ঢাকা ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৬ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

“যেই লাউ, সেই কদু”—মিঠামইনে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪১ বার

Oplus_16908288

সময় বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু মানুষের ভাগ্য বদলায় না—কিশোরগন্জ জেলার মিঠামইনের হাওরের বিভিন্ন মহলের বাস্তবতা যেন ঠিক সেই কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও মিঠামইন উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবনে সেই প্রত্যাশিত স্বস্তি ও নিরাপত্তা আজও অধরা।

দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন, ভয়ভীতি ও বাকস্বাধীনতা হরণের রাজনীতির অবসান ঘটবে—এই আশাতেই মানুষ ৫ই আগস্টের পর নতুন স্বপ্ন দেখেছিল। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো নিপীড়নের দিন শেষ, আসবে মুক্তির সকাল। কিন্তু বাস্তব চিত্র কি সেই আশাকে সত্য প্রমাণ করতে পেরেছে?

নুরু-শরীফ অধ্যায়ের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে একটি নতুন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক মিঠামইন গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের। অথচ মাত্র ১৭ মাসের ব্যবধানে কিছু আচরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষকে আবারও অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

যাদের অন্যায় ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একদিন প্রতিবাদ হয়েছিল, আজ যদি আমাদের আচরণই সেই চর্চার পুনরাবৃত্তি হয়—তবে পরিবর্তনের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য থাকে?

ব্যক্তিগত স্বার্থে, কম দামে জমি কেনার সুবিধা নিতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এটি কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?
এ ধরনের পদক্ষেপ কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে শক্তিশালী করে, নাকি সমাজে নতুন করে অবিশ্বাস ও বিভাজনের দেয়াল তোলে—সে প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

একইভাবে,মিঠামইনের হাওরে বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরতে না পারা দরিদ্র জেলেরা আশা করেছিল অন্তত এবার তারা জীবিকার নিশ্চয়তা পাবে। কিন্তু বড়হাটির মাথার নদী গরিব জেলেদের জন্য উন্মুক্ত না রেখে পুনরায় লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের সেই আশাকে আবারও ভেঙে দিয়েছে। জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থ অগ্রাধিকার পেলে রাজনীতির নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।

রাজনীতি কি তবে ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম?
রাজনীতি কি মানুষের কাছ থেকে নেওয়ার হাতিয়ার?
না—রাজনীতি মানুষের জন্য দেওয়ার নাম।

ত্যাগের নাম, দায়িত্বের নাম, ভালোবাসা ও সেবার নাম।
কথায় কথায় মানুষকে অপমান, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিক লাঞ্ছনার রাজনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হলে নেতৃত্বে চাই নম্রতা, সহনশীলতা ও মানবিক আচরণ।

ভয় দেখিয়ে কখনোই টেকসই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অতীতে যখন দোকানপাট দখল, পুকুর কেড়ে নেওয়া কিংবা বাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেসবেরই পুনরাবৃত্তি যদি আজ ভিন্ন পরিচয়ে ঘটে—তবে পুরোনো দুঃশাসনের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য কোথায়?

তারা একদিন আমাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কারণ শেষ বিচারে আল্লাহই উত্তম ফয়সালাকারী।

সবকিছু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং এটি একটি নতুন পথচলার সূচনা মাত্র।

এখনই সময় আত্মসমালোচনার, সময় সংশোধনের।
মিঠামইনের মানুষ আমাদের কাছে যে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে—সে আশার মর্যাদা রাখতে হবে। রাজনীতিকে প্রতিহিংসার পথ থেকে সরিয়ে সেবার পথে নিয়ে যেতে হবে।

ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই গড়ে তুলতে হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ মিঠামইন।

লেখক: শাকিলুর রহমান শিকদার 

প্রবাসী কানাডা থেকে 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

“যেই লাউ, সেই কদু”—মিঠামইনে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক

