ঢাকা ০৬:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৫ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জুলাই সনদে স্বাক্ষর করাতে তৎপর ঐকমত্য কমিশন

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১০:৪৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • ৫৮ বার

জুলাই জাতীয় সনদ সংলাপে অংশ নেওয়া সব দলকে স্বাক্ষর করানোর তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে সনদে স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে সাত দফা দাবি তুলেছে চারটি বামধারার দল। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, সনদের আইনি ভিত্তিসহ তিন দফা মানলে স্বাক্ষর করবে তারা।

যেসব রাজনৈতিক দল ও জোট ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ সংলাপে অংশ নিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ২৪টি দল গত শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। গণফোরাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও স্বাক্ষর করেনি। পরে দাবি বাস্তবায়িত হওয়ায় রবিবার সনদে স্বাক্ষর করে দলটি। এনসিপি ঐকমত্যের সংলাপে অংশ নিলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি ‘স্পষ্ট’ না হওয়ায় স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করে। এ ছাড়া ইতিহাস ‘সঠিকভাবে না আসা’ এবং সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন নিয়ে আপত্তির কারণে বামধারার চারটি দল সনদে স্বাক্ষর করেনি। তাদের স্বাক্ষরের জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তিসহ তিন দফা দাবি আদায়ে চলতি সপ্তাহেই রাজধানীতে নানা কর্মসূচি পালন করবে এনসিপি। এর মধ্যে একাধিক সমন্বয়সভা ও ঢাকায় বড় সমাবেশ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। উদ্দেশ্য সরকারকে চাপে রেখে আইনি স্বীকৃতিসহ নিজেদের দাবি আদায় করা। তবে শর্ত পূরণ হলে কমিশনের মেয়াদের মধ্যেই সনদে সই করতে চায় দলটি।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানান, কমিশন আমাদের কথা রাখেনি, তাই সেদিন আমরা সই করিনি। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। হয়তো অচিরেই আবারও দলের প্রতিনিধিদের ডাকবে। তিনটি শর্ত পূরণ হলে আমরা অবশ্যই স্বাক্ষর করব।

এ দিকে ৭ দফা দাবি জানিয়ে গতকাল ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, যেসব বিষয়ে সবার ঐকমত্য রয়েছে, কেবল সেসব বিষয়েই সবার সই নেওয়া যেতে পারে। ভিন্নমতগুলো অতিরিক্ত (এনেক্স) প্রতিবেদন হিসেবে সনদে সংযুক্ত থাকতে পারে। সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। শেষ অংশে অঙ্গীকারনামার ১নং দফায় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কীভাবে সম্ভব তা বোধগম্য নয়। অঙ্গীকারনামার ২নং-এ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে বা যথোপযুক্ত স্থানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আমরাও জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টসহ কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। অঙ্গীকারনামার ৩নং-এ বলা হয়েছেÑ জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না, এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এ ছাড়া সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ক্রান্তিকালীন বিধানে ৬ষ্ঠ তফসিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণা ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্ট এবং ৭ম তফসিলে থাকা প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্টে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি। অথচ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে এবং পটভূমিতে অভ্যুত্থানপরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা খসড়া সনদে উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে বাদ দেওয়া হয়েছে- আমরা এটা ইতিহাসের অসত্য ভাষণ বলে মনে করি।

চারটি বামদলের নেতারা উল্লেখ করেছেন, এই বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমাদের পক্ষে জুলাই সনদে সই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সংবিধানে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এবং ১৫০(২) অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন বিধানের তফসিল পরিবর্তনে সম্মতি প্রদান ও আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করতে হয়, ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা অনুল্লেখ থাকা এমন কোনো সনদে ভিন্নমত দিয়ে আমরা সই করতে পারি না। জুলাই সনদে বিধৃত যেসব বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি, সেগুলো বাস্তবায়িত করতে আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু আমাদের কনসার্নের বিষয়গুলো যুক্ত করে এই সনদ পরিবর্তন না হলে আমরা সই করতে পারব না।

জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠক

এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদের এলডি হলে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে জুলাই যোদ্ধারা কমিশনকে অবহিত করেন যে, তাদের অনেকেই স্বাস্থ্য কার্ড থাকা সত্ত্বেও গত কোরবানি ঈদের পর থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা এ অবস্থাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। এ সময় তারা আহত জুলাই যোদ্ধাদের সর্বাবস্থায় চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পক্ষ থেকে একটি লিখিত নির্দেশনা দেশের সব হাসপাতালে পাঠানোর দাবির বিষয়ে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ ছাড়া জুলাই পরিবারের সদস্যদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জোর দেন। প্রত্যেক জুলাই যোদ্ধাকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র প্রদানের বিষয়েও তারা গুরুত্বারোপ করেন। সভায় জুলাই যোদ্ধারা ১৭ অক্টোবরের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং জানান, ঘটনাটি তাদের জন্য সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত ছিল। তারা বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তারা কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা ঘটাতে যাননি; বরং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরার জন্যই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই সময় কিছু বহিরাগত ব্যক্তি সেখানে অনুপ্রবেশ করে মারামারি ও ভাঙচুরে জড়িত হন, যাদের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ জনের পরিচয় তারা চিহ্নিত করেছেন। জুলাই যোদ্ধারা ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি সেদিন দায়েরকৃত ৪টি মামলা প্রত্যাহারে কমিশনের সহায়তা কামনা করেন।

কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই যোদ্ধাদের সব দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং তাদের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সহায়তা করবে। বৈঠকে জুলাই যোদ্ধাদের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দলের হয়ে উপস্থিত ছিলেন মো. সোহাগ মাহমুদ, কামরুল হাসান, মো. আল-আমিন, মুস্তাঈন বিল্লাহ হাবিবী, হাসিবুল হাসান জিসান, মারুফা মায়া, আহাদুল ইসলাম, মাজেদুল হক শান্ত, মো. সাগর উদ্দিন, মো. দুলাল খান, মো. নাহিদুজ্জামান, ইমরান খান, নুসরাত জাহান।

বৈঠকে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জুলাই সনদে স্বাক্ষর করাতে তৎপর ঐকমত্য কমিশন

আপডেট টাইম : ১০:৪৬:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

জুলাই জাতীয় সনদ সংলাপে অংশ নেওয়া সব দলকে স্বাক্ষর করানোর তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তবে সনদে স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে সাত দফা দাবি তুলেছে চারটি বামধারার দল। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, সনদের আইনি ভিত্তিসহ তিন দফা মানলে স্বাক্ষর করবে তারা।

যেসব রাজনৈতিক দল ও জোট ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ সংলাপে অংশ নিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ২৪টি দল গত শুক্রবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। গণফোরাম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও স্বাক্ষর করেনি। পরে দাবি বাস্তবায়িত হওয়ায় রবিবার সনদে স্বাক্ষর করে দলটি। এনসিপি ঐকমত্যের সংলাপে অংশ নিলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি ‘স্পষ্ট’ না হওয়ায় স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বর্জন করে। এ ছাড়া ইতিহাস ‘সঠিকভাবে না আসা’ এবং সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন নিয়ে আপত্তির কারণে বামধারার চারটি দল সনদে স্বাক্ষর করেনি। তাদের স্বাক্ষরের জন্য কমিশনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

জুলাই জাতীয় সনদের আইনি ভিত্তিসহ তিন দফা দাবি আদায়ে চলতি সপ্তাহেই রাজধানীতে নানা কর্মসূচি পালন করবে এনসিপি। এর মধ্যে একাধিক সমন্বয়সভা ও ঢাকায় বড় সমাবেশ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। উদ্দেশ্য সরকারকে চাপে রেখে আইনি স্বীকৃতিসহ নিজেদের দাবি আদায় করা। তবে শর্ত পূরণ হলে কমিশনের মেয়াদের মধ্যেই সনদে সই করতে চায় দলটি।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার জানান, কমিশন আমাদের কথা রাখেনি, তাই সেদিন আমরা সই করিনি। তবে কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে। হয়তো অচিরেই আবারও দলের প্রতিনিধিদের ডাকবে। তিনটি শর্ত পূরণ হলে আমরা অবশ্যই স্বাক্ষর করব।

এ দিকে ৭ দফা দাবি জানিয়ে গতকাল ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদ (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান।

স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, যেসব বিষয়ে সবার ঐকমত্য রয়েছে, কেবল সেসব বিষয়েই সবার সই নেওয়া যেতে পারে। ভিন্নমতগুলো অতিরিক্ত (এনেক্স) প্রতিবেদন হিসেবে সনদে সংযুক্ত থাকতে পারে। সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। শেষ অংশে অঙ্গীকারনামার ১নং দফায় জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কীভাবে সম্ভব তা বোধগম্য নয়। অঙ্গীকারনামার ২নং-এ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে বা যথোপযুক্ত স্থানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। আমরাও জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টসহ কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। অঙ্গীকারনামার ৩নং-এ বলা হয়েছেÑ জুলাই সনদ নিয়ে কেউ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে না, এটি নাগরিকের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এ ছাড়া সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ক্রান্তিকালীন বিধানে ৬ষ্ঠ তফসিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণা ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্ট এবং ৭ম তফসিলে থাকা প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্টে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, যা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি। অথচ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে এবং পটভূমিতে অভ্যুত্থানপরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্টের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা খসড়া সনদে উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে বাদ দেওয়া হয়েছে- আমরা এটা ইতিহাসের অসত্য ভাষণ বলে মনে করি।

চারটি বামদলের নেতারা উল্লেখ করেছেন, এই বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় আমাদের পক্ষে জুলাই সনদে সই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে সংবিধানে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এবং ১৫০(২) অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন বিধানের তফসিল পরিবর্তনে সম্মতি প্রদান ও আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করতে হয়, ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা অনুল্লেখ থাকা এমন কোনো সনদে ভিন্নমত দিয়ে আমরা সই করতে পারি না। জুলাই সনদে বিধৃত যেসব বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছি, সেগুলো বাস্তবায়িত করতে আমরা জাতির কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু আমাদের কনসার্নের বিষয়গুলো যুক্ত করে এই সনদ পরিবর্তন না হলে আমরা সই করতে পারব না।

জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠক

এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদের এলডি হলে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে জুলাই যোদ্ধারা কমিশনকে অবহিত করেন যে, তাদের অনেকেই স্বাস্থ্য কার্ড থাকা সত্ত্বেও গত কোরবানি ঈদের পর থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা এ অবস্থাকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। এ সময় তারা আহত জুলাই যোদ্ধাদের সর্বাবস্থায় চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার পক্ষ থেকে একটি লিখিত নির্দেশনা দেশের সব হাসপাতালে পাঠানোর দাবির বিষয়ে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ ছাড়া জুলাই পরিবারের সদস্যদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে জোর দেন। প্রত্যেক জুলাই যোদ্ধাকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র প্রদানের বিষয়েও তারা গুরুত্বারোপ করেন। সভায় জুলাই যোদ্ধারা ১৭ অক্টোবরের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন এবং জানান, ঘটনাটি তাদের জন্য সম্পূর্ণ অনাকাক্সিক্ষত ছিল। তারা বলেন, জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তারা কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতা ঘটাতে যাননি; বরং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো তুলে ধরার জন্যই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই সময় কিছু বহিরাগত ব্যক্তি সেখানে অনুপ্রবেশ করে মারামারি ও ভাঙচুরে জড়িত হন, যাদের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ জনের পরিচয় তারা চিহ্নিত করেছেন। জুলাই যোদ্ধারা ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি সেদিন দায়েরকৃত ৪টি মামলা প্রত্যাহারে কমিশনের সহায়তা কামনা করেন।

কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই যোদ্ধাদের সব দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে এবং তাদের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সহায়তা করবে। বৈঠকে জুলাই যোদ্ধাদের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দলের হয়ে উপস্থিত ছিলেন মো. সোহাগ মাহমুদ, কামরুল হাসান, মো. আল-আমিন, মুস্তাঈন বিল্লাহ হাবিবী, হাসিবুল হাসান জিসান, মারুফা মায়া, আহাদুল ইসলাম, মাজেদুল হক শান্ত, মো. সাগর উদ্দিন, মো. দুলাল খান, মো. নাহিদুজ্জামান, ইমরান খান, নুসরাত জাহান।

বৈঠকে কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজসহ সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া এবং জাতীয় ঐকমত্য গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।