ঢাকা ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬, ৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নীরব সাধক আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোত্তানী

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৬:৩১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
  • ৬০ বার

বাংলার মাটি বহু গুণী সন্তানের পদচিহ্নে ধন্য। যারা এসেছিলেন দূর দেশ থেকে, কিন্তু এখানকার মানুষ ও মাটির সঙ্গে মিশে গেছেন নিজেদের সবটুকু জ্ঞান, হৃদয় ও ভালোবাসা বিলিয়ে।

তেমনি এক মহীয়ান আত্মা ছিলেন আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী (রহ.) একজন হাদিসবিশারদ, একজন শিক্ষক, এবং সর্বোপরি একজন সন্ন্যাসী আত্মার অধিকারী আলেম, যার আলো এখনো বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাঙ্গনে দীপ্ত।

রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান প্রদেশের আকাশের নিচে তার জন্ম। পরবর্তীতে যাযাবরপথ ধরে তিনি ভারতবর্ষে, আর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন। হিজরতের এই পথ তার জীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে যেখানে দুনিয়ার সব সীমান্ত মুছে যায়, কেবল জ্ঞান, বিশ্বাস ও মানবসেবার সীমাহীন সীমানা উন্মুক্ত থাকে।

ছোটবেলা থেকেই তার মন ছিল জ্ঞানের প্রতি নিবিষ্ট। শাস্ত্রপাঠে তিনি ছিলেন অগাধ। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাসাউফ সব শাখাতেই তার ছিল গভীর দখল। তবে যেটি তাকে আলাদা করে তুলেছিল, তা হলো হাদিস বিজ্ঞানের প্রতি তার অগাধ মমতা ও নিরলস অধ্যয়ন।

তিনি বলতেন, “হাদিস হলো ইসলামের হৃদস্পন্দন, এর আলোয় না ভিজলে জ্ঞানের শরীর কখনো সম্পূর্ণ হয় না।”

বাংলাদেশে এসে তিনি দীর্ঘকাল ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। হাদিস পড়ানোর তার পদ্ধতি ছিল অনন্য। ছাত্ররা বলেন, তার একবারের দরস মানে যেন এক জীবনের স্মৃতি। তিনি এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে, জ্ঞান যেন মুখস্থ নয় মনের গভীরে খোদাই হয়ে যায়। তার মুখের কোমল উচ্চারণে ‘ইলম’ যেন হৃদয়ে ফুল হয়ে ফুটত।

সাধারণ জীবনযাপন ছিল তার নিত্যসঙ্গী। বিলাসিতা তার কাছে ছিল নিরর্থক এক শব্দ। তিনি ছিলেন দীননিষ্ঠ, বিনয়ী, এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতাশীল। দরিদ্র ছাত্রদের জন্য নিজের সামান্য ভাতা থেকেও অংশ কেটে দিতেন। তার নীরব উপস্থিতিতেই অনেকের জীবনে শুরু হতো পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়।

১৯৮৬ সালের ২৯ অক্টোবর, বাংলার বাতাসে বিষণ্নতা নেমে আসে সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার প্রস্থান কোনো শূন্যতা নয়, বরং রেখে যান এমন এক আলোকরেখা, যা আজও হাজারো ছাত্র, শিক্ষক ও অনুসারীর জীবনে দীপ্ত হয়ে জ্বলছে।

প্রতিবছর তার মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার স্মরণে আয়োজিত হয় দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। ছারছীনা, দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া, মাদারীপুর ও ঢাকা অঞ্চলে এখনো তার ছাত্ররা গর্বভরে বলেন “আমরা নিয়াজ খোতানীর দরসে বসেছিলাম।”

তার জীবন আমাদের শেখায়, জ্ঞান কেবল মুখস্থের বিষয় নয়, এটি আত্মার প্রশান্তি, চরিত্রের স্থিতি, আর সমাজের উন্নতির প্রেরণা। তিনি বিশ্বাস করতেন “যে ইলম মানুষকে বিনয় শেখায় না, সে ইলম নয়, সেটি কেবল অহংকারের পোশাক।”

নিয়াজ মাখদুম খোতানী রহ.-এর স্মৃতিতে আজ আমরা ফিরে দেখি এক আলোকিত মানুষকে, যিনি নিজে নিভে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন আলোর শিখা। তার জীবন আমাদের শেখায়, শিক্ষা মানে শুধু পাঠ নয় এটি হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা, মনের বিনম্রতা, আর মানুষকে মানুষ করার সংগ্রাম।

আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন তার কবরে নূর দান করেন, তার ইলমের ফসল যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মে ফলবতী হয়। এই মাটিতে, এই মানুষে, এই চেতনায় আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী রহ. চিরজীবী থাকবেন তার জ্ঞানের আলোয়, তার বিনয়ের সুবাসে, আর তার রেখে যাওয়া অমলিন ভালোবাসায়।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

