আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখোপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেয়ার পর প্রাথমিক অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে তাকে রাত ৮টার দিকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে ঢামেকে নেয়ার পর অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনাবাহিনী সদস্য মোতায়েন করা হয়। এছাড়া হাদিকে বাঁচাতে রক্তের ব্যবস্থা করে সেনাবাহিনী। হাদি দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত ও ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে হামলায় জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক বিবৃতিতে এই নির্দেশ দেয়া হয়। হাদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেখতে ছুটে যান একই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান।
ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক (আরএস) ডা. মোশতাক আহমেদ জানান, হাদির অবস্থা খুবই গুরুতর। তার মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তিনি এখন কোমায় (গভীর অচেতন অবস্থায়) আছেন। তার চিকিৎসা চলছে। তিনি বলেন, তার মাথায় বুলেট রয়েছে। বুকে ও পায়েও আঘাত আছে। ধারণা করা হচ্ছে, পায়ের আঘাতটা রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে হতে পারে। আমরা ঢাকা মেডিক্যালে একটি প্রাথমিক অস্ত্রোপচার করেছি। এখন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা ঢাকা মেডিক্যালে প্রাথমিক অস্ত্রোপচার করেছি। তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। পরিবারের সম্মতিতেই তাকে এভারকেয়ারে নেয়া হয়। পরিবার প্রথম দিকে সিএমএইচ হাসপাতালে নেয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এভারকেয়ারে নেয়ার কথা বলে। আমরা তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তারা প্রস্তুত থাকায় তাকে সেখানে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেছেন, হাদিকে গুলি করা সন্ত্রাসীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা ও র্যাবসহ সবাই কাজ করছে দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারের জন্য। র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, গুলির ঘটনা ঘটার পরপরই র্যাব-৩, সদর দফতরের গোয়েন্দা ইউনিটসহ সবগুলো টিম গুলি করা দুজনকে আটকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে একটা ভালো খবর জানাতে পারব।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, হাদিকে গুলির সাথে জড়িত দুর্বৃত্তদের গ্রেফতারে পুলিশ, ডিবি, র্যাব ও গোয়েন্দাদের সমন্বয়ে অভিযান চলছে। গুলির সাথে জড়িতদের পুরো ভিডিও ফুটেজ আমাদের এবং হাদির সাথে যারা ছিলেন তাদের কাছে রয়েছে। ওই ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করার জন্য মাঠে রয়েছে একাধিক টিম। এ গুলির ঘটনায় দু’টি সূত্র ধরে তদন্ত চলছে। যারা বর্তমান সরকারের সময় দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে চায় এবং একটি বড় দল যারা নানা বাহানায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায় না। তবে গুলির সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করা সম্ভব হলেই নেপথ্যে জড়িতদের বের করা সম্ভব হবে বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দুর্বৃত্তদের ধরতে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি টিম মাঠে কাজ শুরু করেছে। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের কাজ করছেন তারা।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদির পেছনের রিকশায় ছিলেন মো. রাফি। তিনি ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দেন। মো. রাফি ইনকিলাবকে বলেন, জুমার নামাজ শেষে আমরা হাইকোর্টের দিকে আসছিলাম। রিকশায় ছিলাম। বিজয়নগর আসতেই একটি মোটরসাইকেলে করে দুজন এসে হাদি ভাইয়ের ওপর গুলি করে পালিয়ে যায়। আমি ভাইয়ের পেছনের রিকশায় ছিলাম। গত নভেম্বর মাসে দেশি-বিদেশি ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পেয়েছেন বলে জানিয়েছিলেন জুলাই আন্দোলনের সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদি। ১৪ নভেম্বর ফেসবুকে একটি পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে হত্যা, তার বাড়িতে আগুনসহ তার মা-বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেয়া হয়েছে। হাদি লিখেছিলেনÑ ‘গত তিন ঘণ্টায় আমার নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টি বিদেশি নম্বর থেকে কল ও টেক্স করেছে। যার সামারি হলোÑ আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা-বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।’
ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য মো. সাফিউর রহমান ইনকিলাবকে বলেন, হাদি ভাই আগে থেকেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১১টার দিকে সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ের সামনে ক্যাম্পেইন করবেন। ঘোষণা অনুযায়ী দলীয় সবাই সেখানে উপস্থিত হচ্ছিলেন। এ সময় ওই দুই দুর্বৃত্তও উপস্থিত ছিল। তারা গত সপ্তাহেও দুদিন আমাদের সাথে ক্যাম্পেইন করেছিল। সব সময় মাস্ক পরা থাকত তাদের, কোনো সময় তা খুলত না। পিআর টিম তাদের ছবি তুলতে চাইলে তারা বলেছে, মাস্ক খুলা যাবে না, ঝামেলা আছে। তাই ছবিগুলো মাস্কের ওপর দিয়েই তোলা হয়। আমাদের কাছে সেই ছবিও রয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চের এ নেতা বলেন, এরপর ক্যাম্পেইন শেষ হলে সবাই নিজের পথে চলে যায়। হাদি ভাইয়ের সঙ্গে তখন ৯ জন ছিলেন। তারা তিনটি রিকশা নিয়ে রিকশা প্রতি তিনজন করে যাত্রা শুরু করেন। প্রথম রিকশায় হাদি ভাইসহ তিনজন ছিলেন। তারা খলিল হোটেলের সামনে একটি মসজিদে নামাজ পড়ে হাইকোর্টের দিকে যাচ্ছিলেন। নামাজ শেষে মসজিদের মুয়াজ্জিনও তাদের সঙ্গে রিকশায় ছিলেন। পরে তারা হাইকোর্টের সামনে খাওয়া সেরে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে যাওয়ার কথা ছিল, যেখানে রাতে একটি প্রোগ্রাম আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, হাদি ভাই ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন মসজিদে নামাজ পড়ার সময় ওই দুই দুর্বৃত্ত বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। নামাজ শেষ করে তারা তিনটি রিকশায় হাইকোর্টের সামনে খেতে যাচ্ছিল, তখন ওই দুজন মোটরসাইকেলে রিকশার সঙ্গে চলে আসে। এরপর হঠাৎ পকেট থেকে পিস্তল বের করে গুলি করে পালিয়ে যায় তারা। ওই দুজন আগে থেকেই আমাদের সঙ্গে ছিল। কয়েক দিন তারা আমাদের প্রোগ্রামেও এসেছে এবং লিফলেট বিতরণে অংশ নিয়েছে। মোটামুটি আমাদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠলেও তারা কখনো মুখ দেখায়নি, সবসময় মাস্ক পরে থাকত।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল : হাদি দুর্বৃত্তদের হাতে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার দুটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। গতকাল জুমার নামাজের পর রাজধানীর বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় তাকে গুলি করা হয়। ২টা ৩৫ মিনিটের দিকে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২টা ২০ মিনিটের দিকে গুলির শব্দ শোনা যায়। এর কয়েক সেকেন্ড পর একটি মোটরসাইকেলকে সড়ক দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
অন্য আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে যাচ্ছিলেন হাদি। এ সময় ওই অটোরিকশাটির পিছু নেয় একটি মোটরসাইকেল। রিকশাটির ডান পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসা একজন হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এরপর মোটরসাইকেলটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। বর্তমানে ঘটনাস্থল রশি দিয়ে ঘিরে রেখেছে র্যাব, পুলিশ ও ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছেন।
ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ, ক্ষুব্ধ নেটিজেনরা : ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নেটিজেনরা। তারা অবিলম্বে দোষীদের গ্রেফতার করে শাস্তি দাবি করছেন। সাইদ মাহমুদ লিখেছেন, ‘এটা মানতে পারছি না, যদি ওসমান হাদির নিরাপত্তা না দিতে পারেন তাহলে রাষ্ট্র সামনে নির্বাচনের সব প্রার্থীকে কিভাবে নিরাপত্তা দেবে? এই ঘৃণ্য হামলার তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করছি।’ জহির উদ্দিন তুহিন লিখেছেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থাকে বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। তারই অংশ হিসেবে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়েছে। যারা দেশে নির্বাচন চায় না, তারা কারা?’
হাসপাতালে ছুটে যান মির্জা আব্বাস : নির্বাচনী প্রচারণাকালে গুলিবিদ্ধ ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দেখতে ছুটে যান একই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে মির্জা আব্বাস ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান। তিনি হাদির খোঁজখবর নেন এবং বেশ কিছু সময় হাসপাতালে অবস্থান করে ফিরে যান।
Reporter Name 























