শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড় অঞ্চলের দিগন্তজোড়া পাহাড়ী ঢালে এখন অর্থকরী ফসল কফি চাষে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, উর্বর মাটি এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতকে পুঁজি করে স্থানীয় চাষিরা কফি চাষে আশার আলো দেখছেন। এক সময়ের পরিত্যক্ত ও প্রতিকূল পাহাড়ী জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে থোকায় থোকায় লাল-সবুজ কফি ফল। সঠিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে জেলাটি দেশের কফি চাহিদার বড় একটি অংশ মেটাতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, রোপণের মাত্র তিন বছরের মাথায় কফি গাছ থেকে ফলন আসা শুরু হয়। প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে গড়ে ৬ থেকে ৭ কেজি পর্যন্ত কাঁচা কফি সংগ্রহ করা সম্ভব। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা কফির মূল্য প্রায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি একর জমিতে ৬০০ থেকে ৭০০টি চারা রোপণ করা যায়, যা থেকে বছরে ৩ থেকে ৫ হাজার কেজি ফলন পাওয়া সম্ভব। এতে একজন কৃষক এক একর জমি থেকে বছরে গড়ে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা স্বচ্ছন্দে আয় করতে পারেন, যা অন্য ফসলের তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সাজ্জাদ হোসেন তুলিপ এই অঞ্চলে কফি চাষে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। চার বছর আগে শখের বশে পাহাড়ে কফি চাষ শুরু করলেও এখন তা বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ নিয়েছে। সাজ্জাদ হোসেন জানান, ইতিপূর্বে বান্দরবানে চাকরির সুবাদে তিনি কফি চাষের প্রক্রিয়া দেখেন। অনুপ্রাণিত হয়ে ২০২১ সালে চাকরি ছেড়ে নিজ এলাকায় ফিরে মাত্র ৫ কেজি চারা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্থানীয় অনেক কৃষক কফি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। সাজ্জাদ হোসেন এখন নিজের উৎপাদিত কফি বীজের চারা বিনামূল্যে বিতরণ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সামাজিক বিপ্লব ঘটাচ্ছেন। তাঁর খামারের কফি বর্তমানে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজারের অভিজাত কফিশপগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি অফিসার মো. ফরহাদ হোসেন ইনকিলাবকে জানান, বর্তমানে ‘অ্যারাবিকা’ ও ‘রোবাস্টা’ এই দুই জাতের কফি চাষ হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের আবহাওয়া ও গারো পাহাড়ের মাটির জন্য রোবাস্টা জাতটি অত্যন্ত উপযোগী। সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসে গাছে ফুল আসে এবং সেপ্টেম্বর নাগাদ কফি সংগ্রহের উপযুক্ত সময় হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন ইনকিলাবকে জানান, কফি চাষের এই প্রসার পাহাড়ে জীবনমান পাল্টে দেবে। কৃষকদের আর্থিক স্বচ্ছলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ইতোমধ্যে শতাধিক কৃষককে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ ও সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি চারা বিতরণ করা হয়েছে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল-আমিন বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কফি চাষিদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনা অব্যাহত থাকবে। শেরপুরের পাহাড়ে উৎপাদিত কফি অচিরেই স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
Reporter Name 
