নীরব সাধক আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোত্তানী

আপডেট টাইম : ০৬:৩১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

বাংলার মাটি বহু গুণী সন্তানের পদচিহ্নে ধন্য। যারা এসেছিলেন দূর দেশ থেকে, কিন্তু এখানকার মানুষ ও মাটির সঙ্গে মিশে গেছেন নিজেদের সবটুকু জ্ঞান, হৃদয় ও ভালোবাসা বিলিয়ে।

তেমনি এক মহীয়ান আত্মা ছিলেন আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী (রহ.) একজন হাদিসবিশারদ, একজন শিক্ষক, এবং সর্বোপরি একজন সন্ন্যাসী আত্মার অধিকারী আলেম, যার আলো এখনো বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষাঙ্গনে দীপ্ত।

রুশীয় তুর্কিস্থানের খোতান প্রদেশের আকাশের নিচে তার জন্ম। পরবর্তীতে যাযাবরপথ ধরে তিনি ভারতবর্ষে, আর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন। হিজরতের এই পথ তার জীবনের প্রতীক হয়ে ওঠে যেখানে দুনিয়ার সব সীমান্ত মুছে যায়, কেবল জ্ঞান, বিশ্বাস ও মানবসেবার সীমাহীন সীমানা উন্মুক্ত থাকে।

ছোটবেলা থেকেই তার মন ছিল জ্ঞানের প্রতি নিবিষ্ট। শাস্ত্রপাঠে তিনি ছিলেন অগাধ। কুরআন, হাদিস, ফিকহ, তাসাউফ সব শাখাতেই তার ছিল গভীর দখল। তবে যেটি তাকে আলাদা করে তুলেছিল, তা হলো হাদিস বিজ্ঞানের প্রতি তার অগাধ মমতা ও নিরলস অধ্যয়ন।

তিনি বলতেন, “হাদিস হলো ইসলামের হৃদস্পন্দন, এর আলোয় না ভিজলে জ্ঞানের শরীর কখনো সম্পূর্ণ হয় না।”

বাংলাদেশে এসে তিনি দীর্ঘকাল ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। হাদিস পড়ানোর তার পদ্ধতি ছিল অনন্য। ছাত্ররা বলেন, তার একবারের দরস মানে যেন এক জীবনের স্মৃতি। তিনি এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে, জ্ঞান যেন মুখস্থ নয় মনের গভীরে খোদাই হয়ে যায়। তার মুখের কোমল উচ্চারণে ‘ইলম’ যেন হৃদয়ে ফুল হয়ে ফুটত।

সাধারণ জীবনযাপন ছিল তার নিত্যসঙ্গী। বিলাসিতা তার কাছে ছিল নিরর্থক এক শব্দ। তিনি ছিলেন দীননিষ্ঠ, বিনয়ী, এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতাশীল। দরিদ্র ছাত্রদের জন্য নিজের সামান্য ভাতা থেকেও অংশ কেটে দিতেন। তার নীরব উপস্থিতিতেই অনেকের জীবনে শুরু হতো পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়।

১৯৮৬ সালের ২৯ অক্টোবর, বাংলার বাতাসে বিষণ্নতা নেমে আসে সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার প্রস্থান কোনো শূন্যতা নয়, বরং রেখে যান এমন এক আলোকরেখা, যা আজও হাজারো ছাত্র, শিক্ষক ও অনুসারীর জীবনে দীপ্ত হয়ে জ্বলছে।

প্রতিবছর তার মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার স্মরণে আয়োজিত হয় দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভা। ছারছীনা, দারুন্নাজাত সিদ্দিকিয়া, মাদারীপুর ও ঢাকা অঞ্চলে এখনো তার ছাত্ররা গর্বভরে বলেন “আমরা নিয়াজ খোতানীর দরসে বসেছিলাম।”

তার জীবন আমাদের শেখায়, জ্ঞান কেবল মুখস্থের বিষয় নয়, এটি আত্মার প্রশান্তি, চরিত্রের স্থিতি, আর সমাজের উন্নতির প্রেরণা। তিনি বিশ্বাস করতেন “যে ইলম মানুষকে বিনয় শেখায় না, সে ইলম নয়, সেটি কেবল অহংকারের পোশাক।”

নিয়াজ মাখদুম খোতানী রহ.-এর স্মৃতিতে আজ আমরা ফিরে দেখি এক আলোকিত মানুষকে, যিনি নিজে নিভে গেছেন কিন্তু রেখে গেছেন আলোর শিখা। তার জীবন আমাদের শেখায়, শিক্ষা মানে শুধু পাঠ নয় এটি হৃদয়ের পরিচ্ছন্নতা, মনের বিনম্রতা, আর মানুষকে মানুষ করার সংগ্রাম।

আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন তার কবরে নূর দান করেন, তার ইলমের ফসল যেন প্রজন্মের পর প্রজন্মে ফলবতী হয়। এই মাটিতে, এই মানুষে, এই চেতনায় আল্লামা নিয়াজ মাখদুম খোতানী রহ. চিরজীবী থাকবেন তার জ্ঞানের আলোয়, তার বিনয়ের সুবাসে, আর তার রেখে যাওয়া অমলিন ভালোবাসায়।