ক্যান্টনমেন্টের শহীদ মঈনুল সড়কে প্রায় চার দশক ধরে বসবাসের পর ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। প্রয়াত স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়ি ছাড়ার পর খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছিলেন—তাকে “এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।” সেদিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে দেখা যায় তাঁকে।
সরকার পরিবর্তনের পর শুরু হয় উচ্ছেদের প্রক্রিয়া:
২০০৯ সালে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন জেনারেল মো. আব্দুল মুবীন। বিএনপির অভিযোগ—খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদে তৎকালীন সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সেনাপ্রধান মুবীন ছিলেন মূল কারিগর।
খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠদের দাবি, সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থাকলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব হতো না।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেও সরাতে ভূমিকা—এমন অভিযোগ:
২০১১ সালে বয়সের অজুহাতে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেয় সরকার। আদালতে লড়াই করেও তিনি পদ ফিরে পাননি; হারান সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্বও।
বিএনপি ও ইউনূসের ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ—সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেও তৎকালীন সেনাপ্রধান আব্দুল মুবীন সমর্থন ও ভূমিকা রেখেছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ড. ইউনূসের দল গঠনের উদ্যোগ আওয়ামী লীগ সভাপতির সঙ্গে তার সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। ২০০৯–এর সরকার গঠনের পর দুই বছরের মাথায় ইউনূসকে সরিয়ে দেওয়া হয়, একই সময়ে শুরু হয় খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্ট বাড়ি নিয়ে বিতর্ক।
জিয়া পরিবারের সঙ্গে বাড়িটির ইতিহাস:
১৯৭২ সালে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে জিয়াউর রহমান পরিবারসহ শহীদ মঈনুল সড়কের ৬ নম্বর বাড়িতে ওঠেন। সেনাপ্রধান, সামরিক প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও তিনি একই বাড়িতেই ছিলেন।
১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে সেনা বিদ্রোহে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর সেই বছরের ১২ জুন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার ইজারা দলিলের মাধ্যমে বাড়িটি খালেদা জিয়ার নামে বরাদ্দ দেন। এরপর থেকেই তিনি পরিবারসহ সেখানে বসবাস করে আসছিলেন।
উচ্ছেদের দিন কান্নায় ভেঙে পড়েন খালেদা জিয়া:
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বিকেলে দীর্ঘ নাটকীয় পরিস্থিতির পর বাড়িটি ছাড়েন বিএনপি চেয়ারপারসন। সেদিন গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন—
“আমার বেডরুমের দরজা ভেঙে টেনে-হিঁচড়ে আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে।”
সর্বোচ্চ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় উচ্ছেদকে তিনি সরকার–পৃষ্ঠপোষকতা এবং “উচ্চ আদালতের অসম্মান” বলে মন্তব্য করেন।
বাড়ি ছাড়ার সময় খালেদা জিয়ার কান্নার দৃশ্য সে দিন দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
ক্ষমতা বদলের পর আবার সেনানিবাসে উপস্থিতি:
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় সেনানিবাসে না গেলেও ক্ষমতার পালাবদলের পর সাম্প্রতিক সময়ে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন খালেদা জিয়া। সেখানে তাঁর পাশে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে যোগসূত্র:
তৎকালীন সেনাপ্রধান আব্দুল মুবীনের নাম এখন আলোচিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। গ্রুপটির শীর্ষ ব্যক্তি হাসান মাহমুদ রাজাসহ তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।
শেখ হাসিনা সরকারের সময় মুবীন বিভিন্ন দপ্তরে প্রভাব খাটিয়েছেন এবং নানা সুবিধা নিয়েছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে। ইউনাইটেড গ্রুপের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থপাচার ইস্যুতেও তাঁর নাম ওঠে এসেছে বলে বিএনপির দাবি।
আইনের আওতায় না আসায় প্রশ্ন উঠছে:
বিডিআর পিলখানা হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়া, ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন পরিচালনা এবং খালেদা জিয়াকে গৃহচ্যুত করার ঘটনায় সেনাবাহিনীর অনেককে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হলেও সেনাপ্রধান মুবীন এখনো আইনের আওতায় না আসায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে
Reporter Name 
























