২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিএনপি। পরদিন ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
আওয়ামী লীগ বিজয়ী হওয়ার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে থাকে। ৬ জানুয়ারি মহাজোট সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিএনপি যোগদান করে। ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও খালেদা জিয়াসহ বিএনপির সংসদ সদস্যরা যোগদান করেন। কিন্তু মহাজোট সরকার প্রথম থেকেই অগণতান্ত্রিক আচরণ শুরু করে, যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে যখন একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য তাঁর লড়াই নতুন করে শুরু করেছিলেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে শহীদ মইনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন খালেদা জিয়া। ১৯৮১ সালে ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সেনা অভ্যুত্থানে শাহাদতবরণ করলে তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার সেনানিবাসের ওই বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেন। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে জোর করে উচ্ছেদ করে আওয়ামী লীগ সরকার। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর ভূমিকার জন্য তাঁকে ২০১১ সালে নিউজার্সির স্টেট সিনেট ‘গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা’ উপাধিতে সম্মানিত করে।
মহাজোট সরকার গোটা দেশবাসীর মতামত ও আবেদন-নিবেদন উপেক্ষা করে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে একদলীয় শাসন কায়েম করে এবং গণতন্ত্রের পথকে রুদ্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার নিজ দলের অধীনে যেনতেনভাবে একের পর এক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে পুনরায় ক্ষমতা দখলে করে। বিএনপি দেশের জনগণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখে লড়াই করেছে। জানুয়ারি ২০১৫ থেকে তিনি গুলশানে তাঁর অফিসে অবরুদ্ধ হন। এই অবরুদ্ধ অবস্থায় মালয়েশিয়ায় আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক বন্দি হওয়ার পর দীর্ঘ এক বছর সাত দিন কারাগারে অবস্থানকালে তাঁর বিরুদ্ধে চলতে থাকা কোনো মামলা ও অভিযোগেরই উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি এবং চলতে থাকা তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে তাঁর পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে আওয়ামী লীগ সরকার। খালেদা জিয়াকে বন্দি করে পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগার কাশিমপুরে নিয়ে আটক রাখা হয়।
২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র্যাকটিস প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে যে মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবেই তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে ‘ন্যায্যবিচারের অধিকারকে সম্মান করা হচ্ছে না’। কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও সাত বছর কারাদণ্ড প্রদান করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিচারক ও বিচারালয়। একের পর এক মিথ্যা মামলায় অসুস্থ খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক রেখে তাঁর মনোবল দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করা হয়। এমনকি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বিধি-নিষেধ জারি করা হয়। অন্যদিকে বিদেশে চিকিৎসাধীন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক ৭৫টি মামলা দিয়ে দেশে ফিরে আসার পথ বন্ধ করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরদিনই রাষ্ট্রপতির আদেশে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শাস্তি মওকুফ ও মুক্তির ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খালেদা জিয়ার মুক্তির পরদিন ৭ আগস্ট এক মহাসমাবেশের আয়োজন করে বিএনপি। কারামুক্ত খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে এখন বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে দলটি। দীর্ঘদিন আটক থাকা নেতাকর্মীরা ছাড়া পেয়ে রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হয়েছেন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন—‘মা, মাটি, মানুষ, এ দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি এবং সর্বোপরি দেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।’ তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, গণতন্ত্র ছাড়া কোনো দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শুধু দেশের গণতন্ত্র নয়, দলের মধ্যেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য উদাহরণ। তিনি নেতাকর্মীদের কথা বেশি শোনেন, বারবার শোনেন, বোঝার চেষ্টা করেন এবং তারপর আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আর একবার যে সিদ্ধান্ত নেন, সেই সিদ্ধান্ত থেকে কখনো পিছু হটেন না; যার প্রমাণ ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের শাসন আমল ও ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার আমলে তাঁর বিরুদ্ধে গৃহীত মিথ্যা মামলা, কারাদণ্ড ও নির্যাতন। সে কারণে তিনি আজ গুরুতর অসুস্থ। তিনি সুস্থ হয়ে আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন, সেই শুভ কামনা সবার।
শেখ রফিক
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
Reporter Name 

























