ঢাকা ০৩:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২৬, ৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মহানবী (সা.) ও খাদিজা (রা.)-এর বিয়ে হয়েছিল যেভাবে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০১:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২৩ বার

বলছি, মক্কার সবচেয়ে বিশ্বস্ত যুবকের যৌবনকালের কথা—যাঁর সততা আর নৈতিকতা তাঁর যৌবনের উজ্জ্বলতাকে পবিত্র করে তুলেছিল। তিনি আমাদের মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা আর অনুপম চরিত্রের গল্প সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াত। মানুষজন ভালোবেসে তাঁকে উপাধি দিয়েছিলেন—‘আল-আমিন।’ তাঁর কাছে আমানত রাখলে কেউ কখনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না।

তাঁর এই গুণের কথা মক্কার ধনবতী, গুণবতী নারী খাদিজারও অজানা ছিল না। তাই নিজের ব্যবসায় উন্নতি সাধনে তিনি নিজের বাণিজ্যের সার্বিক ভার তুলে দেন সবার আস্থার প্রতীক আল-আমিন তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে। তাঁর বিশ্বাস ছিল—‘মুহাম্মদের মতো আর কারও ওপর তিনি এতটা ভরসা করতে পারবেন না। মুহাম্মদের মতো সৎ ও বিশ্বাসী মানুষ আর কেউ নেই।’

দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ব্যবসায়িক সফরে কাফেলা নিয়ে বের হন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সঙ্গে হজরত খাদিজার ক্রীতদাস মাইসারা। সিরিয়ার পথে যেতে যেতে মাইসারা অবাক হয়ে লক্ষ করেন, এক টুকরো মেঘ যেন সর্বদা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথার ওপর ছায়া দিয়ে চলেছে। প্রচণ্ড রোদ থাকা সত্ত্বেও তাঁর পবিত্র শরীর থেকে ঘাম ঝরছে না। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর এক খ্রিষ্টান ধর্মযাজক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি তাঁর চোখে সেই চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি—যা কেবল একজন নবীর চোখেই দেখা যায়।’

ব্যবসায়িক সফর শেষ করে কাফেলা নিয়ে মক্কার পথ ধরেন বিশ্বস্ত ও প্রজ্ঞাবান যুবক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো—এই সফরে ব্যবসায় লাভ হয় দ্বিগুণ। মাইসারা অবাক হয়ে উপভোগ করেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সততা আর বিচক্ষণতা। মুগ্ধ হওয়া ছাড়া তাঁর যেন আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি খেয়াল করলেন, পুরো সফরে তাঁর চরিত্র ও ব্যবহার ছিল সবার জন্য এক দৃষ্টান্ত।

মক্কায় ফিরে মাইসারা হজরত খাদিজাকে সব কথা জানালেন। সব শুনে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ব্যবসার লাভের চেয়েও বেশি মুগ্ধ হলেন সেই মানুষটির সততা, উদারতা, বিচক্ষণতা এবং পবিত্রতা দেখে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই যুবক কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি অসাধারণ গুণের অধিকারী। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর সখী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের কাছে তাঁর মনের কথা খুলে বললেন। জানালেন—অনন্য এই মানুষটিকে তিনি নিজের আপন করে নিতে চান। সঙ্গী বানাতে চান চিরজীবনের। একসঙ্গে ভাগ করে নিতে চান সুখ, দুঃখ, ব্যর্থতা, সফলতা—সবকিছু।

নাফিসা এই প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখে কিছুটা লজ্জা। জীবনের এই পরম মুহূর্তে তো সবাইকেই লজ্জায় ঘিরে ধরে। তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে নাফিসার কাছে ইতিবাচক সাড়া দিলেন। এরপর সবকিছু খুলে বললেন শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবের কাছে—যিনি তাঁর অভিভাবক।

খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন মক্কার সম্ভ্রান্ত নারীদের অন্যতম। তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সৌভাগ্য তো আর সবার হয় না। হজরত খাদিজার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তাঁর পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান নবীজির চাচা আবু তালিব। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ যুবকের বিয়ের প্রস্তাব তো আর না করা যায় না। এই সুযোগ হাত ছাড়া করা তো বোকামো ছাড়া কিছু নয়।

অবশেষে উভয় পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিব বিয়ের খুতবা পাঠ করেন। শুরু হয় নতুন পথের যাত্রা।

আম্মাজান খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সুখের। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কষ্টের সময়ের সঙ্গী ছিলেন তিনি। যখন সবাই তাঁকে পাগল বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল, তখন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম নারী। ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে তিনি স্বামীকে ভরসা দিয়েছিলেন। বুকে আগলে রেখেছিলেন। নবুওয়াতের শুরুর দিকের কঠিন সময়ে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে ছিলেন। তাঁর জীবনকালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোনো বিয়ে করেননি। তাঁদের এই বন্ধন ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ত্যাগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তাঁদের ভালোবাসা আজও আছে অমলিন হয়ে।

