ঢাকা ০৫:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬, ১০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
বাড়ছে ইরানি হামলার তীব্রতা, অবিলম্বে নাগরিকদের ইসরায়েল ছাড়তে বললো চীন প্রধানমন্ত্রী দেশকে তাঁর পিতার মতোই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন : ভূমিমন্ত্রী ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় মেসি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা ঈদের ছুটি শেষে অফিস শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী এক-এগারোর সময়ের আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার জাতীয় পতাকা বিধি যথাযথভাবে প্রতিপালনের নির্দেশনা জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক আজ বর্ণবাদ নির্মূলে বৈশ্বিক ঐক্যের আহ্বান জানালো বাংলাদেশ ঈদের ছুটি শেষে সচিবালয়ে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কুশল বিনিময়

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার এখনই সময়

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
  • ১৯ বার

বর্ষপরিক্রমায় আবারও আমাদের দ্বারে মার্চ মাস উপস্থিত। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে মার্চ মাসের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অনেক বেশি। মার্চ এলেই মনে পড়ে অগ্নিঝরা স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা। কোনো মর্যাদাবান জাতিই স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে পারে না।

তবে স্বাধীনতা চাইলেই পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। জাতিগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অধিক রাজনীতিসচেতন এবং স্বাধীনতাপ্রিয়। স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের মানুষ যত মূল্য দিয়েছে, ভারতের অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষ তা দেয়নি।

ব্রিটিশ শাসকরাও বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতাপ্রিয়তার বিষয়টি অবগত ছিলেন। ব্রিটিশদের এক গোপন নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ আজ যা ভাবে, ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষ আগামীকাল তা ভাবে। তারা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন এবং তারা স্বপ্ন দেখে দিল্লির বড় লাট ভবনে একজন বাঙালি বসে আছেন। ব্রিটিশরা মনে করতেন, বাংলাদেশের মানুষকে যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেওয়া হয়, তাহলে ব্রিটিশরা নিশ্চিতভাবেই বিপদে পড়বেন।

তাই তাঁরা ১৯০৫ সালে বৃহত্তর বাংলাকে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এই দুটি প্রদেশে বিভক্ত করেন, যদিও প্রকাশ্য নথিতে তাঁরা বঙ্গভঙ্গের জন্য এর বিশালতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক দিনে বা হঠাৎ করেই আসেনি। এ জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বাংলার মানুষ বারবার পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছে, কিন্তু তারা প্রতিনিয়তই প্রতারিত হয়েছে। ১৯৪০ সালে গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

মূল লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে এক বা একাধিক স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠিত হবে। পরবর্তী সময়ে লাহোর প্রস্তাবে একক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা সংযুক্ত করা হয়। ফলে বাংলাদেশের মুসলমানরা প্রতারিত হয়। তার পরও তারা একক পাকিস্তান প্রস্তাব মেনে নেয়। তারা মনে করেছিল, ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানে তারা হয়তো আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে, কিন্তু পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দ্বিমত দেখা দেয়। বাংলাদেশের মানুষ চাইছিল, পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণ-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে ঘোষণা করে, উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা তাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার এই অপমান সহ্য করেনি। তারা বুকের রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। পৃথিবীতে আর কোনো জাতি তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে এমন ত্যাগ স্বীকার করেনি।

বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানার মধ্য দিয়ে এটি প্রতীয়মান হয় যে পাকিস্তানি শাসকচক্রের হাতে এ দেশের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়। তাই তারা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পৃথক জাতিসত্তা গঠনে সচেষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে এই অঞ্চলে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের মানুষ যত আন্দোলন করেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা, যেখানে সবাই ন্যায়সংগত অধিকার নিয়ে বাসবাস করতে পারবে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শীর্ষক একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেছিল, যাতে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধের নানা চেতনার কথা শুনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটাধিকারের মাধ্যমে জনগণের সরকার গঠন করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল চেতনার কথা কোনো রাজনৈতিক দল বলে না। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বাধীনতার চেতনা বিনষ্ট করেছে। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে যদি পাকিস্তানি জান্তা রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করত, তাহলে কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রয়োজন হতো? ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।

