠেছে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী দুর্গম জনপদে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপির ‘দুর্গম পাহাড়ে চিকিৎসা সেবায় কোনো ত্রুটি থাকবে না’—এমন নির্দেশনার মাত্র একদিন পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি দৃশ্য যেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

বিচ্ছিন্ন জনপদ, অবহেলার দীর্ঘ ছায়াঃ
রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়নের সত্তা এলাকা, খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়ন এবং চট্টগ্রামের সীমান্তঘেঁষা জনপদ—এই তিন জেলার সংযোগস্থলে বসবাসকারী প্রায় ১৫ হাজার মানুষ আজও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় অঞ্চলটি কার্যত ‘অনাথ’ জনপদে পরিণত হয়েছে।

সত্তা খালের ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটঃ
এ অঞ্চলের মানুষের আরেক বড় দুর্ভোগ সত্তা খালের ভাঙন। শুষ্ক মৌসুমে খালটি শুকিয়ে গেলেও বর্ষায় তা রূপ নেয় ভয়াবহ স্রোতে—ভেঙে যায় দুই পাড়, বিলীন হয় বসতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি উত্থাপিত হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

২০২১ সালের ২৩ আগস্ট সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার পানি উন্নয়ন বোর্ডে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। সে সময় প্রতিনিধি দল এলাকা পরিদর্শন করলেও পরবর্তীতে কাজ থমকে যায়।

বাঁশের দোলায় ঝুলছে জীবনঃ
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ১২ দিন ধরে অসুস্থ এক রোগীকে প্লাস্টিকের চেয়ার ও বাঁশ দিয়ে তৈরি দোলায় করে কাঁধে তুলে প্রায় ১০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসা সুবিধার এই ভয়াবহ সংকট যেন পাহাড়ি জনপদের বাস্তবতাকেই নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।

জনপ্রতিনিধিদের ক্ষোভঃ
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুপার জ্যেতি চাকমা বলেন,
“আমরা কি রাষ্ট্রের নাগরিক নই? এখনো রোগীকে কাঁধে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। দ্রুত একটি হাসপাতাল ও সড়ক নির্মাণ জরুরি।”

অন্যদিকে, কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ধন কুমার চাকমা বলেন,
“তিন জেলার সংযোগস্থলে হওয়ায় আমরা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছি। কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। সত্তা খালের ভাঙন আমাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।”

শিক্ষা-বিদ্যুতে অন্ধকারঃ
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যুৎ ও যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে শিক্ষাব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। শিক্ষক আশুতোষ চাকমা জানান, “এই অঞ্চলে শিক্ষার পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।” শিক্ষার্থী চম্পা চাকমা বলেন, “আমাদের এই অন্ধকার জনপদে দ্রুত বিদ্যুৎ ও একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল স্থাপন করা হোক।”

আলোর প্রত্যাশায় জনপদঃ

সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন হবে কি না—সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—একটি পাকা সড়ক, একটি কার্যকর হাসপাতাল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।

আশ্বাসের ভিড়ে তারা এখন বাস্তব পরিবর্তনের অপেক্ষায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

যেসব জেলায় বইছে তাপপ্রবাহ, বৃষ্টির পূর্বাভাসে যা জানাল আবহাওয়া অফিস

আশ্বাসের পরও অন্ধকারে পাহাড়ের ‘অনাথ’ জনপদ, ১২ দিন ধরে কাঁধে অসুস্থ রোগী, মিলছে না ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা

আপডেট টাইম : ০৩:৩৫:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

রাজেন্দ্র দেব মন্টুঃ পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই—এমনই এক করুণ চিত্র ভেসে উঠেছে রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী দুর্গম জনপদে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এমপির ‘দুর্গম পাহাড়ে চিকিৎসা সেবায় কোনো ত্রুটি থাকবে না’—এমন নির্দেশনার মাত্র একদিন পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি দৃশ্য যেন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

বিচ্ছিন্ন জনপদ, অবহেলার দীর্ঘ ছায়াঃ
রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়নের সত্তা এলাকা, খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ইউনিয়ন এবং চট্টগ্রামের সীমান্তঘেঁষা জনপদ—এই তিন জেলার সংযোগস্থলে বসবাসকারী প্রায় ১৫ হাজার মানুষ আজও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় অঞ্চলটি কার্যত ‘অনাথ’ জনপদে পরিণত হয়েছে।

সত্তা খালের ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটঃ
এ অঞ্চলের মানুষের আরেক বড় দুর্ভোগ সত্তা খালের ভাঙন। শুষ্ক মৌসুমে খালটি শুকিয়ে গেলেও বর্ষায় তা রূপ নেয় ভয়াবহ স্রোতে—ভেঙে যায় দুই পাড়, বিলীন হয় বসতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি উত্থাপিত হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

২০২১ সালের ২৩ আগস্ট সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার পানি উন্নয়ন বোর্ডে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। সে সময় প্রতিনিধি দল এলাকা পরিদর্শন করলেও পরবর্তীতে কাজ থমকে যায়।

বাঁশের দোলায় ঝুলছে জীবনঃ
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ১২ দিন ধরে অসুস্থ এক রোগীকে প্লাস্টিকের চেয়ার ও বাঁশ দিয়ে তৈরি দোলায় করে কাঁধে তুলে প্রায় ১০ কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

চিকিৎসা সুবিধার এই ভয়াবহ সংকট যেন পাহাড়ি জনপদের বাস্তবতাকেই নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।

জনপ্রতিনিধিদের ক্ষোভঃ
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সুপার জ্যেতি চাকমা বলেন,
“আমরা কি রাষ্ট্রের নাগরিক নই? এখনো রোগীকে কাঁধে করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। দ্রুত একটি হাসপাতাল ও সড়ক নির্মাণ জরুরি।”

অন্যদিকে, কাউখালী উপজেলার ফটিকছড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ধন কুমার চাকমা বলেন,
“তিন জেলার সংযোগস্থলে হওয়ায় আমরা প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছি। কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। সত্তা খালের ভাঙন আমাদের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।”

শিক্ষা-বিদ্যুতে অন্ধকারঃ
স্থানীয়দের মতে, বিদ্যুৎ ও যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে শিক্ষাব্যবস্থাও ভেঙে পড়ছে। শিক্ষক আশুতোষ চাকমা জানান, “এই অঞ্চলে শিক্ষার পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।” শিক্ষার্থী চম্পা চাকমা বলেন, “আমাদের এই অন্ধকার জনপদে দ্রুত বিদ্যুৎ ও একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল স্থাপন করা হোক।”

আলোর প্রত্যাশায় জনপদঃ

সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন হবে কি না—সে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা খুবই সাধারণ—একটি পাকা সড়ক, একটি কার্যকর হাসপাতাল এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।

আশ্বাসের ভিড়ে তারা এখন বাস্তব পরিবর্তনের অপেক্ষায়।