তথ্যসূত্র: সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

মহানবী (সা.) ও খাদিজা (রা.)-এর বিয়ে হয়েছিল যেভাবে

আপডেট টাইম : ১২:০১:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বলছি, মক্কার সবচেয়ে বিশ্বস্ত যুবকের যৌবনকালের কথা—যাঁর সততা আর নৈতিকতা তাঁর যৌবনের উজ্জ্বলতাকে পবিত্র করে তুলেছিল। তিনি আমাদের মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর সততা, বিশ্বস্ততা আর অনুপম চরিত্রের গল্প সবার মুখে মুখে ঘুরে বেড়াত। মানুষজন ভালোবেসে তাঁকে উপাধি দিয়েছিলেন—‘আল-আমিন।’ তাঁর কাছে আমানত রাখলে কেউ কখনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না।

তাঁর এই গুণের কথা মক্কার ধনবতী, গুণবতী নারী খাদিজারও অজানা ছিল না। তাই নিজের ব্যবসায় উন্নতি সাধনে তিনি নিজের বাণিজ্যের সার্বিক ভার তুলে দেন সবার আস্থার প্রতীক আল-আমিন তথা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে। তাঁর বিশ্বাস ছিল—‘মুহাম্মদের মতো আর কারও ওপর তিনি এতটা ভরসা করতে পারবেন না। মুহাম্মদের মতো সৎ ও বিশ্বাসী মানুষ আর কেউ নেই।’

দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ব্যবসায়িক সফরে কাফেলা নিয়ে বের হন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। সঙ্গে হজরত খাদিজার ক্রীতদাস মাইসারা। সিরিয়ার পথে যেতে যেতে মাইসারা অবাক হয়ে লক্ষ করেন, এক টুকরো মেঘ যেন সর্বদা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাথার ওপর ছায়া দিয়ে চলেছে। প্রচণ্ড রোদ থাকা সত্ত্বেও তাঁর পবিত্র শরীর থেকে ঘাম ঝরছে না। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর এক খ্রিষ্টান ধর্মযাজক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, ‘আমি তাঁর চোখে সেই চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি—যা কেবল একজন নবীর চোখেই দেখা যায়।’

ব্যবসায়িক সফর শেষ করে কাফেলা নিয়ে মক্কার পথ ধরেন বিশ্বস্ত ও প্রজ্ঞাবান যুবক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো—এই সফরে ব্যবসায় লাভ হয় দ্বিগুণ। মাইসারা অবাক হয়ে উপভোগ করেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সততা আর বিচক্ষণতা। মুগ্ধ হওয়া ছাড়া তাঁর যেন আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি খেয়াল করলেন, পুরো সফরে তাঁর চরিত্র ও ব্যবহার ছিল সবার জন্য এক দৃষ্টান্ত।

মক্কায় ফিরে মাইসারা হজরত খাদিজাকে সব কথা জানালেন। সব শুনে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ব্যবসার লাভের চেয়েও বেশি মুগ্ধ হলেন সেই মানুষটির সততা, উদারতা, বিচক্ষণতা এবং পবিত্রতা দেখে। তিনি বুঝতে পারলেন, এই যুবক কেবল একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি অসাধারণ গুণের অধিকারী। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর সখী নাফিসা বিনতে মুনাব্বিহের কাছে তাঁর মনের কথা খুলে বললেন। জানালেন—অনন্য এই মানুষটিকে তিনি নিজের আপন করে নিতে চান। সঙ্গী বানাতে চান চিরজীবনের। একসঙ্গে ভাগ করে নিতে চান সুখ, দুঃখ, ব্যর্থতা, সফলতা—সবকিছু।

নাফিসা এই প্রস্তাব নিয়ে সরাসরি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেলেন। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চোখে কিছুটা লজ্জা। জীবনের এই পরম মুহূর্তে তো সবাইকেই লজ্জায় ঘিরে ধরে। তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে নাফিসার কাছে ইতিবাচক সাড়া দিলেন। এরপর সবকিছু খুলে বললেন শ্রদ্ধেয় চাচা আবু তালিবের কাছে—যিনি তাঁর অভিভাবক।

খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন মক্কার সম্ভ্রান্ত নারীদের অন্যতম। তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সৌভাগ্য তো আর সবার হয় না। হজরত খাদিজার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তাঁর পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান নবীজির চাচা আবু তালিব। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ যুবকের বিয়ের প্রস্তাব তো আর না করা যায় না। এই সুযোগ হাত ছাড়া করা তো বোকামো ছাড়া কিছু নয়।

অবশেষে উভয় পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আবু তালিব বিয়ের খুতবা পাঠ করেন। শুরু হয় নতুন পথের যাত্রা।

আম্মাজান খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার সঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাম্পত্য জীবন ছিল অত্যন্ত সুখের। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কষ্টের সময়ের সঙ্গী ছিলেন তিনি। যখন সবাই তাঁকে পাগল বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছিল, তখন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম নারী। ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে তিনি স্বামীকে ভরসা দিয়েছিলেন। বুকে আগলে রেখেছিলেন। নবুওয়াতের শুরুর দিকের কঠিন সময়ে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশে ছিলেন। তাঁর জীবনকালে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোনো বিয়ে করেননি। তাঁদের এই বন্ধন ছিল ভালোবাসা, বিশ্বাস আর ত্যাগের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তাঁদের ভালোবাসা আজও আছে অমলিন হয়ে।

তথ্যসূত্র: সিরাতে খাতামুল আম্বিয়া