ঢাকা ০৫:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মাঠ প্রশাসনে প্রভাব বাড়ছে জামায়াতের

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫
  • ৩৯ বার

মেধাবী-যোগ্যতার বদলে পাতানো লটারি নেপথ্যে প্রধান উপদেষ্টার আস্থাভাজন জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষোভ-অসন্তোষ : ইউএনও নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ লটারিতে ৬৪ জেলার এসপিকে একযোগে বদলি : ডিআইজি হলেন ৩৩ কর্মকর্তা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনে জামায়াতের প্রতি আনুগত্য কর্মকর্তাদের লটারির নামে কৌশলে জেলা প্রশাসক, এসপি ও ইউএনও পদসহ নানা পদে বসানো হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগপ্রাপ্ত আস্থাভাজন জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা লটারি এবং যোগ্যতার নামে মাঠ প্রশাসনের জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিয়ে পদায়ন করছেন। নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা করা হবে আগামী ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে। গতকাল বুধবার লটারির নামে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) রদবদল করা হয়েছে।

পুলিশের এ রদবদলে ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টি জেলায় নিয়োগ পেয়েছেন জামায়াতপন্থি হিসেবে পুলিশের কর্মরত কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, শিক্ষাজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দেয়া হয়েছে কম গুরুত্বপূর্ণ তথা বি ও সি ক্যাটাগরির জেলায়। অনেককেই আবার জেলা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে- ডিসি, এসপি ও ইউএনও নিয়োগে ছাত্রজীবনে জামায়াতের রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন কর্মকর্তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। লটারির মাধ্যমে সুকৌশলে জামায়াতপন্থি আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠ প্রশাসনে বসানো নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক উঠতে শুরু করেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনে ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মাঠ পর্যায়ের ওই সব গুরুত্বপূর্ণ পদ দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বসানোর বদলে সুকৌশলে জামায়াতপন্থিদের বসানোর রহস্য কী? অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরা কী জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন?

বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ওসিদেরও লটারির মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে। এর আগে দেশের ৫০টি জেলার ডিসি (জেলা প্রশাসক) পরিবর্তন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানেও জামায়াতের প্রতি আনুগত্য কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের রদবদল নিয়ে দেশের সর্বমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ সরকারের ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ততই প্রশ্ন বাড়ছে। তবে ডিসি, এসপি, ইউএনও-এসিল্যান্ড-ওসি নিয়োগ ও পদায়ন এবং বদলিতে জনপ্রশাসন-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। যেখানে ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেওয়া হবে তার আগে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন দেয়া ঠিক নয় বলে মনে করছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।

