ঢাকা ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার চাহিদা আছে, রাষ্ট্রের প্রস্তুতি নেই

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:২৮:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪৩ বার
ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ, অধ্যাপক শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় শক্তিশালী দিক হলো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতনতা। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা, এমনকি সাধারণ জনগণও আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন যে শিক্ষা কেন প্রয়োজন, কী শিখতে হবে এবং কিভাবে শিখতে হবে। অভিভাবকরাও বোঝেন যে তাঁদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য এবং সেই শিক্ষা যেন গুণগত হয়—এই উপলব্ধিও এখন ব্যাপকভাবে তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই শিক্ষার জন্য তারা কষ্ট সহ্য করতেও প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে আর্থিক বিনিয়োগ করতেও রাজি।

এ বিষয়টি নিয়ে সমাজে কার্যত কোনো দ্বিমত নেই। উন্নত অনেক দেশেও দেখা যায়, সরকার শিক্ষার জন্য প্রচুর সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে রাখলেও অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারমিডিয়েটের পর আর পড়াশোনা করতে চায় না। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
এখানে শিক্ষার্থীরা পড়তে চায়—শিখেছে কি না, কতটা শিখেছে, সে প্রশ্ন থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তাদের একটা স্বাভাবিক আগ্রহ ও ঝোঁক রয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকরাও চান, তাঁদের সন্তানরা পড়াশোনা করে এগিয়ে যাক।আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, বর্তমান তরুণ সমাজ ও অভিভাবকরা বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জানে। বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যাচ্ছে, সেখানে কাজ করছে বা পড়াশোনা করছে।

সে কারণে দেশের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও শ্রমবাজারের একটি সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে। এআই, নতুন প্রযুক্তি, বৈশ্বিক পরিবর্তন—এসব বিষয়ে তরুণরা জানে, অভিভাবকরাও জানেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় এখানেই, এই সচেতনতা ও আগ্রহের বিপরীতে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকরা প্রস্তুত নন। বৈশ্বিকভাবে যে রূপান্তর ঘটছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যে চাহিদা তৈরি হচ্ছে—তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নীতিনির্ধারকরা, বিশেষ করে সরকার শিক্ষাকে কখনোই প্রকৃত অর্থে অগ্রাধিকার দেয়নি।
শিক্ষা যাঁদের দায়িত্বে, তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টিকে রুটিন প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখেন। কোথাও কিছু বিনিয়োগ হয়, কিন্তু তা অনেক সময় সঠিক জায়গায় হয় না। আবার যেখানে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ দরকার, সেখানে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে শিক্ষার প্রতি ব্যাপক সামাজিক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরকারের ভেতরে একটি বড় ধরনের নীতিগত শূন্যতা বা পলিসি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। সরকার এখনো স্পষ্টভাবে বুঝে উঠতে পারেনি, কোন ধরনের শিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে দিতে হবে এবং সেই শিক্ষা দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হবে। তার ওপর সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখছে। একসময় এসএসসি বা এইচএসসি পাসের হার বাড়ানোকে যেমন সাফল্য হিসেবে দেখানো হতো, এখন ঠিক তেমনি নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকেই বড় অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষক, মানসম্মত পাঠদান, গবেষণার পরিবেশ, জবাবদিহি, সুযোগ-সুবিধা ও একাডেমিক সংস্কৃতি। বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্র কিংবা অভিভাবক—কারোরই কার্যকর জবাবদিহি নেই। এর ফল হিসেবে পুরো ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের হতাশা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র এই অস্থিরতা দৃশ্যমান। ডাকসু নির্বাচন, ছাত্রসংসদ, সাত কলেজের সংকট—এসব নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, তার তুলনায় মানসম্মত ও জীবনমুখী শিক্ষা নিয়ে মনোযোগ প্রায় নেই।

উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং সেই জ্ঞান সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রয়োগ করা। কিন্তু আমরা যে জ্ঞান তৈরি করছি, তা সময়োপযোগী কি না—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই। আমাদের কারিকুলাম, শিক্ষকদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিকতা—কোনোটিই ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বজুড়ে বলা হচ্ছে, এআই অনেক চাকরি বিলুপ্ত করবে, আবার একই সঙ্গে নতুন চাকরিও তৈরি করবে। কম্পিউটার যেমন একসময় বহু কাজের ধরন বদলে দিয়েছিল, তেমনি এআইও পরিবর্তন আনবে। ভারত এই বাস্তবতা বুঝে আইটি ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বেঙ্গালুরুর মতো প্রযুক্তি হাব থেকে ভারতীয় প্রকৌশলীরা সারা বিশ্বের শ্রমবাজার দখল করছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয় আইটি কম্পানির ওপর নির্ভরতা ছিল, যার ফলে বিপুল অর্থ দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, হাজার হাজার প্রকৌশলী তৈরি হলেও পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল বা ফ্লাইওভারের মতো বড় প্রকল্পে তারা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না। আবার বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে গিয়ে অন্য দেশের চাহিদা পূরণ করছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা যে জনশক্তি তৈরি করছি, তা দেশের শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রও সেই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না। এর মূল কারণ হলো কার্যকর ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিংয়ের অভাব। আমাদের জানা নেই, আগামী ১০ বা ২০ বছরে কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, গবেষক বা দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো এই হিসাব আগেভাগেই করে এবং সে অনুযায়ী শিক্ষা ও অভিবাসন নীতি নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে এমন অনেক বিষয়ে পড়াশোনা করানো হচ্ছে, যেখানে চাকরির বাজার খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভোগে। কারিকুলাম এখানে শুধু একটি সিলেবাস নয়; এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অবকাঠামো, গবেষণা, শিল্প খাত ও বৈশ্বিক সংযোগ একসঙ্গে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই সমন্বয় অনুপস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিসিএসকেন্দ্রিক প্রবণতা। লাখ লাখ শিক্ষার্থী বছরের পর বছর বিসিএসের পেছনে সময় ও শ্রম ব্যয় করছে, অথচ নিয়োগ পাচ্ছে মাত্র কয়েক হাজার। এর ফলে তরুণদের সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্যও এখানে স্পষ্ট। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে শীর্ষ কয়েকটি, কারিকুলামকে শুধু ডকুমেন্ট নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। তাদের ক্যাম্পাস সংস্কৃতি, অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা ও শৃঙ্খলার কারণে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষ হয়ে উঠছে। বিপরীতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব, অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জবাবদিহির অভাব এবং গবেষণার দুর্বল পরিবেশ শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভালো ছাত্র ভর্তি হলেও তাদের যথাযথ নারিশমেন্ট হচ্ছে না।

শিক্ষকদের বেতন কাঠামো দুর্বল হওয়ায় তাঁরা একাধিক জায়গায় পড়াতে বাধ্য হন, ফলে গবেষণা ও পাঠদানে মনোযোগ কমে যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক ভালো বেতন, গবেষণা সহায়তা ও পারফরমেন্সভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালো আউটপুট পাচ্ছে। এর ফল হিসেবে চাকরির বাজারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা এগিয়ে থাকছে, আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মূলত বিসিএসের দিকেই ঝুঁকে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার। রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতির প্রভাব থেকে বের করে আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম ইতিহাসের গৌরবে আটকে না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাকে ব্যবহার করতে হবে। জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার জাতির অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

