ঢাকা ০২:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬, ৯ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

অগ্রহায়ণে আল্লাহর রহমত : রিজিক, কৃতজ্ঞতা ও কৃষকের ঈমানি হাসি

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১২:০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৯ বার
মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ফসলের মাঠে কৃষকের হাসিতে রঙিন অগ্রহায়ণ। সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা একটি ঈমানি যোগ্যতা। তাঁরই ঘোষণা ‘যদি তোমরা আমার অনুগ্রহপ্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেওয়া হবে…।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)

হাদিসে আছে, ‘দুনিয়া হচ্ছে আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।

’ মানুষের জীবনোপকরণ ‘রিজিক’ জীবিকার জোগান হলো ফসলি মাঠ। মাটির অতলান্ত গভীরে মানুষের রিজিকের ব্যবস্থা রেখে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোরধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি।

আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফল-ফলাদি ও ঘাস…।’ (সুরা : আবাছা, আয়াত : ২৪-৩২)

তিনি আবারও বলেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য মাটিকে ব্যবহারের উপযোগী করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা এর দিকদিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক আহার করো…।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৫)

পবিত্র কোরআনে তরুলতা ও উদ্যানের উল্লেখ এবং এগুলোর বহুবিধ উপকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে ‘যিনি নানা প্রকারের লতাবিশিষ্ট ও কাণ্ডের ওপর দণ্ডায়মান বিশিষ্ট বাগান খেজুরগাছ ও নানা প্রকার খাদ্যের উদ্ভিদ, ভেষজ, ফল-ফলাদি, জাইতুন ও আনারের গাছ সৃষ্টি করেছেন…।

’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)বাংলাদেশের ফসলের মাঠ হলো, রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত ‘খাদ্য ভাণ্ডার’। সুরা আর রহমানে আছে, ‘তিনি ভূপৃষ্ঠকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টজীবের জন্য। এতে রয়েছে ফলমূল ও খেজুরগাছ, যার ফল আবরণযুক্ত, আর আছে খোসাবিশিষ্ট দানা…।’ (সুরা : আর রহমান, আয়াত : ১০-১২)

এখানে ওই খোসাকে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর কুদরতে যার ভেতরে মোড়কবিশিষ্ট অবস্থায় শস্যদানা সৃষ্টি হয়। যেমন—গম, বুট, ধান, মাষকলাই, মসুর ইত্যাদি।

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা জমিনে প্রচ্ছন্ন লুক্কায়িত ভাণ্ডারে খাদ্য অন্বেষণ করো।’ (তিরমিজি)

ইসলামী অনুশাসন মেনে অগ্রহায়ণের ‘দাও-মাড়ি (ফসল কাটা)’ হতে পারে ইবাদতের অনুষঙ্গ এবং পারলৌকিক মুক্তির উপায়। কেননা, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ‘ওশর’ (মুসলমানদের ফসলি কর) একটি বাধ্যতামূলক  ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন ফসল পাকে, তখন তা খাও এবং ফসল কাটার দিন তা থেকে আল্লাহর হক (দুস্থজনের হক) আদায় করো।’ (সুরা : আন-আম, আয়াত : ১৪১)

তিনিই বলেন, ‘যা আমি তোমাদের ভূমি থেকে উৎপাদন করেছি তা থেকে পবিত্র (উত্তম) অংশ খরচ করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৬৭)

অগ্রহায়ণে গ্রাম-গ্রামান্তরে ফসল কাটার উল্লাসে গুড়, নারকেল, দুধ, কলা, নতুন চাল এবং নানা দেশীয় উপকরণের মিশ্রণে তৈরি হয় ক্ষীর-পায়েস আর রঙেঢঙের বারোয়ারি পিঠা। পাড়া-পড়শির হৈ-হুল্লোড় জাগা কৃতজ্ঞতা ও দাওয়াল আতিথ্যের মুসলিম ঐতিহ্য হয়ে ওঠে উৎসব। অথচ আবহমান কাল ধরে রূপ-রস-গন্ধে ভরপুর সোনাছোঁয়া ফসলের মাঠে দুস্থজনের হক ও মহান আল্লাহর হুকুমও উপেক্ষিত হচ্ছে অজ্ঞতা, যান্ত্রিকতা ও স্বার্থপরতার কৌশলে।

মানবীয় পরিশ্রমেই যে খাদ্য উৎপাদন হয় এমন নয়, বরং বীজ থেকে চারা, ভূগর্ভস্থ পানির সেচ, শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ, সবকিছু হয় মহান আল্লাহর কুদরতে। তিনি বলেন, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তা থেকে উৎপন্ন করো, না  আমি-ই উৎপন্নকারী? ইচ্ছা করলে, আমি তা খরকুটা করে দিতে পারি…।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৩-৬৫)

বস্তুত মানুষের জীবন হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সুসমন্বয় মাত্র। মহান আল্লাহর রহমতই অগ্রহায়ণে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্যে :

‘সোনা রঙে সোনালি ধানে

ভরে গেছে মাঠ,

খুশির জোয়ার ঘরে ঘরে

বসেছে চাঁদের হাট।’