কার্যত দুই ভিন্ন মুখের প্রশাসন? প্রথম দিকে সরকার বলছে লটারিই স্বচ্ছতার একমাত্র উপায়। অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন নীতিমালায় লটারি নেই। আবার রাজনৈতিক দলের সংলাপে লটারির দাবি উঠে এসেছে নতুন করে। প্রশ্ন উঠছে এই তিনটি অবস্থান কি পরস্পর পরিপূরক, নাকি মাঠ প্রশাসন নিয়ে সরকার নিজেই দ্বিধায়? স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। সন্দেহমুক্ত প্রশাসন নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে সাহায্য করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নে লটারির মতো অপ্রচলিত ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উপায় বললেও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ-সংশয় বাড়াচ্ছে বরং কমাচ্ছে না। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার ঠিক আগে মাঠ প্রশাসনে এ ধরনের রদবদলের সিদ্ধান্ত ‘সংবেদনশীল’ বলে দাবি তাদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নয়, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাই হতে হবে প্রধান মানদ-। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে হিসেবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বাকি মাত্র কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন দফতরে, বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে বড় পরিসরে রদবদল শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পরিবর্তন আসছে দ্রুতগতিতে। প্রশ্ন উঠছে, এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, পরিষ্কার হয়নি নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার বিষয়টিও। তাহলে এই স্বল্প সময়ের জন্য মাঠ প্রশাসনে রদবদলের পেছনে সরকারের কী উদ্দেশ্য? এবং এর প্রভাবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কতটা কার্যকরভাবে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে- সে বিষয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর পুরো প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে যায়। অর্থাৎ ডিসি, এসপি, ইউএনও, থানার ওসি এমনকি সরকারি দপ্তরের কর্মচারীরাও তখন ইসির নির্দেশে কাজ করেন। ভোটারদের নিরাপত্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমান সুযোগ দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা ইসির অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু ইতঃপূর্বে অনুষ্ঠিত একাধিক জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পরও প্রশাসনের রদবদল বা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থেকেছে। এখন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে এ ধরনের ব্যাপক রদবদল নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রয়োজন মনে করলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ও এসপি পরিবর্তন করতে পারে। কমিশন যদি মনে করে যে, নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ নন বা কোনোভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, তাহলে তারা তাদের পরিবর্তন করতে পারে। সে ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব হলো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। তাই তারা চাইলে নিজেদের মতো করে প্রশাসনিক কাঠামো সাজিয়ে নিতে পারেন।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ ইনকিলাবকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন দাঁড়াতে পারেনি। পুলিশের রদবদলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার এসপি রদবদল করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে তাদের মধ্যে কেউ জামায়াতপন্থি আবার কেউ বিএনপিপন্থি। এ অবস্থায় এ ধরনের লটারির গ্রহণযোগ্য বা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এখানে আরো অধিক সংখ্যক পেশাদার ও সৎ এসপির নাম অন্তর্ভুক্ত করে লটারি স্বচ্ছ করা সম্ভব ছিল। তখন কোনো অভিযোগ থাকতো না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক কমযোগ্য কর্মকর্তা বড় জেলায় বদলি হয়ে থাকলে তার পক্ষে নির্বাচনের সময় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে চলা কঠিন হবে। তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন মনে করলে তাদের পছন্দমতো রদবদল করতে পারেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন পরিচালনায় জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাই নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার, ভোটকেন্দ্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচনী কর্মী ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে থাকেন। ফলে ডিসি নিয়োগ বা বদলির পেছনে একদিকে প্রশাসনকে ‘নির্বাচনের উপযোগী’ করা। অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা থাকতে পারে। অনেকেই বলছেন, মাঠ প্রশাসনের ডিসি-এসপি নিয়োগ ও বদলি জামায়াতের সুপারিশের ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসনে জামায়াতে ইসলামী-অনুগত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। যদি রাজনৈতিক প্রভাবের আলোকে বিশেষ করে জামায়াতসহ কোনো গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতায় নিয়োগ হয়Ñ তাহলে তা নির্বাচন বিশ্বস্ততা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, লটারির মাধ্যমে বদলি করা কোন কর্মকর্তা কোন জেলায় যাবেন সেটা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রজ্ঞাপনের আগেই সব জানাজানি হয়ে যায় মঙ্গলবার। বড় এবং অধিক অপরাধপ্রবণ জেলায় দুর্বল ও অদক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এমনকি কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বড় জেলায় পোস্টিং পেতে মোটা অংকের টাকা খরচ করছেন সরকারের প্রভাবশালীর ব্যক্তির পেছনে। এতে করে এসপিদের বদলির ক্ষেত্রে আর স্বচ্ছতা থাকলো না।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বুধবার ইনকিলাবকে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলা পুলিশ সুপার ও ওসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতে ইসলামীপন্থি পুলিশ কর্মকর্তাদের অতিগুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এক সময় শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি অতিকৌশলে বিএনপিপন্থি বা ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এমন পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায় থেকে অন্যত্র কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে বদলি করছেন। লটারি একটি নাটক ছাড়া আর কিছুই নয় বলে এসব কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।

গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে ইসির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর চতুর্থ দিনের সংলাপে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লটারির মাধ্যমে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও ওসি বদলি করতে হবে। তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনের সব ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে আসে। প্রশাসনের রদবদল করে তারা। সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং আস্থা রাখার মতো একটা উপায় হলো যে, লটারির মাধ্যমে বদলি করে দেওয়াÑ যার যেখানে তকদির আছে সে চলে যাবে। এটাতে কোনো প্রশ্ন থাকে না। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন, তিন নির্বাচন কমিশনার ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইনকিলাবকে বলেন, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়নের নীতিমালায় লটারি নেই। প্রচলিত নিয়ম বা বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। বর্তমান সরকার এ ধরনের কাজ করছে কি কারণে তা জানা নেই।

প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষোভ-অসন্তোষ: লটারি পদ্ধতিতে পদায়ন নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ। বেশ কয়েকজন ইউএনও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লটারিতে যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিচার হয় না। এতে একই যোগ্য কর্মকর্তাকে খুব কঠিন কোনো উপজেলায় পাঠানো হতে পারে, আবার কেউ খুব সুবিধাজনক পোস্টিং পেয়ে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউএনও বলেন, তার পাঁচ বছরের এসিআর ৯০ শতাংশ। চাকরিতে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু লটারিতে কোথায় পড়বেন তিনি জানেন না। এটি ক্যাডারের পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে যায় না। সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, এসিআর শৃঙ্খলা-সততার ভিত্তিতে পদায়নই প্রশাসনের পেশাগত কাঠামো রক্ষা করে। লটারি পদ্ধতি প্রশাসনকে আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা নয়, ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এটি পেশাগত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।

লটারিতে ৬৪ জেলার এসপিকে একযোগে বদলি। ডিআইজি হলেন ৩৩ কর্মকর্তা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাছাড়া ৩৩ জন অতিরিক্ত ডিআইজি পদোন্নতি পেয়েছেন ডিআইজি হিসেবে। রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনারকে পুলিশ সদর দপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় লটারি করে এসপি চূড়ান্ত করা হয়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

মাঠ প্রশাসনে প্রভাব বাড়ছে জামায়াতের

আপডেট টাইম : ১০:৪৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫

মেধাবী-যোগ্যতার বদলে পাতানো লটারি নেপথ্যে প্রধান উপদেষ্টার আস্থাভাজন জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষোভ-অসন্তোষ : ইউএনও নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ লটারিতে ৬৪ জেলার এসপিকে একযোগে বদলি : ডিআইজি হলেন ৩৩ কর্মকর্তা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ প্রশাসনে জামায়াতের প্রতি আনুগত্য কর্মকর্তাদের লটারির নামে কৌশলে জেলা প্রশাসক, এসপি ও ইউএনও পদসহ নানা পদে বসানো হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগপ্রাপ্ত আস্থাভাজন জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা লটারি এবং যোগ্যতার নামে মাঠ প্রশাসনের জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের প্রাধান্য দিয়ে পদায়ন করছেন। নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা করা হবে আগামী ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে। গতকাল বুধবার লটারির নামে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) রদবদল করা হয়েছে।

পুলিশের এ রদবদলে ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৫টি জেলায় নিয়োগ পেয়েছেন জামায়াতপন্থি হিসেবে পুলিশের কর্মরত কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, শিক্ষাজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দেয়া হয়েছে কম গুরুত্বপূর্ণ তথা বি ও সি ক্যাটাগরির জেলায়। অনেককেই আবার জেলা থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে- ডিসি, এসপি ও ইউএনও নিয়োগে ছাত্রজীবনে জামায়াতের রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন কর্মকর্তাদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। লটারির মাধ্যমে সুকৌশলে জামায়াতপন্থি আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠ প্রশাসনে বসানো নিয়ে ইতোমধ্যেই বিতর্ক উঠতে শুরু করেছে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নির্বাচনে ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। মাঠ পর্যায়ের ওই সব গুরুত্বপূর্ণ পদ দলনিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বসানোর বদলে সুকৌশলে জামায়াতপন্থিদের বসানোর রহস্য কী? অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরা কী জামায়াতের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন?

বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ওসিদেরও লটারির মাধ্যমে নিয়োগ করা হবে। এর আগে দেশের ৫০টি জেলার ডিসি (জেলা প্রশাসক) পরিবর্তন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সেখানেও জামায়াতের প্রতি আনুগত্য কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের রদবদল নিয়ে দেশের সর্বমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলস্বরূপ সরকারের ঘোষিত সময় অনুযায়ী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ততই প্রশ্ন বাড়ছে। তবে ডিসি, এসপি, ইউএনও-এসিল্যান্ড-ওসি নিয়োগ ও পদায়ন এবং বদলিতে জনপ্রশাসন-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। যেখানে ডিসেম্বর মাসের প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেওয়া হবে তার আগে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন দেয়া ঠিক নয় বলে মনে করছেন প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।

কার্যত দুই ভিন্ন মুখের প্রশাসন? প্রথম দিকে সরকার বলছে লটারিই স্বচ্ছতার একমাত্র উপায়। অন্যদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন নীতিমালায় লটারি নেই। আবার রাজনৈতিক দলের সংলাপে লটারির দাবি উঠে এসেছে নতুন করে। প্রশ্ন উঠছে এই তিনটি অবস্থান কি পরস্পর পরিপূরক, নাকি মাঠ প্রশাসন নিয়ে সরকার নিজেই দ্বিধায়? স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি। সন্দেহমুক্ত প্রশাসন নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে সাহায্য করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি-পদায়নে লটারির মতো অপ্রচলিত ব্যবস্থাকে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উপায় বললেও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনকে ঘিরে সন্দেহ-সংশয় বাড়াচ্ছে বরং কমাচ্ছে না। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার ঠিক আগে মাঠ প্রশাসনে এ ধরনের রদবদলের সিদ্ধান্ত ‘সংবেদনশীল’ বলে দাবি তাদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব নয়, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতাই হতে হবে প্রধান মানদ-। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সে হিসেবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বাকি মাত্র কয়েক সপ্তাহ। কিন্তু এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন দফতরে, বিশেষ করে মাঠ প্রশাসনে বড় পরিসরে রদবদল শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) থেকে শুরু করে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত পরিবর্তন আসছে দ্রুতগতিতে। প্রশ্ন উঠছে, এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি, পরিষ্কার হয়নি নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার বিষয়টিও। তাহলে এই স্বল্প সময়ের জন্য মাঠ প্রশাসনে রদবদলের পেছনে সরকারের কী উদ্দেশ্য? এবং এর প্রভাবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কতটা কার্যকরভাবে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে- সে বিষয়েও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর পুরো প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে যায়। অর্থাৎ ডিসি, এসপি, ইউএনও, থানার ওসি এমনকি সরকারি দপ্তরের কর্মচারীরাও তখন ইসির নির্দেশে কাজ করেন। ভোটারদের নিরাপত্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমান সুযোগ দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ আচরণ নিশ্চিত করা ইসির অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু ইতঃপূর্বে অনুষ্ঠিত একাধিক জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার পরও প্রশাসনের রদবদল বা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক প্রভাব অব্যাহত থেকেছে। এখন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে এ ধরনের ব্যাপক রদবদল নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রয়োজন মনে করলে নির্বাচন কমিশন (ইসি) জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) ও এসপি পরিবর্তন করতে পারে। কমিশন যদি মনে করে যে, নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ নন বা কোনোভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, তাহলে তারা তাদের পরিবর্তন করতে পারে। সে ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব হলো একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করা। তাই তারা চাইলে নিজেদের মতো করে প্রশাসনিক কাঠামো সাজিয়ে নিতে পারেন।

সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ ইনকিলাবকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন দাঁড়াতে পারেনি। পুলিশের রদবদলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার এসপি রদবদল করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে তাদের মধ্যে কেউ জামায়াতপন্থি আবার কেউ বিএনপিপন্থি। এ অবস্থায় এ ধরনের লটারির গ্রহণযোগ্য বা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এখানে আরো অধিক সংখ্যক পেশাদার ও সৎ এসপির নাম অন্তর্ভুক্ত করে লটারি স্বচ্ছ করা সম্ভব ছিল। তখন কোনো অভিযোগ থাকতো না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক কমযোগ্য কর্মকর্তা বড় জেলায় বদলি হয়ে থাকলে তার পক্ষে নির্বাচনের সময় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে চলা কঠিন হবে। তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন মনে করলে তাদের পছন্দমতো রদবদল করতে পারেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন পরিচালনায় জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাই নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার, ভোটকেন্দ্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচনী কর্মী ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্বে থাকেন। ফলে ডিসি নিয়োগ বা বদলির পেছনে একদিকে প্রশাসনকে ‘নির্বাচনের উপযোগী’ করা। অন্যদিকে কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা থাকতে পারে। অনেকেই বলছেন, মাঠ প্রশাসনের ডিসি-এসপি নিয়োগ ও বদলি জামায়াতের সুপারিশের ভিত্তিতে দেয়া হয়েছে। মাঠ প্রশাসনে জামায়াতে ইসলামী-অনুগত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। যদি রাজনৈতিক প্রভাবের আলোকে বিশেষ করে জামায়াতসহ কোনো গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতায় নিয়োগ হয়Ñ তাহলে তা নির্বাচন বিশ্বস্ততা ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, লটারির মাধ্যমে বদলি করা কোন কর্মকর্তা কোন জেলায় যাবেন সেটা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রজ্ঞাপনের আগেই সব জানাজানি হয়ে যায় মঙ্গলবার। বড় এবং অধিক অপরাধপ্রবণ জেলায় দুর্বল ও অদক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। এমনকি কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বড় জেলায় পোস্টিং পেতে মোটা অংকের টাকা খরচ করছেন সরকারের প্রভাবশালীর ব্যক্তির পেছনে। এতে করে এসপিদের বদলির ক্ষেত্রে আর স্বচ্ছতা থাকলো না।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বুধবার ইনকিলাবকে বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলা পুলিশ সুপার ও ওসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতে ইসলামীপন্থি পুলিশ কর্মকর্তাদের অতিগুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দফতরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এক সময় শিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি অতিকৌশলে বিএনপিপন্থি বা ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এমন পুলিশ কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায় থেকে অন্যত্র কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে বদলি করছেন। লটারি একটি নাটক ছাড়া আর কিছুই নয় বলে এসব কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।

গত বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে ইসির সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর চতুর্থ দিনের সংলাপে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লটারির মাধ্যমে জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি) ও ওসি বদলি করতে হবে। তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসনের সব ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে আসে। প্রশাসনের রদবদল করে তারা। সবচেয়ে নিরপেক্ষ এবং আস্থা রাখার মতো একটা উপায় হলো যে, লটারির মাধ্যমে বদলি করে দেওয়াÑ যার যেখানে তকদির আছে সে চলে যাবে। এটাতে কোনো প্রশ্ন থাকে না। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন, তিন নির্বাচন কমিশনার ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসনের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইনকিলাবকে বলেন, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়নের নীতিমালায় লটারি নেই। প্রচলিত নিয়ম বা বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হতো। বর্তমান সরকার এ ধরনের কাজ করছে কি কারণে তা জানা নেই।

প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষোভ-অসন্তোষ: লটারি পদ্ধতিতে পদায়ন নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ। বেশ কয়েকজন ইউএনও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লটারিতে যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিচার হয় না। এতে একই যোগ্য কর্মকর্তাকে খুব কঠিন কোনো উপজেলায় পাঠানো হতে পারে, আবার কেউ খুব সুবিধাজনক পোস্টিং পেয়ে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউএনও বলেন, তার পাঁচ বছরের এসিআর ৯০ শতাংশ। চাকরিতে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু লটারিতে কোথায় পড়বেন তিনি জানেন না। এটি ক্যাডারের পেশাগত মর্যাদার সঙ্গে যায় না। সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, এসিআর শৃঙ্খলা-সততার ভিত্তিতে পদায়নই প্রশাসনের পেশাগত কাঠামো রক্ষা করে। লটারি পদ্ধতি প্রশাসনকে আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা নয়, ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। এটি পেশাগত উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।

লটারিতে ৬৪ জেলার এসপিকে একযোগে বদলি। ডিআইজি হলেন ৩৩ কর্মকর্তা: জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারকে বদলি করা হয়েছে। গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাছাড়া ৩৩ জন অতিরিক্ত ডিআইজি পদোন্নতি পেয়েছেন ডিআইজি হিসেবে। রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনারকে পুলিশ সদর দপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় লটারি করে এসপি চূড়ান্ত করা হয়।