ঢাকা ০৫:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
দৈনিক আজকের সারাদিনের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্মৃতি পদক পেলেন সাংবাদিক মনোয়ার হোসাইন রনি হামলা-দখল-চাঁদাবাজি থামবে কিভাবে: রাজনীতিতে ভিন্নতা থাকলেও অপরাধ মিলেমিশে আইটি ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি, শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘লগইন ইনটু ইন্ডাস্ট্রি নেক্সট’ টানা পাঁচদিনের ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অটোরিকশায় রক্তাক্ত মহাসড়ক গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জনগণের অধিকার সুরক্ষার তাগিদ তথ্য প্রতিমন্ত্রীর কবর দেওয়ার কত দিন পর একই কবরে দাফন করা যাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই: ডেপুটি স্পিকার ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ: প্রধানমন্ত্রী

নারীদের কেন ফাঁসি হয় না, দেশের ইতিহাস কী বলে

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:১১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৮১ বার
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক নারী অপরাধীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। তবে কোনো নারীকেই ঝুলতে হয়নি ফাঁসির দড়িতে। ফাঁসি থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনও করতে হয়নি। কিংবা কেউ আবেদন করেছেন, এমন দৃষ্টান্তও নেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী আসামির আবেদন সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে গেলেই দণ্ড কমে যাবজ্জীবন হয়ে যায়।  তখন জীবন কাটে ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্মিত কনডেম সেলে। সেলেই থাকতে হয় তাদের। সেখানেই মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয় তাদের। কারও কারও শাস্তি কমে খালাস পাওয়ারও নজির আছে দেশে।
জানা যায়, ২০০৭ সালে কাশিমপুরে দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু তাতে রাখা হয়নি ফাঁসির মঞ্চ। কারণ, এর আগে দেশে কোনো নারী আসামির ফাঁসির রেকর্ড নেই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নারীর ফাঁসি কার্যকরের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দেশের আলোচিত আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির গত বছরের আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলাদেশর ইতিহাসে একজন মাত্র নারীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমি কারা মহা অধিদফতরের কাছে আবেদন করেছি।’ এ সময় সেই তথ্য এখনও পাননি বলেও জানান তিনি।
তথ্যমতে, সবশেষ দেশের আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। বর্তমানে মিন্নির জীবন কাটছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে।
কনডম সেল কী
কারাগারে কনডম সেল বলতে আলাদা কোনো ঘর নেই। কিংবা বিশেষ জায়গা নেই। যেখানে ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়, সেটাই কনডম সেল—বললেন কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ।
তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফাঁসির জন্য নিয়ে যাওয়ার আগে যেখানে রাখা হয়, সেটাই কনডেম সেল। ফাঁসির আগে যদি একজন কয়েদিকে ফাইভস্টার হোটেলেও রাখা হয়, সেটাও তার জন্য কনডেম সেল।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবার জন্য তো আলাদা আলাদা রুম করা সম্ভব নয়। এত জায়গা পাব কোথায়? তবে যারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তারা কোনো সাধারণ কয়েদি নন। কেউ হত্যা, খুন বা মাদক অথবা বড় ধরনের কোনো অপরাধের দণ্ডিত হয়েছেন। তাই তাদের আলাদা রুমে রাখা হয়। তবে তারা নিয়ম অনুযায়ী কারাগারে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড যুক্ত হতে পারেন। পাশাপাশি পরিবারের লোকজনের সঙ্গেও দেখা করতে পারেন।’
দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামি ৯৪
সারাদেশে বর্তমানে ৯৪ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামি আছে বলে জানিয়েছেন মো. জান্নাত-উল ফরহাদ। তিনি গত ১২ নভেম্বর (বুধবার) সময়ের আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের কারাগারে মোট ৯৪জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। সেখানে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪জন নারী কয়েদি আছে।’
তিনি বলেন, ‘রায় হলেও মামলা কিন্তু তো শেষ হয় না। প্রথমে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় নিম্ন আদালত। আপিলের সুযোগ থাকে। সেখানে রায় পরিবর্তন না হলে, উচ্চ আদালতে যায়। আপিলে অনেক সময় সাজা কমে, আবার আসামির খালাসও হয়ে যায়। এখন প্রথমেই যদি আমরা ফাঁসি কার্যকর করে ফেলি, পরে যদি সেই আসামি বেকসুর খালাস পায়- তখন কী হবে? তাই হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ছাড়া ফাঁসি কার্যকর হয় না।’
কারাগারে তাদের জীবন যেমন
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার (সংস্থাপন শাখা) তানিয়া ফারজানা সময়ের আলোকে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির জন্য আলাদা ভবন রয়েছে মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানেই আলাদাভাবে তাদের রাখা হয়। বলতে পারেন, জেলের ভেতর, আরেকটি জেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো নারীর ফাঁসি হয় না। কখনও হয়নি। তাই মহিলা কারাগারে ফাঁসি মঞ্চ তৈরি করবে কেন?’
