একসময় বলা হতো ‘মাঘ মাসে বাঘ কাঁপে।’ কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে ঋতুর চরিত্রও। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে এই প্রবাদের গ্রহণযোগ্যতা আজ অনেকটাই ফিকে। মধ্য মাঘেও আর সেই কনকনে শীত নেই। ভোরের কুয়াশা আগের মতো ঘন হয় না, রোদ উঠলেই ঠা-ার দাপট মিলিয়ে যায়। বাতাসে ধীরে ধীরে গরমের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়, আর প্রকৃতি জানান দেয় শীত আর আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই।
এখনকার মাঘ ঢাকঢোল পিটিয়ে বলে না ‘শীত শেষ।’ আবার জোরে জোরে ডেকে বসন্তকেও আনে না। মাঘ আসে নীরবে। বদলে দেয় পরিবেশের মেজাজ, ঋতুর গতিপথ। যেন ঋতুরা নিজেরাই বসে সিদ্ধান্ত নেয় এবার বদল দরকার। আর সেই বদলের মাঝখানের সময়টাই হলো মাঘ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আজ রবিবার পর্যন্ত আবহাওয়ার বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। আগামীকাল সোমবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুয়াশার সঙ্গে সঙ্গে রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। তবে ৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার থেকে আবার রাত ও দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়ার আভাস রয়েছে। এই পূর্বাভাসও জানান দেয় শীত এখন আর স্থির নয়, সে বিদায়ের পথে।
ভোরবেলা এখনো কুয়াশা থাকে, তবে তার ঘনত্বে স্পষ্ট ফারাক। আগের মতো চোখ বুজে ফেলা ঠান্ডা নয়, বরং হালকা এক পর্দা। সূর্য উঠলেই সেই পর্দা সরে যায়। রোদের ছোঁয়ায় শরীর আর মন দুটোই স্বস্তি পায়। শীতের রুক্ষতা তখন স্মৃতির মতো; পুরোপুরি চলে যায়নি, আবার আগের মতো দাপটও নেই।
গ্রামে মাঘের সকাল মানেই অন্যরকম ব্যস্ততা। ক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে কৃষক টের পান মাটি এখন আর জমে নেই, নরম হয়েছে। গম আর সরিষার ক্ষেত হলুদাভ হাসি ছড়ায় চারদিকে। সরিষা ফুলের গন্ধে বাতাস ভারী, কিন্তু সেই ভার ক্লান্তিকর নয়। বরং এই গন্ধেই লুকিয়ে থাকে বসন্তের আগমনের ইশারা। মাঠে কাজ করা মানুষগুলোর মুখে ক্লান্তির চেয়ে আশার ছাপ বেশি। কারণ, শীতের শেষ মানে নতুন হিসাব-নিকাশের শুরু।
শহরে মাঘ ধরা দেয় একটু ভিন্নভাবে। সকালে বাসস্ট্যান্ড বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন আর কাঁপতে কাঁপতে হাত গুটিয়ে রাখে না। চায়ের কাপটা এখনো প্রিয়, তবে শুধু উষ্ণতার জন্য নয় অভ্যাসের জন্য। কেউ কেউ জ্যাকেট খোলা রেখে হাঁটে, আবার কেউ দ্বিধায় থাকে আজ কি সোয়েটার লাগবে?
মাঘের দিনে দুপুরটা সবচেয়ে আলাদা। রোদ থাকে, কিন্তু তা ক্লান্তিকর নয়। ছাদের কোণে বসে বই পড়া, উঠানে বসে গল্প, কিংবা অফিসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দূরে তাকিয়ে থাকা সবকিছুতেই এক ধরনের প্রশান্তি। শীতের দিনে গুটিয়ে থাকা মনটা এই সময় ধীরে ধীরে খুলে যায়। মানুষ কথা বলতে চায়, বাইরে যেতে চায়, সময়কে একটু বেশি উপভোগ করতে চায়।
এই মাসে প্রকৃতিও নিজের ভাষায় গল্প বলে। গাছের ডালে ডালে কুঁড়ি ফুলে ওঠে, যদিও এখনো পুরো ফুল নয়। শিমুলের ডালে লাল রঙের আভাস দেখা যায়, পলাশ যেন রঙ ছড়ানোর প্রস্তুতি নেয়। পাখির ডাকেও পরিবর্তন আসে। সকালবেলার শব্দগুলো বেশি উচ্ছল, বেশি প্রাণবন্ত। যেন প্রকৃতি নিজেই জানে ঠান্ডার ক্লান্তি কাটিয়ে এবার নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
মাঘ মানেই পিঠার শেষ উৎসব। শীত যত গভীর ছিল, পিঠার আয়োজন তত জমজমাট। মাঘে এসে সেই আয়োজন থাকে, তবে তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিদায়ের সুর। চুলার আগুন এখন আর হাত সেকার জন্য নয়, স্বাদের জন্য। পাটিসাপটা, ভাপা, দুধচিতই সবকিছুর মধ্যেই যেন বলা থাকে, ‘আর কদিন, তারপর বিদায়।’
মাঘের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তার ভারসাম্য। না অতিরিক্ত ঠান্ডা, না অসহ্য গরম। ঠিক মাঝামাঝি একটা অবস্থান, যেখানে থাকা যায়, নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। দিনের আলো একটু বাড়ে, সন্ধ্যা নামে ধীরে। সময় যেন হঠাৎ করে আর দৌড়ায় না।
বিদায় বেলায় শীত তখন আর কঠিন নয়। সে নরম হয়ে আসে। রাতের ঠান্ডা থাকে, কিন্তু তা আর ভয় ধরায় না। বরং মনে করিয়ে দেয় এই ঠান্ডার মধ্যেই কিছুদিন আগে আমরা কাঁপতাম, আর এখন সেটাই ধীরে ধীরে স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে।
মাঘ তাই শুধু একটি মাস নয়, একটি অনুভূতি। পরিবর্তনের এই সময় আমাদের শেখায় শেষ মানেই শূন্যতা নয়। শীতের বিদায়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বসন্তের আগমন। আর সেই আগমন সবসময় শব্দ করে আসে না; আসে আলো, বাতাস আর মন ভালো লাগার অদৃশ্য স্পর্শ নিয়ে।
Reporter Name 