অনুলিখন : মানজুর হোছাঈন মাহি

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

শিক্ষার চাহিদা আছে, রাষ্ট্রের প্রস্তুতি নেই

আপডেট টাইম : ১১:২৮:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ, অধ্যাপক শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় শক্তিশালী দিক হলো শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতনতা। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা, এমনকি সাধারণ জনগণও আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন যে শিক্ষা কেন প্রয়োজন, কী শিখতে হবে এবং কিভাবে শিখতে হবে। অভিভাবকরাও বোঝেন যে তাঁদের সন্তানদের জন্য শিক্ষা অপরিহার্য এবং সেই শিক্ষা যেন গুণগত হয়—এই উপলব্ধিও এখন ব্যাপকভাবে তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এই শিক্ষার জন্য তারা কষ্ট সহ্য করতেও প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে আর্থিক বিনিয়োগ করতেও রাজি।

এ বিষয়টি নিয়ে সমাজে কার্যত কোনো দ্বিমত নেই। উন্নত অনেক দেশেও দেখা যায়, সরকার শিক্ষার জন্য প্রচুর সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে রাখলেও অনেক শিক্ষার্থী ইন্টারমিডিয়েটের পর আর পড়াশোনা করতে চায় না। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন।
এখানে শিক্ষার্থীরা পড়তে চায়—শিখেছে কি না, কতটা শিখেছে, সে প্রশ্ন থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তাদের একটা স্বাভাবিক আগ্রহ ও ঝোঁক রয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকরাও চান, তাঁদের সন্তানরা পড়াশোনা করে এগিয়ে যাক।আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, বর্তমান তরুণ সমাজ ও অভিভাবকরা বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জানে। বাংলাদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদেশে যাচ্ছে, সেখানে কাজ করছে বা পড়াশোনা করছে।

সে কারণে দেশের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও শ্রমবাজারের একটি সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়েছে। এআই, নতুন প্রযুক্তি, বৈশ্বিক পরিবর্তন—এসব বিষয়ে তরুণরা জানে, অভিভাবকরাও জানেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় এখানেই, এই সচেতনতা ও আগ্রহের বিপরীতে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকরা প্রস্তুত নন। বৈশ্বিকভাবে যে রূপান্তর ঘটছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যে চাহিদা তৈরি হচ্ছে—তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এখনো প্রস্তুত নয়। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নীতিনির্ধারকরা, বিশেষ করে সরকার শিক্ষাকে কখনোই প্রকৃত অর্থে অগ্রাধিকার দেয়নি।
শিক্ষা যাঁদের দায়িত্বে, তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়টিকে রুটিন প্রশাসনিক কাজ হিসেবে দেখেন। কোথাও কিছু বিনিয়োগ হয়, কিন্তু তা অনেক সময় সঠিক জায়গায় হয় না। আবার যেখানে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ দরকার, সেখানে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এর ফলে শিক্ষার প্রতি ব্যাপক সামাজিক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরকারের ভেতরে একটি বড় ধরনের নীতিগত শূন্যতা বা পলিসি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। সরকার এখনো স্পষ্টভাবে বুঝে উঠতে পারেনি, কোন ধরনের শিক্ষা দিতে হবে, কিভাবে দিতে হবে এবং সেই শিক্ষা দেশীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হবে। তার ওপর সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণকে সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে দেখছে। একসময় এসএসসি বা এইচএসসি পাসের হার বাড়ানোকে যেমন সাফল্য হিসেবে দেখানো হতো, এখন ঠিক তেমনি নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকেই বড় অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত শিক্ষক, মানসম্মত পাঠদান, গবেষণার পরিবেশ, জবাবদিহি, সুযোগ-সুবিধা ও একাডেমিক সংস্কৃতি। বাস্তবতা হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্র কিংবা অভিভাবক—কারোরই কার্যকর জবাবদিহি নেই। এর ফল হিসেবে পুরো ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের হতাশা, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত সর্বত্র এই অস্থিরতা দৃশ্যমান। ডাকসু নির্বাচন, ছাত্রসংসদ, সাত কলেজের সংকট—এসব নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, তার তুলনায় মানসম্মত ও জীবনমুখী শিক্ষা নিয়ে মনোযোগ প্রায় নেই।

উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং সেই জ্ঞান সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রয়োগ করা। কিন্তু আমরা যে জ্ঞান তৈরি করছি, তা সময়োপযোগী কি না—এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই। আমাদের কারিকুলাম, শিক্ষকদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিকতা—কোনোটিই ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বজুড়ে বলা হচ্ছে, এআই অনেক চাকরি বিলুপ্ত করবে, আবার একই সঙ্গে নতুন চাকরিও তৈরি করবে। কম্পিউটার যেমন একসময় বহু কাজের ধরন বদলে দিয়েছিল, তেমনি এআইও পরিবর্তন আনবে। ভারত এই বাস্তবতা বুঝে আইটি ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বেঙ্গালুরুর মতো প্রযুক্তি হাব থেকে ভারতীয় প্রকৌশলীরা সারা বিশ্বের শ্রমবাজার দখল করছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি, বিশেষ করে ভারতীয় আইটি কম্পানির ওপর নির্ভরতা ছিল, যার ফলে বিপুল অর্থ দেশ থেকে বাইরে চলে গেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, হাজার হাজার প্রকৌশলী তৈরি হলেও পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল বা ফ্লাইওভারের মতো বড় প্রকল্পে তারা যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না। আবার বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে গিয়ে অন্য দেশের চাহিদা পূরণ করছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমরা যে জনশক্তি তৈরি করছি, তা দেশের শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রও সেই জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারছে না। এর মূল কারণ হলো কার্যকর ম্যানপাওয়ার প্ল্যানিংয়ের অভাব। আমাদের জানা নেই, আগামী ১০ বা ২০ বছরে কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স, গবেষক বা দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন হবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো এই হিসাব আগেভাগেই করে এবং সে অনুযায়ী শিক্ষা ও অভিবাসন নীতি নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে এমন অনেক বিষয়ে পড়াশোনা করানো হচ্ছে, যেখানে চাকরির বাজার খুবই সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভোগে। কারিকুলাম এখানে শুধু একটি সিলেবাস নয়; এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অবকাঠামো, গবেষণা, শিল্প খাত ও বৈশ্বিক সংযোগ একসঙ্গে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই সমন্বয় অনুপস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিসিএসকেন্দ্রিক প্রবণতা। লাখ লাখ শিক্ষার্থী বছরের পর বছর বিসিএসের পেছনে সময় ও শ্রম ব্যয় করছে, অথচ নিয়োগ পাচ্ছে মাত্র কয়েক হাজার। এর ফলে তরুণদের সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্যও এখানে স্পষ্ট। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে শীর্ষ কয়েকটি, কারিকুলামকে শুধু ডকুমেন্ট নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ হিসেবে গড়ে তুলেছে। তাদের ক্যাম্পাস সংস্কৃতি, অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা ও শৃঙ্খলার কারণে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি দক্ষ হয়ে উঠছে। বিপরীতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব, অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জবাবদিহির অভাব এবং গবেষণার দুর্বল পরিবেশ শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভালো ছাত্র ভর্তি হলেও তাদের যথাযথ নারিশমেন্ট হচ্ছে না।

শিক্ষকদের বেতন কাঠামো দুর্বল হওয়ায় তাঁরা একাধিক জায়গায় পড়াতে বাধ্য হন, ফলে গবেষণা ও পাঠদানে মনোযোগ কমে যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলক ভালো বেতন, গবেষণা সহায়তা ও পারফরমেন্সভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছ থেকে ভালো আউটপুট পাচ্ছে। এর ফল হিসেবে চাকরির বাজারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা এগিয়ে থাকছে, আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মূলত বিসিএসের দিকেই ঝুঁকে পড়ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন গভীর ও কাঠামোগত সংস্কার। রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতির প্রভাব থেকে বের করে আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম ইতিহাসের গৌরবে আটকে না থেকে ভবিষ্যৎ নির্মাণে তাকে ব্যবহার করতে হবে। জ্ঞান, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার জাতির অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

অনুলিখন : মানজুর হোছাঈন মাহি