তানিয়া ফারজানা বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আসলে তেমন কোনো কাজ নেই। অবসর সময়ে তারা বই পড়ে, রুমে নামাজ-কালাম পড়ে। এর বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে হয় না তাদের।’
নেই আলাদা কনডম সেল
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, ‘আমাদের সিলেট কারাগারে মোট ১১ জন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি আছে। তাদের জন্য পৃথক রুম আছে। যেখানে একসঙ্গে ৪ থেকে ৬ জন কয়েদিকে একসঙ্গে রাখা হয়। কারাগারে পুরুষ আসামিদের জন্য কনডেম সেল আছে। তবে মহিলাদের জন্য আলাদা কোনো কনডেম সেল আমি কোনো কারাগারেই দেখেনি।’
কেউ কেউ খালাসও পান
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ সময়ের আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কারাগারে পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি আছে। রায় হওয়ার সাথে সাথে তো আর ফাঁসি হয় না। নিম্ন আদালত যদি কোনো কয়েদিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন, সে আসামিকে আমরা আলাদা সেলে রাখি। তাদের আবার আপিল করার সুযোগ থাকে। আপিলে রায় বহাল থাকলে ওই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডদের জন্য নির্ধারিত সেলেই রাখা হয়। যদি কারও সাজা কমে, তাহলে তাকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা হয়। আবার যদি কেউ মামলা থেকে রেহাই পায়, তবে তাকে খালাসও করে দেওয়া হয়।’
পাশের দেশ ভারতে নারীর ফাঁসি!
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। ভারতে কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের নজির নেই। ১৫০ বছর আগে দেশটির মথুরা কারাগারে নারীদের জন্য প্রথম ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো নারীর ফাঁসি দেওয়া হয়নি। তবে সেই রেকর্ড সম্ভবত ভাঙতে চলেছে ভারত। কারণ, পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যা করার অপরাধে শবনম নামের নারী এক ফাঁসির আসামিকে সেই মাথুরা কারাগারেই শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ভারতের স্বাধীনতার পর শবনমই হবেন দেশটির প্রথম মহিলা অপরাধী, যার ফাঁসি হবে।
জানা যায়, ২০০৮ সালে নিজেরই পরিবারের সাতজন সদস্যকে ঠান্ডা মাথায় গলার নলি কেটে খুন করেছিল শবনম। বাবা-মা, দুই ভাই, তাদের স্ত্রী, এমনকি ৯ মাসের ভাতিজাকেও ছাড়েনি সে। হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর শবনম ও সেলিমকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে এই দম্পতিকে বিচার আদালতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।
২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। তাদের ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন প্রত্যাখ্যান করেছিল। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তাদের পর্যালোচনা আবেদনের বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করে। ২০২১ সালে মথুরা জেলে ফাঁসির সব প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। তবে কিছু আইনি কারণে এখনও তার ফাঁসি কার্যকর হয়নি।
বিশ্বের অন্য দেশে কি নারীর ফাঁসি হয়
বিশ্বের অনেক দেশেই ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার নজির কম দেখা গেছে। আবার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রও রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার রেকর্ড আছে ইরানের। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। বলতে গেলে এ দেশটিতে ফাঁসি দেওয়ার উন্মাদনা চলছে। শুধু এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ইরানে ৩০ জন নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার আগের বছর মানে, ২০২৪ সালে দেশটিতে অন্তত ৩১ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানিয়ান মানবাধিকার সংগঠন আব্দর রহমান বোরোমান্ড সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রয়া বোরোমান্ড জানান, কাউকে খুনের জন্য ইরানে কোনো কারাদণ্ডের বিধান নেই। হয় আপনাকে ক্ষমা করা হবে অথবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
রয়া বোরোমান্ড বলেন, ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী ২২ বছরে কমপক্ষে ২৩৩ জন নারীর মৃত্যুদণ্ডের তথ্য পেয়েছি। তাদের মধ্যে ১০৬ জনকে খুনের দায়ে আর ৯৬ জন অবৈধ মাদকসংক্রান্ত অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর একটি ক্ষুদ্র অংশকে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কারণেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও জানান বোরোমান্ড।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

