ঢাকা ০৪:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:২৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৪ বার

বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক অনুসন্ধানে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক দালাল রাশিয়া পাঠায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নিজেকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে দেখতে পান।

এপি জানায়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেসামরিক চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় আনা হয়। পরে জোরপূর্বক তাদের যুদ্ধে নামানো হয়। অনেককে হুমকি দেওয়া হয় কারাদণ্ড, মারধর কিংবা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তাকারী সংস্থা ব্র্যাক ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিষয়টি তদন্ত করে অন্তত ১০ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তথ্য পায়।

ব্র্যাকের কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, এখানে দুই থেকে তিন স্তরের দালালচক্র আছে। বাংলাদেশ পুলিশও একটি মানবপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে মারা গিয়ে থাকতে পারেন।

মাকসুদুর রহমানসহ তিনজন বাংলাদেশি যুবক জানান, মস্কো পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করানো হয়। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল সামরিক চুক্তি। এরপর তাদের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে ড্রোন যুদ্ধ, অস্ত্র ব্যবহার ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

রহমান আপত্তি জানালে এক রুশ কর্মকর্তা অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, ‘তোমাদের এজেন্টই তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাদের কিনেছি।’

বাংলাদেশি যুবকরা জানান, জোর করে তাদের যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হতো, মালামাল বহন করানো হতো, আহতদের উদ্ধার ও মৃতদেহ সংগ্রহে বাধ্য করা হতো।

রহমান বলেন, কাজ না করলে তাদের ১০ বছরের জেলের হুমকি দেওয়া হতো এবং মারধর করা হতো। সাত মাস পর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।

কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারিত হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা শতাধিক বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখেছেন।

এপি আরও জানায়, ভারত ও নেপালসহ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও এভাবে নিয়োগ করা হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী মোহন মিয়াজি জানান, তাকে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়। পরে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। আদেশ না মানলে তাকে নির্যাতন এবং ভাষা না বোঝার কারণে ভুল করলে নির্মমভাবে মারধর করা হতো।

লক্ষ্মীপুরের অনেক পরিবার এখনও নিখোঁজ স্বজনদের পাঠানো কাগজপত্র ধরে রেখে আশায় আছেন, একদিন তারা ফিরে আসবেন।

সালমা আক্তার জানান, তার স্বামী আজগর হোসেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ায় যান লন্ড্রি কর্মীর চাকরির আশায়। পরে জানান, তাকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। শেষবার তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, আমার জন্য দোয়া করো।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা

আপডেট টাইম : ১০:২৯:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশি শ্রমিকদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর এক অনুসন্ধানে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক দালাল রাশিয়া পাঠায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নিজেকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে দেখতে পান।

এপি জানায়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেসামরিক চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় আনা হয়। পরে জোরপূর্বক তাদের যুদ্ধে নামানো হয়। অনেককে হুমকি দেওয়া হয় কারাদণ্ড, মারধর কিংবা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তাকারী সংস্থা ব্র্যাক ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিষয়টি তদন্ত করে অন্তত ১০ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তথ্য পায়।

ব্র্যাকের কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, এখানে দুই থেকে তিন স্তরের দালালচক্র আছে। বাংলাদেশ পুলিশও একটি মানবপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে মারা গিয়ে থাকতে পারেন।

মাকসুদুর রহমানসহ তিনজন বাংলাদেশি যুবক জানান, মস্কো পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করানো হয়। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল সামরিক চুক্তি। এরপর তাদের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে ড্রোন যুদ্ধ, অস্ত্র ব্যবহার ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

রহমান আপত্তি জানালে এক রুশ কর্মকর্তা অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, ‘তোমাদের এজেন্টই তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাদের কিনেছি।’

বাংলাদেশি যুবকরা জানান, জোর করে তাদের যুদ্ধের সামনের সারিতে পাঠানো হতো, মালামাল বহন করানো হতো, আহতদের উদ্ধার ও মৃতদেহ সংগ্রহে বাধ্য করা হতো।

রহমান বলেন, কাজ না করলে তাদের ১০ বছরের জেলের হুমকি দেওয়া হতো এবং মারধর করা হতো। সাত মাস পর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।

কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারিত হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা শতাধিক বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে দেখেছেন।

এপি আরও জানায়, ভারত ও নেপালসহ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও এভাবে নিয়োগ করা হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী মোহন মিয়াজি জানান, তাকে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়। পরে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। আদেশ না মানলে তাকে নির্যাতন এবং ভাষা না বোঝার কারণে ভুল করলে নির্মমভাবে মারধর করা হতো।

লক্ষ্মীপুরের অনেক পরিবার এখনও নিখোঁজ স্বজনদের পাঠানো কাগজপত্র ধরে রেখে আশায় আছেন, একদিন তারা ফিরে আসবেন।

সালমা আক্তার জানান, তার স্বামী আজগর হোসেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ায় যান লন্ড্রি কর্মীর চাকরির আশায়। পরে জানান, তাকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। শেষবার তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, আমার জন্য দোয়া করো।