প্রতিটি জাতিই স্বাধীনতা চায়, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, অনেক জাতিই তা করতে পারে না। হৃদয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা সত্ত্বেও যে জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত হতে পারে না, তার মতো দুর্ভাগা জাতি আর হয় না। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে বারবার আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে, দিতে হয়েছে প্রচুর রক্ত। চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালে লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্তের দামে কেনা, কারো দয়া বা অনুগ্রহে প্রাপ্ত নয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই নিরীহ বাংলাদেশিদের ওপর নৃশংস আক্রমণ পরিচালনা করে। সেই রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার বরণ করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর এমন কাপুরুষোচিত হামলার কারণে জাতি তখন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও পালিয়ে যান। ফলে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে জাতি কোনো নির্দেশনা পাচ্ছিল না। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। মাত্র কয়েক বছর আগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেছি। মার্চ মাসের ৩ তারিখে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় পুরো ঢাকা শহর আন্দোলনের শহরে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। আমি নিজ মহকুমা শহর ফেনীতে চলে যাই। এক পর্যায়ে আমি ঢাকায় আসার জন্য প্রস্তুতি নিলেও মা-বাবার ম্লান মুখ দেখে এবং তাঁদের নিষেধ শুনে আর ঢাকায় আসার সাহস পাইনি। ফেনীতে অবস্থান করেই আন্দোলন-সংগ্রামের খবর পাচ্ছিলাম।

২৫ মার্চ ঢাকায় সংঘটিত পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের কথাও ফেনীতে বসেই শুনতে পাই। ২৭ তারিখ সকালে ফেনী শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে জটলা করে লোকজনকে রেডিও শুনতে দেখি। কৌতূহলী হয়ে আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু সেই জটলায় শামিল হই। এমন সময় শুনতে পাই, রেডিওতে জনৈক মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন। প্রথমে নিজ নামে এবং পরে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। মেজর জিয়াকে আমি চিনতাম না। তাঁর নামও আগে কখনো শুনিনি। কিন্তু সেদিনের মেজর জিয়ার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা আমার মনে যে কী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। আমি তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। কিন্তু বিষয়টি আমি অন্য সবার কাছে গোপন রাখি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্লাস শুরুর ঘোষণা দেয় এবং সবাইকে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ প্রদান করে। আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে আমি ৩১ মে ঢাকায় চলে আসি এবং কর্মস্থলে যোগদান করি।

ঢাকায় আসার পরও আমি সুযোগ খুঁজতে থাকি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়া যায়। ঢাকায় এসেও স্বস্তিতে থাকতে পারছিলাম না। আমাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল। জুলাই মাসের শেষের দিকে যমদূত বাহিনী ডাকযোগে আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। আমি অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি এবং ঢাকা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমি বাড়িতে চলে যাই। বাড়ি যাওয়ার পরদিনই রাজাকার বাহিনী আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আমি বুঝতে পারি, যেকোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আমার বড় চাচা আমাকে একটি গোপন পথ দিয়ে বাড়ির বাইরে চলে যেতে সাহায্য করেন। আমি বুঝতে পারি, ফেনীতে অবস্থান করা আমার জন্য নিরাপদ নয়। তাই শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। পরে সেখান থেকে কলকাতায় গমন করে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে থাকি। একই সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হই।

ভারতে অবস্থানকালে আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিক থেকেই যুদ্ধের ফলাফলের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি বিজয় অতি সন্নিকটে। ১৬ ডিসেম্বর আমরা রেডিও মারফত পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ জানতে পারি। অবশেষে যাবতীয় অনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি আমি দেশে ফিরে আসি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করে, তখন সারা দেশে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। সবাই ভাবতে শুরু করে, এবার আমরা নিজ দেশে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারব। কিন্তু ছন্দঃপতন ঘটতে খুব একটা দেরি হয়নি। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল-মতের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠিত হলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়ন অর্জনের চেষ্টা চালানো সম্ভব হতো। কিন্তু তা না করে আওয়ামী লীগ এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেই নানা ধরনের অনিয়ম-অনাচার শুরু করে। তারা মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়। রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়। সারা দেশে শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক লুটপাট। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লাইসেন্সবাজি হয়ে দাঁড়ায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সারা দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দলীয়করণ-আত্মীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় ১৯৭৪ সালে ঘটে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কথা বললেও তাদের হাতেই নির্বাচনব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ পেশিশক্তি ব্যবহার করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশের সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করে। আওয়ামী লীগ সব সময়ই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভয় পায়। তারা নির্বাচনব্যবস্থাকে কিভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে, তার প্রমাণ পাই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে।

গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গেলে তার পরিণতি কী হতে পারে সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশসিংত নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সমর্থিত জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন লাভ করে ক্ষমতাসীন হয়েছে। এখন নতুন সরকারের সামনে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে, তাকে সুদৃঢ় করা এবং বৈষম্যহীন আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার। এই কাজটি করতে পারলে জাতি বর্তমান সরকারকে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

