কৃষক আব্দুল হাই (৫৯)। পুরো পরিবারের খাওয়াদাওয়া, বাচ্চাদের লেখাপড়াসহ সব খরচই আসে ধান থেকে। শ্রমে-ঘামে ফলানো সেই ধান এবার পাকার দুই সপ্তাহ আগেই তলিয়ে গেছে পানিতে। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় দিশাহারা তিনি।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রানাগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল হাইয়ের পরিবারের সদস্য ৭ জন। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টিতে হাওরে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তার মতো ফসলের ক্ষতিতে জেলার হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা। ফসল হারিয়ে অসহায় তারা। একদিকে ফসল ডুবছে, অন্যদিকে কোনো কোনো হাওরে ফসল রক্ষায় বাঁধ তৈরি করে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকেরা।
পানি নিষ্কাশনের জন্য অনেক হাওরে বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও পাম্প বসিয়ে ব্যবস্থা করা হচ্ছে পানি সরানোর। আবার কোনো কোনো হাওরে জলাবদ্ধতায় ডুবে গেছে নিচু অঞ্চলের ফসল।
একই এলাকার বড়কাপন গ্রামের কৃষক শাহেদ মিয়ার আড়াই একর জমি তলিয়ে গেছে অতিবৃষ্টিতে। ৬ সদস্যের পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনিও। সব জমির ফসল তলিয়ে যাওয়ায় পাগলপ্রায় তিনি।
শনিবার সকালে তলিয়ে যাওয়া জমিতে নেমে দেখেন খেতে অন্তত সাত ফুট পানি। পানির নিচে ডুবে ডুবে ধান তুলছিলেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ধানটা পাকলে কাটার চেষ্টা করতাম। মনরে বোঝ দিতাম। কাঁচা ধান ডুবরায় (জলাবদ্ধতা) চোখের সামনে পচে যাচ্ছে। এই চিন্তায় রাইতে ঘুম অয় না। জমির ফসল দুই সপ্তাহ পরেই কাটা যেত। এমন সময় সব তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে, পানি না কমলে বাকি জমিও তলিয়ে যাবে। এখন এসব জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে।’

একই এলাকার বড়কাপন সুনীল সরকার (৬০) বলেন, ‘জমি আবাদ করতে গিয়ে ধার-দেনা করতে হয়েছে। এখন সেই ঋণ কীভাবে দেবো? আর বাকি বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায় আছি।’
তিনি বলেন, ‘কিবায় কিতা করমু। বুকটা ভাঙি যায়। কিবায় চলমু। সরকারে ত কুনতা করলো না, সব ধান গেলগা।’
হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতা মো. নুরুল আমিন জানান, তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জলাবদ্ধতায় অন্তত ১৫-২০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের কারণেই অনেক হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। নদী, খাল-বিল খনন হয় না। এসব ভরাট হয়ে গেছে। এজন্য কৃষকেরা আহাজারি করছেন। এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোনো উদ্যোগ নেই। কৃষকরা কাঁদছেন আর তারা শুধু পরিদর্শন করেই দায় সারছেন।’
কলমাকান্দার বড়কাপন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জলাবদ্ধতার খবর পেয়ে কয়েকটি গ্রামের দুই শতাধিক কৃষককে নিয়ে অন্তত তিনটি স্থানে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ দিয়েছি। যাতে নতুন করে আর কোনো হাওর ডুবে না যায়। গত চারদিন ধরে আমরা রাত জেগে বাঁধ পাহারা দিচ্ছি, যেন কেউ বাঁধ কেটে না দেয়। তবে এ ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের আরও সোচ্চার হওয়া দরকার। না হলে কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিবৃষ্টিতে জেলার মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা, চরহাইজদা, চন্দ্রাসোনারতাল,শয়তানখালী, খালিয়াজুরী উপজেলার কীর্তনখলা, পাঙ্গাসিয়া, কটিচাপড়া, লক্ষীপাশা, বোয়ালী, জগন্নাথপুর, বিলবিল্লিয়াসহ মদন ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কয়েকটি হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তবে জেলা কৃষি বিভাগের কাছে সেই ক্ষতির কোনো সঠিক হিসাব নেই। তারা জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি হিসেব করে জানানো হবে।
জেলায় এ বছর ১ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে হাওরে হয়েছে ৪২ হাজার হেক্টর। দেরিতে বাঁধে মাটি কাটায় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে হাওড়ের ফসলে। মধ্য এপ্রিল থেকে পুরোদমে হাওরে ধান কাটা শুরু হয়।
জানতে চাইলে কৃষিবিদ দিলীপ সেন বলেন, ‘জলাবদ্ধতায় ধানগাছ যদি ৫ থেকে ৬ দিন নিমজ্জিত থাকে, তাহলে ক্ষতি হবে। এর আগে যদি পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। তবে থোড়ে পানি লাগলে ধানে চিটা হওয়ার সম্ভবনা বেড়ে যাবে।’

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, জেলায় পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ আছে। এ বছর ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে ২০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কিমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে। এর বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩০ কোটি ৫২ লাখ টাকা। গঠিত ২০২টি পিআইসির মধ্যে খালিয়াজুরিতে ১৪৩টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি ও কলমাকান্দায় ১০টি রয়েছে।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘হাওড়ের সবগুলো বাঁধেই মাটি কাটার কাজ শেষ হয়েছে। বাঁধে ঘাসও লাগানো হয়েছে। নিন্মাঞ্চলের কিছুটা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। আর বৃষ্টিপাত না হলে খুব বেশি ক্ষতি হবে না।’
জেলা প্রশাসক ও হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি খন্দাকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘হাওড়ে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে সর্বোচ্চ তদারকি করা হচ্ছে। প্রতিটি বাঁধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অতিবৃষ্টিতে কিছু কিছু নিচু এলাকায় কৃষকের বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়া খবর পেয়েছি। হাওরে ফসল রক্ষায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।’
এদিকে জেলার কলমাকান্দাসহ বেশ কিছু হাওরে বছরের একমাত্র ফসল টেকাতে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণ করছে এলাকাবাসী। কৃষকের বাঁধ নির্মাণের খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত পরিকল্পিত বাঁধসহ নদী খাল খনন পরিদর্শন করে স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপি।
তিনি বলেন, আমিও কৃষকের সন্তান। শৈশবে বাবার সঙ্গে আমিও ফসল রক্ষা করতে বাঁধে মাটি কেটেছি। এখন এই দুর্ভোগের জন্য অবশ্যই রাষ্ট্র দায়ী। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কৃষকের এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন,নদী-খাল খনন করা হবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে আশা করছি কৃষকদের এই সংকট কমবে।’
Reporter Name 






