দৈনিক আজকের সারাদিনের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্মৃতি পদক পেলেন সাংবাদিক মনোয়ার হোসাইন রনি

নারীদের কেন ফাঁসি হয় না, দেশের ইতিহাস কী বলে

আপডেট টাইম : ১০:১১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর হয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক নারী অপরাধীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। তবে কোনো নারীকেই ঝুলতে হয়নি ফাঁসির দড়িতে। ফাঁসি থেকে বাঁচতে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনও করতে হয়নি। কিংবা কেউ আবেদন করেছেন, এমন দৃষ্টান্তও নেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী আসামির আবেদন সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে গেলেই দণ্ড কমে যাবজ্জীবন হয়ে যায়।  তখন জীবন কাটে ফাঁসির আসামিদের জন্য নির্মিত কনডেম সেলে। সেলেই থাকতে হয় তাদের। সেখানেই মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয় তাদের। কারও কারও শাস্তি কমে খালাস পাওয়ারও নজির আছে দেশে।
জানা যায়, ২০০৭ সালে কাশিমপুরে দেশের একমাত্র মহিলা কারাগার উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু তাতে রাখা হয়নি ফাঁসির মঞ্চ। কারণ, এর আগে দেশে কোনো নারী আসামির ফাঁসির রেকর্ড নেই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নারীর ফাঁসি কার্যকরের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দেশের আলোচিত আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির গত বছরের আগস্টে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলাদেশর ইতিহাসে একজন মাত্র নারীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য আমি কারা মহা অধিদফতরের কাছে আবেদন করেছি।’ এ সময় সেই তথ্য এখনও পাননি বলেও জানান তিনি।
তথ্যমতে, সবশেষ দেশের আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। বর্তমানে মিন্নির জীবন কাটছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে।
কনডম সেল কী
কারাগারে কনডম সেল বলতে আলাদা কোনো ঘর নেই। কিংবা বিশেষ জায়গা নেই। যেখানে ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়, সেটাই কনডম সেল—বললেন কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ।
তিনি বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে ফাঁসির জন্য নিয়ে যাওয়ার আগে যেখানে রাখা হয়, সেটাই কনডেম সেল। ফাঁসির আগে যদি একজন কয়েদিকে ফাইভস্টার হোটেলেও রাখা হয়, সেটাও তার জন্য কনডেম সেল।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবার জন্য তো আলাদা আলাদা রুম করা সম্ভব নয়। এত জায়গা পাব কোথায়? তবে যারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তারা কোনো সাধারণ কয়েদি নন। কেউ হত্যা, খুন বা মাদক অথবা বড় ধরনের কোনো অপরাধের দণ্ডিত হয়েছেন। তাই তাদের আলাদা রুমে রাখা হয়। তবে তারা নিয়ম অনুযায়ী কারাগারে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড যুক্ত হতে পারেন। পাশাপাশি পরিবারের লোকজনের সঙ্গেও দেখা করতে পারেন।’
দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামি ৯৪
সারাদেশে বর্তমানে ৯৪ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আসামি আছে বলে জানিয়েছেন মো. জান্নাত-উল ফরহাদ। তিনি গত ১২ নভেম্বর (বুধবার) সময়ের আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের কারাগারে মোট ৯৪জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন। সেখানে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪জন নারী কয়েদি আছে।’
তিনি বলেন, ‘রায় হলেও মামলা কিন্তু তো শেষ হয় না। প্রথমে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় নিম্ন আদালত। আপিলের সুযোগ থাকে। সেখানে রায় পরিবর্তন না হলে, উচ্চ আদালতে যায়। আপিলে অনেক সময় সাজা কমে, আবার আসামির খালাসও হয়ে যায়। এখন প্রথমেই যদি আমরা ফাঁসি কার্যকর করে ফেলি, পরে যদি সেই আসামি বেকসুর খালাস পায়- তখন কী হবে? তাই হাইকোর্টের অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) ছাড়া ফাঁসি কার্যকর হয় না।’
কারাগারে তাদের জীবন যেমন
কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার (সংস্থাপন শাখা) তানিয়া ফারজানা সময়ের আলোকে বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদির জন্য আলাদা ভবন রয়েছে মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানেই আলাদাভাবে তাদের রাখা হয়। বলতে পারেন, জেলের ভেতর, আরেকটি জেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো নারীর ফাঁসি হয় না। কখনও হয়নি। তাই মহিলা কারাগারে ফাঁসি মঞ্চ তৈরি করবে কেন?’