আপডেট টাইম : ১০:৪৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

সময় বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু মানুষের ভাগ্য বদলায় না—কিশোরগন্জ জেলার মিঠামইনের হাওরের বিভিন্ন মহলের বাস্তবতা যেন ঠিক সেই কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগলেও মিঠামইন উপজেলার সাধারণ মানুষের জীবনে সেই প্রত্যাশিত স্বস্তি ও নিরাপত্তা আজও অধরা।

দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়ন, ভয়ভীতি ও বাকস্বাধীনতা হরণের রাজনীতির অবসান ঘটবে—এই আশাতেই মানুষ ৫ই আগস্টের পর নতুন স্বপ্ন দেখেছিল। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো নিপীড়নের দিন শেষ, আসবে মুক্তির সকাল। কিন্তু বাস্তব চিত্র কি সেই আশাকে সত্য প্রমাণ করতে পেরেছে?

নুরু-শরীফ অধ্যায়ের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে একটি নতুন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক মিঠামইন গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল সর্বস্তরের মানুষের। অথচ মাত্র ১৭ মাসের ব্যবধানে কিছু আচরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষকে আবারও অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

যাদের অন্যায় ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একদিন প্রতিবাদ হয়েছিল, আজ যদি আমাদের আচরণই সেই চর্চার পুনরাবৃত্তি হয়—তবে পরিবর্তনের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য থাকে?

ব্যক্তিগত স্বার্থে, কম দামে জমি কেনার সুবিধা নিতে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ—এটি কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল?
এ ধরনের পদক্ষেপ কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে শক্তিশালী করে, নাকি সমাজে নতুন করে অবিশ্বাস ও বিভাজনের দেয়াল তোলে—সে প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

একইভাবে,মিঠামইনের হাওরে বছরের পর বছর নদীতে মাছ ধরতে না পারা দরিদ্র জেলেরা আশা করেছিল অন্তত এবার তারা জীবিকার নিশ্চয়তা পাবে। কিন্তু বড়হাটির মাথার নদী গরিব জেলেদের জন্য উন্মুক্ত না রেখে পুনরায় লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের সেই আশাকে আবারও ভেঙে দিয়েছে। জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিস্বার্থ অগ্রাধিকার পেলে রাজনীতির নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক।

রাজনীতি কি তবে ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম?
রাজনীতি কি মানুষের কাছ থেকে নেওয়ার হাতিয়ার?
না—রাজনীতি মানুষের জন্য দেওয়ার নাম।

ত্যাগের নাম, দায়িত্বের নাম, ভালোবাসা ও সেবার নাম।
কথায় কথায় মানুষকে অপমান, ভয় দেখানো কিংবা শারীরিক লাঞ্ছনার রাজনীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে হলে নেতৃত্বে চাই নম্রতা, সহনশীলতা ও মানবিক আচরণ।

ভয় দেখিয়ে কখনোই টেকসই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অতীতে যখন দোকানপাট দখল, পুকুর কেড়ে নেওয়া কিংবা বাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, সেসবেরই পুনরাবৃত্তি যদি আজ ভিন্ন পরিচয়ে ঘটে—তবে পুরোনো দুঃশাসনের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য কোথায়?

তারা একদিন আমাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কারণ শেষ বিচারে আল্লাহই উত্তম ফয়সালাকারী।

সবকিছু এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বরং এটি একটি নতুন পথচলার সূচনা মাত্র।

এখনই সময় আত্মসমালোচনার, সময় সংশোধনের।
মিঠামইনের মানুষ আমাদের কাছে যে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে—সে আশার মর্যাদা রাখতে হবে। রাজনীতিকে প্রতিহিংসার পথ থেকে সরিয়ে সেবার পথে নিয়ে যেতে হবে।

ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই গড়ে তুলতে হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও শান্তিপূর্ণ মিঠামইন।

লেখক: শাকিলুর রহমান শিকদার 

প্রবাসী কানাডা থেকে