বাড়ছে ইরানি হামলার তীব্রতা, অবিলম্বে নাগরিকদের ইসরায়েল ছাড়তে বললো চীন

গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার এখনই সময়

আপডেট টাইম : ১২:০৪:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

বর্ষপরিক্রমায় আবারও আমাদের দ্বারে মার্চ মাস উপস্থিত। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে মার্চ মাসের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য অনেক বেশি। মার্চ এলেই মনে পড়ে অগ্নিঝরা স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা। কোনো মর্যাদাবান জাতিই স্বাধীনতাহীনতায় বাঁচতে পারে না।

তবে স্বাধীনতা চাইলেই পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। জাতিগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ ভারতের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অধিক রাজনীতিসচেতন এবং স্বাধীনতাপ্রিয়। স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের মানুষ যত মূল্য দিয়েছে, ভারতের অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষ তা দেয়নি।

ব্রিটিশ শাসকরাও বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতাপ্রিয়তার বিষয়টি অবগত ছিলেন। ব্রিটিশদের এক গোপন নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, বাংলাদেশের মানুষ আজ যা ভাবে, ভারতের অন্য অঞ্চলের মানুষ আগামীকাল তা ভাবে। তারা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সচেতন এবং তারা স্বপ্ন দেখে দিল্লির বড় লাট ভবনে একজন বাঙালি বসে আছেন। ব্রিটিশরা মনে করতেন, বাংলাদেশের মানুষকে যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেওয়া হয়, তাহলে ব্রিটিশরা নিশ্চিতভাবেই বিপদে পড়বেন।

তাই তাঁরা ১৯০৫ সালে বৃহত্তর বাংলাকে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ এই দুটি প্রদেশে বিভক্ত করেন, যদিও প্রকাশ্য নথিতে তাঁরা বঙ্গভঙ্গের জন্য এর বিশালতা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা এক দিনে বা হঠাৎ করেই আসেনি। এ জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বাংলার মানুষ বারবার পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙেছে, কিন্তু তারা প্রতিনিয়তই প্রতারিত হয়েছে। ১৯৪০ সালে গৃহীত লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

মূল লাহোর প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে এক বা একাধিক স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠিত হবে। পরবর্তী সময়ে লাহোর প্রস্তাবে একক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা সংযুক্ত করা হয়। ফলে বাংলাদেশের মুসলমানরা প্রতারিত হয়। তার পরও তারা একক পাকিস্তান প্রস্তাব মেনে নেয়। তারা মনে করেছিল, ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানে তারা হয়তো আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে, কিন্তু পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে দ্বিমত দেখা দেয়। বাংলাদেশের মানুষ চাইছিল, পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গণ-আকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে ঘোষণা করে, উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা তাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার এই অপমান সহ্য করেনি। তারা বুকের রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। পৃথিবীতে আর কোনো জাতি তাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে এমন ত্যাগ স্বীকার করেনি।

বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হানার মধ্য দিয়ে এটি প্রতীয়মান হয় যে পাকিস্তানি শাসকচক্রের হাতে এ দেশের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়। তাই তারা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পৃথক জাতিসত্তা গঠনে সচেষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে এই অঞ্চলে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি ছিল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের মানুষ যত আন্দোলন করেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা, যেখানে সবাই ন্যায়সংগত অধিকার নিয়ে বাসবাস করতে পারবে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শীর্ষক একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেছিল, যাতে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধের নানা চেতনার কথা শুনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটাধিকারের মাধ্যমে জনগণের সরকার গঠন করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল চেতনার কথা কোনো রাজনৈতিক দল বলে না। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই স্বাধীনতার চেতনা বিনষ্ট করেছে। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের হাতে যদি পাকিস্তানি জান্তা রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করত, তাহলে কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রয়োজন হতো? ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।

প্রতিটি জাতিই স্বাধীনতা চায়, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, অনেক জাতিই তা করতে পারে না। হৃদয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ধারণ করা সত্ত্বেও যে জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত হতে পারে না, তার মতো দুর্ভাগা জাতি আর হয় না। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে বারবার আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে, দিতে হয়েছে প্রচুর রক্ত। চূড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালে লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্তের দামে কেনা, কারো দয়া বা অনুগ্রহে প্রাপ্ত নয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই নিরীহ বাংলাদেশিদের ওপর নৃশংস আক্রমণ পরিচালনা করে। সেই রাতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার বরণ করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর এমন কাপুরুষোচিত হামলার কারণে জাতি তখন দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও পালিয়ে যান। ফলে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে জাতি কোনো নির্দেশনা পাচ্ছিল না। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক। মাত্র কয়েক বছর আগে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেছি। মার্চ মাসের ৩ তারিখে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করায় পুরো ঢাকা শহর আন্দোলনের শহরে পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। আমি নিজ মহকুমা শহর ফেনীতে চলে যাই। এক পর্যায়ে আমি ঢাকায় আসার জন্য প্রস্তুতি নিলেও মা-বাবার ম্লান মুখ দেখে এবং তাঁদের নিষেধ শুনে আর ঢাকায় আসার সাহস পাইনি। ফেনীতে অবস্থান করেই আন্দোলন-সংগ্রামের খবর পাচ্ছিলাম।