তানিয়া ফারজানা বলেন, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আসলে তেমন কোনো কাজ নেই। অবসর সময়ে তারা বই পড়ে, রুমে নামাজ-কালাম পড়ে। এর বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে হয় না তাদের।’
নেই আলাদা কনডম সেল
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, ‘আমাদের সিলেট কারাগারে মোট ১১ জন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি আছে। তাদের জন্য পৃথক রুম আছে। যেখানে একসঙ্গে ৪ থেকে ৬ জন কয়েদিকে একসঙ্গে রাখা হয়। কারাগারে পুরুষ আসামিদের জন্য কনডেম সেল আছে। তবে মহিলাদের জন্য আলাদা কোনো কনডেম সেল আমি কোনো কারাগারেই দেখেনি।’
কেউ কেউ খালাসও পান
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ সময়ের আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কারাগারে পাঁচজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী কয়েদি আছে। রায় হওয়ার সাথে সাথে তো আর ফাঁসি হয় না। নিম্ন আদালত যদি কোনো কয়েদিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন, সে আসামিকে আমরা আলাদা সেলে রাখি। তাদের আবার আপিল করার সুযোগ থাকে। আপিলে রায় বহাল থাকলে ওই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডদের জন্য নির্ধারিত সেলেই রাখা হয়। যদি কারও সাজা কমে, তাহলে তাকে সাধারণ কয়েদিদের সঙ্গে রাখা হয়। আবার যদি কেউ মামলা থেকে রেহাই পায়, তবে তাকে খালাসও করে দেওয়া হয়।’
পাশের দেশ ভারতে নারীর ফাঁসি!
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ভারত। ভারতে কোনো নারী আসামির ফাঁসি কার্যকরের নজির নেই। ১৫০ বছর আগে দেশটির মথুরা কারাগারে নারীদের জন্য প্রথম ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো নারীর ফাঁসি দেওয়া হয়নি। তবে সেই রেকর্ড সম্ভবত ভাঙতে চলেছে ভারত। কারণ, পরিবারের সাত সদস্যকে হত্যা করার অপরাধে শবনম নামের নারী এক ফাঁসির আসামিকে সেই মাথুরা কারাগারেই শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ভারতের স্বাধীনতার পর শবনমই হবেন দেশটির প্রথম মহিলা অপরাধী, যার ফাঁসি হবে।
জানা যায়, ২০০৮ সালে নিজেরই পরিবারের সাতজন সদস্যকে ঠান্ডা মাথায় গলার নলি কেটে খুন করেছিল শবনম। বাবা-মা, দুই ভাই, তাদের স্ত্রী, এমনকি ৯ মাসের ভাতিজাকেও ছাড়েনি সে। হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর শবনম ও সেলিমকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে এই দম্পতিকে বিচার আদালতে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল।
২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টও মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। তাদের ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবন প্রত্যাখ্যান করেছিল। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তাদের পর্যালোচনা আবেদনের বিষয়টিও প্রত্যাখ্যান করে। ২০২১ সালে মথুরা জেলে ফাঁসির সব প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। তবে কিছু আইনি কারণে এখনও তার ফাঁসি কার্যকর হয়নি।
বিশ্বের অন্য দেশে কি নারীর ফাঁসি হয়
বিশ্বের অনেক দেশেই ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার নজির কম দেখা গেছে। আবার সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রও রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার রেকর্ড আছে ইরানের। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। বলতে গেলে এ দেশটিতে ফাঁসি দেওয়ার উন্মাদনা চলছে। শুধু এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ইরানে ৩০ জন নারী আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার আগের বছর মানে, ২০২৪ সালে দেশটিতে অন্তত ৩১ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইরানিয়ান মানবাধিকার সংগঠন আব্দর রহমান বোরোমান্ড সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক রয়া বোরোমান্ড জানান, কাউকে খুনের জন্য ইরানে কোনো কারাদণ্ডের বিধান নেই। হয় আপনাকে ক্ষমা করা হবে অথবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
রয়া বোরোমান্ড বলেন, ২০০০ সাল থেকে পরবর্তী ২২ বছরে কমপক্ষে ২৩৩ জন নারীর মৃত্যুদণ্ডের তথ্য পেয়েছি। তাদের মধ্যে ১০৬ জনকে খুনের দায়ে আর ৯৬ জন অবৈধ মাদকসংক্রান্ত অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর একটি ক্ষুদ্র অংশকে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কারণেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও জানান বোরোমান্ড।