প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপন করা পাহাড়ের মানুষ যুগ যুগ ধরে জুম চাষের সঙ্গে যুক্ত। আদিকাল থেকেই পাহাড়ের ঢালে সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করে আসছে পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দারা। প্রাচীন এই কৃষি পদ্ধতির নাম জুম। সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে এখন শোভা পাচ্ছে রঙিন সোনালি আভা। দূর পাহাড়ে চোখ মেললেই সোনালি রঙে ঝলমল করা পাকা ধানের ক্ষেত দেখা যায়। পাহাড়ের পাদদেশ আর ঢালু জমিতে জুমের পাকা ধান কাটার ধুম পড়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, এ বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় ধান বপন করা সম্ভব হয়েছে যথাসময়ে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ।
এ প্রসঙ্গে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ এমএম শাহনেওয়াজ বলেন, চলতি মৌসুমে জুম চাষের জন্য আবহাওয়া ছিল একেবারেই অনুকূলে। এপ্রিল-মে মাসে সময়মতো বৃষ্টিপাত এবং পরবর্তীতে পর্যাপ্ত রোদ মেলার কারণে এবার জুমের ফলন ভালো হয়েছে। তবে গত বছর বৃষ্টি বিলম্বে আসায় কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়া যায়নি। এবার সময়মতো বৃষ্টি পাওয়ায় জুমের ফসল আশানুরূপ হবে বলে আমরা আশা করছি। জুম চাষের সঙ্গে জড়িতদের স্থানীয়ভাবে বলা হয় জুমিয়া। কথা হয় তাদের সঙ্গে। এ সময় তারা জানান, সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে জুম চাষিরা পাহাড় ঘুরে নির্দিষ্ট জমি নির্বাচন করেন। মার্চ মাসে জঙ্গল পোড়ানো হয়। এপ্রিলের দিকে বীজ বপনের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে শুরু হয় পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার পালা। জুমের জমিতে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা, মরিচ, টক পাতা, চিনালসহ বিভিন্ন সাথি ফসলও আবাদ করা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, বান্দরবান সদর থেকে রোয়াংছড়ি যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে সারি সারি জুম ক্ষেতে ধান কাটার উৎসব শুরু হয়েছে। জুমের পাকা ধান ঘরে তুলতে জুমিয়ারা কেউ সপরিবারে, আবার কেউ কয়েকজন শ্রমিক সঙ্গে নিয়ে ভোর থেকেই দল বেঁধে পাহাড়ে ধান কাটায় নেমে পড়েন। সারা দিন ব্যস্ত সময় পার করেন তারা। মাথায় থাকে থুরুং (বেতের তৈরি ঝুড়ি) আর হাতে কাঁচি বা দা। প্রতিটি পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যায় অস্থায়ী জুমঘর যেখানে বিশ্রামের পাশাপাশি কাটা ধানসহ পাহাড়ে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল সংরক্ষণ করা হয়। বছরের এই সময়ে বান্দরবানের পাহাড়ি পথে পথে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। জুমচাষি মংক্যপ্রু মারমা বলেন, এবার সময়মতো বৃষ্টি হয়েছে। যখন বৃষ্টি দরকার ছিল, তখন বৃষ্টি হয়েছে, আবার রোদের সময় রোদ মিলেছে। তাই ফলন ভালো হবে বলে আশা করছি। আরেক চাষি উখ্যাইচিং মারমা জানান, তিনি প্রায় ২০ বিঘা জমিতে জুম চাষ করেছেন। তার হিসাবে প্রতি দুই বিঘায় ১২০ আড়ি ( ১ আড়ি = ১৮ সের) ধান পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ভালো। তাই একসঙ্গে দলবেঁধে খুশি মনে ধান কাটছি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে জুম আবাদ হয় ৮ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন হয় ১৩ হাজার ৪৬৭ টন। ২০২২ সালে আবাদ হয় ৮ হাজার ২৯২ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন হয় ১১ হাজার ৪১৮ টন। ২০২৩ সালে আবাদ হয় ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন হয় ১০ হাজার ৪৮৯ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবাদ হয় ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে, উৎপাদন হয় ১২ হাজার ৪৯৯ টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৩৬৬ টন।
Reporter Name 

