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর-১৭৩০

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

অগ্রহায়ণে আল্লাহর রহমত : রিজিক, কৃতজ্ঞতা ও কৃষকের ঈমানি হাসি

আপডেট টাইম : ১২:০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ফসলের মাঠে কৃষকের হাসিতে রঙিন অগ্রহায়ণ। সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা একটি ঈমানি যোগ্যতা। তাঁরই ঘোষণা ‘যদি তোমরা আমার অনুগ্রহপ্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেওয়া হবে…।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)

হাদিসে আছে, ‘দুনিয়া হচ্ছে আখিরাতের শস্যক্ষেত্র।

’ মানুষের জীবনোপকরণ ‘রিজিক’ জীবিকার জোগান হলো ফসলি মাঠ। মাটির অতলান্ত গভীরে মানুষের রিজিকের ব্যবস্থা রেখে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোরধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি।

আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষবিশিষ্ট বাগান, ফল-ফলাদি ও ঘাস…।’ (সুরা : আবাছা, আয়াত : ২৪-৩২)

তিনি আবারও বলেন, ‘তিনিই তোমাদের জন্য মাটিকে ব্যবহারের উপযোগী করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা এর দিকদিগন্তে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক আহার করো…।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ১৫)

পবিত্র কোরআনে তরুলতা ও উদ্যানের উল্লেখ এবং এগুলোর বহুবিধ উপকারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে ‘যিনি নানা প্রকারের লতাবিশিষ্ট ও কাণ্ডের ওপর দণ্ডায়মান বিশিষ্ট বাগান খেজুরগাছ ও নানা প্রকার খাদ্যের উদ্ভিদ, ভেষজ, ফল-ফলাদি, জাইতুন ও আনারের গাছ সৃষ্টি করেছেন…।

’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৪১)বাংলাদেশের ফসলের মাঠ হলো, রাব্বুল আলামিন প্রদত্ত ‘খাদ্য ভাণ্ডার’। সুরা আর রহমানে আছে, ‘তিনি ভূপৃষ্ঠকে স্থাপন করেছেন সৃষ্টজীবের জন্য। এতে রয়েছে ফলমূল ও খেজুরগাছ, যার ফল আবরণযুক্ত, আর আছে খোসাবিশিষ্ট দানা…।’ (সুরা : আর রহমান, আয়াত : ১০-১২)

এখানে ওই খোসাকে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর কুদরতে যার ভেতরে মোড়কবিশিষ্ট অবস্থায় শস্যদানা সৃষ্টি হয়। যেমন—গম, বুট, ধান, মাষকলাই, মসুর ইত্যাদি।

প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা জমিনে প্রচ্ছন্ন লুক্কায়িত ভাণ্ডারে খাদ্য অন্বেষণ করো।’ (তিরমিজি)

ইসলামী অনুশাসন মেনে অগ্রহায়ণের ‘দাও-মাড়ি (ফসল কাটা)’ হতে পারে ইবাদতের অনুষঙ্গ এবং পারলৌকিক মুক্তির উপায়। কেননা, মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ‘ওশর’ (মুসলমানদের ফসলি কর) একটি বাধ্যতামূলক  ব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন ফসল পাকে, তখন তা খাও এবং ফসল কাটার দিন তা থেকে আল্লাহর হক (দুস্থজনের হক) আদায় করো।’ (সুরা : আন-আম, আয়াত : ১৪১)

তিনিই বলেন, ‘যা আমি তোমাদের ভূমি থেকে উৎপাদন করেছি তা থেকে পবিত্র (উত্তম) অংশ খরচ করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৬৭)

অগ্রহায়ণে গ্রাম-গ্রামান্তরে ফসল কাটার উল্লাসে গুড়, নারকেল, দুধ, কলা, নতুন চাল এবং নানা দেশীয় উপকরণের মিশ্রণে তৈরি হয় ক্ষীর-পায়েস আর রঙেঢঙের বারোয়ারি পিঠা। পাড়া-পড়শির হৈ-হুল্লোড় জাগা কৃতজ্ঞতা ও দাওয়াল আতিথ্যের মুসলিম ঐতিহ্য হয়ে ওঠে উৎসব। অথচ আবহমান কাল ধরে রূপ-রস-গন্ধে ভরপুর সোনাছোঁয়া ফসলের মাঠে দুস্থজনের হক ও মহান আল্লাহর হুকুমও উপেক্ষিত হচ্ছে অজ্ঞতা, যান্ত্রিকতা ও স্বার্থপরতার কৌশলে।

মানবীয় পরিশ্রমেই যে খাদ্য উৎপাদন হয় এমন নয়, বরং বীজ থেকে চারা, ভূগর্ভস্থ পানির সেচ, শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ, সবকিছু হয় মহান আল্লাহর কুদরতে। তিনি বলেন, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তা থেকে উৎপন্ন করো, না  আমি-ই উৎপন্নকারী? ইচ্ছা করলে, আমি তা খরকুটা করে দিতে পারি…।’ (সুরা : ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৩-৬৫)

বস্তুত মানুষের জীবন হলো দুনিয়া ও আখিরাতের সুসমন্বয় মাত্র। মহান আল্লাহর রহমতই অগ্রহায়ণে কৃষকের গোলা ভরে ওঠে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্যে :

‘সোনা রঙে সোনালি ধানে

ভরে গেছে মাঠ,

খুশির জোয়ার ঘরে ঘরে

বসেছে চাঁদের হাট।’

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর-১৭৩০