রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই’ এটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখেই বেশি শুনে থাকেন সাধারণ মানুষ। নেতাদের মুখে বেশি শোনা এ লাইনটি রাজনীতিবিদরাই বারবার এটিকে সত্য বচন বলে প্রমাণ করেন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে আবারও প্রমাণ করেছেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই।
জানা গেছে, জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটে যোগ দেওয়া নেতারা ব্যক্তিস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সংসদ সদস্য (এমপি) হওয়া, ক্ষমতার সঙ্গে চলার আশা সবারই থাকে। এনসিপি এর বাইরে হয়তো যেতে পারেনি। মূলত রাজনৈতিক আশা থেকেই জোটে যাওয়া না যাওয়ার রাজনীতি দেশে জাতীয় নির্বাচনের আগে জমে উঠেছে। এবারও তাই হয়েছে। কারণ, এমপি হওয়ার, মন্ত্রী হওয়ার ও ক্ষমতার কাছে থাকার মতো ব্যাপারগুলোতে নেতারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার নজির স্থাপন করতে পারেননি এ দেশে। তাই ভোটের আগে ছোট দলগুলো আশ্রয়ের খোঁজে বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধে। জাতীয় নির্বাচনের আগে সবসময়ই দেশের রাজনীতিতে জোটের রাজনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে, এবারও রমরমা হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এমপি হবেন, মন্ত্রী হবেন ও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পারবেন এমন আকাক্সক্ষায় ভোটের আগে জোট হয়। এবারও এর ব্যত্যয় হয়নি। এগুলো বাদ দিতে পারলে ভিন্ন রাজনৈতিক চিত্র পাওয়া যেত। এখন এটি বলা যায়, এমপি হতে জামায়াত জোটে এনসিপি-এলডিপি। বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির ৩০ নেতার চাওয়াকে গুরুত্ব না দিয়ে জামায়াত জোটে দলটির যোগ দেওয়া জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পক্ষের মানুষগুলোকে হতাশ করেছে। একেবারেই ব্যক্তিস্বার্থে এলডিপি-জামায়াত জোটভুক্ত হলেও এমপি হতে এনসিপির এমন সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। কারণ, একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ দেশে এনসিপির জন্ম হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত ২৯ সেপ্টেম্বরও জনসমক্ষে বলেছেন, এনসিপি কোনো জোটে যাবে না। নিজস্ব অবস্থানে থেকেই রাজনীতি করবে। জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলনের বিষয়টিও তিনি নাকচ করেন। ওইদিন ঢাকায় দলের সমন্বয় সভায় এ মন্তব্য করে নাহিদ বলেন, ‘জাতীয় ও গণপরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছি।’
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাজনীতি করার লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করে কোনো দলের পথনীতিতে রাজনীতি করতে হয়। সবার আগে দেশের ও জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করলে অদূরদর্শী রাজনীতি করা অসম্ভব ব্যাপার।’
বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সখ্য গড়াকে ইস্যু করে এলডিপির শীর্ষ নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ২০০৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ছেড়ে চলে যান। অবশ্য, বিএনপি ছেড়েই তিনি এলডিপি গড়েন। কর্নেল অলির বিএনপি ছাড়ার পেছনে মূল বিষয় ছিল ব্যক্তিস্বার্থ। তার আসনে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়া ও পরে মন্ত্রী না বানানোর গোস্বা থেকে বিএনপি ছাড়েন তিনি।
সর্বশেষ জামায়াতের সঙ্গে কর্নেল অলির জোটভুক্ত হওয়ার ঘটনা দেশের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে অবাক করে দিয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটভুক্ত হওয়ার ব্যাপারটিও দেশের রাজনীতিতে আলোচিত ঘটনা। এ ঘটনায় এনসিপির একাধিক নারী নেত্রী চরম বিরোধিতা করেন। এ ছাড়া এই সমঝোতার বিরোধিতা করে দলের আহ্বায়কের কাছে চিঠি দিয়েছেন ৩০ জন নেতা। তাদের বেশ কয়েকজন ইতিমধ্যে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। এনসিপির অন্যতম নেতা ডা. তাসনিম জারা জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের সমালোচনা করে স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণা দেন।
গতকাল রবিবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জানান, এলডিপি ও এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। তিনি জানান, এনসিপি দলীয় বৈঠক করে জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাব জানাবে। শফিকুর রহমান বলেন, ‘আগে আটটি দল জামায়াতের সঙ্গে ছিল। আর দুটি দল আজ (গতকাল) যোগ দিল। আরও দল আমাদের সঙ্গে সমঝোতার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে সেটি সম্ভব হচ্ছে না।’ জামায়াত আমির বলেন, ‘জোটের অধিকাংশ আসন নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। কয়েকটি এখনো বাকি আছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর এগুলো ঠিক করা যাবে।’
গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে সব আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার আলোচনা শুরু করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)। এ সাত দলের পর জোটে যোগ দেয় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। জামায়াতসহ এই আটটি দল বিভিন্ন দাবিতে অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে টানা অনেক দিন মাঠে ছিল। নতুন করে এনসিপি ও এলডিপি নির্বাচনী সমঝোতায় যুক্ত হওয়ায় এখন দলের সঙ্গে সংখ্যা দাঁড়াল ১০টিতে।
এনসিপির জোট বাঁধা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের বলেন, ‘আগস্টের ৫ তারিখ রাতে জামায়াত নেতার বাসায় মিটিং দিয়ে যেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটা আজকে এসে পূর্ণতা পাইছে। এ দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যারা নিরলস পরিশ্রম করেছেন, তাদের জানাই অভিনন্দন। তবে নাহিদ ইসলামরা মানুষের আবেগ নিয়ে এভাবে প্রতারণা না করলেও পারতেন।’ গতকাল ফেসবুকে প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন কাদের।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, কয়েকজনের পদত্যাগে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না। গতকাল সকালে ফ্যাসিবাদী আমলের নিপীড়নমূলক মামলায় জামিন নিতে আদালতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন সমঝোতা বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনা চলমান রয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহেদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এনসিপির শীর্ষনেতারা সবসময়ই বলে এসেছেন তারা কোনো জোটে যাবেন না। হঠাৎ এমন কী হলো!’ পরে তিনি বলেন, ‘আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে আগ্রহী নই।’
Reporter Name 

























