ঢাকা ০৬:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২৪ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নানাবাড়ির আবদার: ফেনীতে তারেক রহমানের জনসমুদ্র, নোয়াখালী অঞ্চলে নির্বাচনী সমীকরণ নতুন মোড়ে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:৩৫:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৬ বার

ফেনীর ফুলগাজীর মজুমদার বাড়ির নাতি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান—নানার এলাকার মানুষের আবদার যে তিনি পূরণ করে নিয়েছেন, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে রোববারের বিশাল সমাবেশে। ফেনী সরকারি কলেজ মাঠ ঘিরে জনসমুদ্র নেমে আসে। মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। বৃহত্তর নোয়াখালীর তিন জেলার নেতাকর্মীদের ফেনীতে জড়ো করে বিএনপি আয়োজন করে বড় ধরনের নির্বাচনী শোডাউন, যা শক্তি-সমর্থ্যের এক দৃশ্যমান প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে ধানের শীষকে বিজয়ী করার জোরালো আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি—একটি মেডিকেল কলেজ ও একটি ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) স্থাপনের আশ্বাস দেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসে নোয়াখালী অঞ্চল বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি পায় ১৯৯১ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের কারণে। ওই দুই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। ১৯৯৬ সালে কিছুটা পরিবর্তন এলেও ২০০৮ সালের পর ধারাবাহিকভাবে বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের অভিযোগে বিএনপির সেই একাধিপত্য ভেঙে পড়ে। গডফাদারখ্যাত হাজারী, তাহের ও একরামদের রাজত্বে মানুষ প্রজায় পরিণত হয়েছিল—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ায় গত দুই দশকের প্রকৃত ভোটচিত্র আজও অজানা।

তবে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি আবারও ভালো ফলাফলের ব্যাপারে আশাবাদী। ধানের শীষ প্রতীকে একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাঠে রয়েছেন হাফ ডজনেরও বেশি কেন্দ্রীয় নেতা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নিশ্চিত বিজয়ের তালিকায় বৃহত্তর নোয়াখালীর আসনগুলো রেখেছে বিএনপি। যদিও কয়েকটি আসনে মনোনয়নজনিত ভুলের মাশুল গুনতে হতে পারে—এমন আভাস দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মহল।

অন্যদিকে, গত পনের বছরের বৈরি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী এ অঞ্চলকে তাদের রাজনীতির সম্ভাবনাময় উর্বর ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে ধারাবাহিক সংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ব্যাপক কাজ করেছে দলটি। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে তারা। ধারণা করা হচ্ছে, ফেনী-৩ আসনে সর্বাধিক সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট যুক্ত হবে। অন্য আসনগুলোতেও পোস্টাল ব্যালট ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে জামায়াত যতটা সক্রিয় ছিল, বিএনপি ততটাই উদাসীন ছিল—এমন মূল্যায়ন রয়েছে। আগেভাগে প্রার্থী চূড়ান্ত করায় প্রচারণায় এগিয়ে আছে ১১-দলীয় জোট। জোটগত সমন্বয় ও পোস্টাল ব্যালটের সুফল পাওয়ার বিষয়ে তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।

আগামী ৩০ জানুয়ারি, পাঁচ দিনের মাথায়, একই মাঠে সমাবেশ করতে যাচ্ছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ফেনীতে সমাবেশ শেষ করে নোয়াখালী যাবেন। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরকে ফেনীতে ডাকছেন না তিনি। অঞ্চলজুড়ে বড় শোডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত জোটও।

সব মিলিয়ে আগামী ১৮ দিন পরই স্পষ্ট হয়ে উঠবে—বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাপ্রত্যাশী জামায়াত কতটা ভাগ বসাতে পারে এবং নোয়াখালী–ফেনী অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

নানাবাড়ির আবদার: ফেনীতে তারেক রহমানের জনসমুদ্র, নোয়াখালী অঞ্চলে নির্বাচনী সমীকরণ নতুন মোড়ে

আপডেট টাইম : ০১:৩৫:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ফেনীর ফুলগাজীর মজুমদার বাড়ির নাতি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান—নানার এলাকার মানুষের আবদার যে তিনি পূরণ করে নিয়েছেন, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে রোববারের বিশাল সমাবেশে। ফেনী সরকারি কলেজ মাঠ ঘিরে জনসমুদ্র নেমে আসে। মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। বৃহত্তর নোয়াখালীর তিন জেলার নেতাকর্মীদের ফেনীতে জড়ো করে বিএনপি আয়োজন করে বড় ধরনের নির্বাচনী শোডাউন, যা শক্তি-সমর্থ্যের এক দৃশ্যমান প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আত্মীয়তার সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে ধানের শীষকে বিজয়ী করার জোরালো আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি ফেনীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি—একটি মেডিকেল কলেজ ও একটি ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) স্থাপনের আশ্বাস দেন।

রাজনৈতিক ইতিহাসে নোয়াখালী অঞ্চল বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিতি পায় ১৯৯১ ও ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের কারণে। ওই দুই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। ১৯৯৬ সালে কিছুটা পরিবর্তন এলেও ২০০৮ সালের পর ধারাবাহিকভাবে বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের অভিযোগে বিএনপির সেই একাধিপত্য ভেঙে পড়ে। গডফাদারখ্যাত হাজারী, তাহের ও একরামদের রাজত্বে মানুষ প্রজায় পরিণত হয়েছিল—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ায় গত দুই দশকের প্রকৃত ভোটচিত্র আজও অজানা।

তবে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি আবারও ভালো ফলাফলের ব্যাপারে আশাবাদী। ধানের শীষ প্রতীকে একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাঠে রয়েছেন হাফ ডজনেরও বেশি কেন্দ্রীয় নেতা। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নিশ্চিত বিজয়ের তালিকায় বৃহত্তর নোয়াখালীর আসনগুলো রেখেছে বিএনপি। যদিও কয়েকটি আসনে মনোনয়নজনিত ভুলের মাশুল গুনতে হতে পারে—এমন আভাস দিচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মহল।

অন্যদিকে, গত পনের বছরের বৈরি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী এ অঞ্চলকে তাদের রাজনীতির সম্ভাবনাময় উর্বর ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে ধারাবাহিক সংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ব্যাপক কাজ করেছে দলটি। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ দিকে বিশেষ নজর দিয়েছে তারা। ধারণা করা হচ্ছে, ফেনী-৩ আসনে সর্বাধিক সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট যুক্ত হবে। অন্য আসনগুলোতেও পোস্টাল ব্যালট ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ক্ষেত্রে জামায়াত যতটা সক্রিয় ছিল, বিএনপি ততটাই উদাসীন ছিল—এমন মূল্যায়ন রয়েছে। আগেভাগে প্রার্থী চূড়ান্ত করায় প্রচারণায় এগিয়ে আছে ১১-দলীয় জোট। জোটগত সমন্বয় ও পোস্টাল ব্যালটের সুফল পাওয়ার বিষয়ে তারা বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট।

আগামী ৩০ জানুয়ারি, পাঁচ দিনের মাথায়, একই মাঠে সমাবেশ করতে যাচ্ছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ফেনীতে সমাবেশ শেষ করে নোয়াখালী যাবেন। নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরকে ফেনীতে ডাকছেন না তিনি। অঞ্চলজুড়ে বড় শোডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত জোটও।

সব মিলিয়ে আগামী ১৮ দিন পরই স্পষ্ট হয়ে উঠবে—বিএনপির ঐতিহ্যবাহী দুর্গে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাপ্রত্যাশী জামায়াত কতটা ভাগ বসাতে পারে এবং নোয়াখালী–ফেনী অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়।