২৫ মার্চ ঢাকায় সংঘটিত পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের কথাও ফেনীতে বসেই শুনতে পাই। ২৭ তারিখ সকালে ফেনী শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে জটলা করে লোকজনকে রেডিও শুনতে দেখি। কৌতূহলী হয়ে আমি ও আমার কয়েকজন বন্ধু সেই জটলায় শামিল হই। এমন সময় শুনতে পাই, রেডিওতে জনৈক মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন। প্রথমে নিজ নামে এবং পরে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। মেজর জিয়াকে আমি চিনতাম না। তাঁর নামও আগে কখনো শুনিনি। কিন্তু সেদিনের মেজর জিয়ার সেই স্বাধীনতার ঘোষণা আমার মনে যে কী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তা ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাবে না। আমি তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। কিন্তু বিষয়টি আমি অন্য সবার কাছে গোপন রাখি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্লাস শুরুর ঘোষণা দেয় এবং সবাইকে নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ প্রদান করে। আত্মীয়-স্বজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে আমি ৩১ মে ঢাকায় চলে আসি এবং কর্মস্থলে যোগদান করি।

ঢাকায় আসার পরও আমি সুযোগ খুঁজতে থাকি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হওয়া যায়। ঢাকায় এসেও স্বস্তিতে থাকতে পারছিলাম না। আমাকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল। জুলাই মাসের শেষের দিকে যমদূত বাহিনী ডাকযোগে আমাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। আমি অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি এবং ঢাকা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমি বাড়িতে চলে যাই। বাড়ি যাওয়ার পরদিনই রাজাকার বাহিনী আমাদের বাড়ি আক্রমণ করে। তারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আমি বুঝতে পারি, যেকোনো সময় আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আমার বড় চাচা আমাকে একটি গোপন পথ দিয়ে বাড়ির বাইরে চলে যেতে সাহায্য করেন। আমি বুঝতে পারি, ফেনীতে অবস্থান করা আমার জন্য নিরাপদ নয়। তাই শেষ পর্যন্ত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে আমি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। পরে সেখান থেকে কলকাতায় গমন করে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করতে থাকি। একই সঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হই।

ভারতে অবস্থানকালে আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিক থেকেই যুদ্ধের ফলাফলের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি বিজয় অতি সন্নিকটে। ১৬ ডিসেম্বর আমরা রেডিও মারফত পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ জানতে পারি। অবশেষে যাবতীয় অনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি আমি দেশে ফিরে আসি।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করে, তখন সারা দেশে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। সবাই ভাবতে শুরু করে, এবার আমরা নিজ দেশে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারব। কিন্তু ছন্দঃপতন ঘটতে খুব একটা দেরি হয়নি। স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব দল-মতের প্রতিনিধিদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠিত হলে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের উন্নয়ন অর্জনের চেষ্টা চালানো সম্ভব হতো। কিন্তু তা না করে আওয়ামী লীগ এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেই নানা ধরনের অনিয়ম-অনাচার শুরু করে। তারা মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেয়। রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়। সারা দেশে শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক লুটপাট। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লাইসেন্সবাজি হয়ে দাঁড়ায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সারা দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দলীয়করণ-আত্মীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এই অবস্থায় ১৯৭৪ সালে ঘটে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কথা বললেও তাদের হাতেই নির্বাচনব্যবস্থা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ পেশিশক্তি ব্যবহার করে বিজয় ছিনিয়ে নেয়। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশের সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করে। আওয়ামী লীগ সব সময়ই নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভয় পায়। তারা নির্বাচনব্যবস্থাকে কিভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে, তার প্রমাণ পাই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে।

গণ-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গেলে তার পরিণতি কী হতে পারে সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করে তার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বর্তমানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশসিংত নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সমর্থিত জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন লাভ করে ক্ষমতাসীন হয়েছে। এখন নতুন সরকারের সামনে সুবর্ণ সুযোগ এসেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে, তাকে সুদৃঢ় করা এবং বৈষম্যহীন আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার। এই কাজটি করতে পারলে জাতি বর্তমান সরকারকে চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত