ঢাকা ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম

এনসিটিবিতে গোপন বৈঠকে সিদ্দিক জোবায়ের সিন্ডিকেট

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:৩২:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫
  • ১২৪ বার

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) সদ্য প্রত্যাহার হওয়া শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জোবায়ের সিন্ডিকেটের গত বুধবারবার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন । অফিসের পর বিকেল পাঁচটায় তিন ঘন্টার এই বৈঠকে শেষ সময়ে উপস্থিত হন সিদ্দিক জোবায়ের। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক উইংয়ের সদস্য অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরীর কক্ষে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে এনসিটিবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রবিউল কবির চৌধুরী ও প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর সম্রাট ও বিতরণ নিয়ন্ত্রক মো. হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন এই বৈঠকে অংশ নেন।

নোটগাইড কোম্পানীর বহু বছরের পছন্দের শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সম্পাদনা শাখায় পদায়ন দেওয়ার রেওয়াজ ২০ বছর ধরে চলে আসছে। এবারও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। আর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থার প্রতিবেদনে সিদ্দিক জোবায়ের-এর বিরুদ্ধে পুস্তক প্রকাশক ও কাগজ বিক্রেতাদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসছে । এই পর্যন্ত কোনো অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি সিদ্দিক জোবায়ের।

গত বুধবার বিকেলে মতিঝিলের এনসিটিবি কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন  সূত্রে  এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে, এনসিটিবির বর্তমান সচিব ওই বৈঠক সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান তিনি । তিনি একাধিকবার বলেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল কবীর চৌধুরীর দক্ষতায় তিনি মুগ্ধ। রবিউলের সঙ্গে কেবিনেট বিভাগের ভালো যোগাযোগ আছে ।

জানা গেছে, এই বৈঠকের অন্যতম পরিকল্পনাকারী এনসিটিবি থেকে গত সেপ্টেম্বরে বদলি করা বিতর্কিত সচিব নাজমা আখতার। তাকে টাঙ্গাইলে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যান না ।

রবিউল কবীর চৌধুরী গত ১৫ বছর ধরে পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের প্রধান পদে ছিলেন। সাবেক আওয়ামী লীগ মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী তাকে গত বছরের ৪ জুলাই এনসিটিবিতে বদলি করে নিয়ে আসেন। তখনকার সরকারের ঘনিষ্ঠজন রিয়াদ চৌধুরী আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও দীপু মনির ভাইকে ম্যানেজ করে মাদ্রাসা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন গত কয়েকবছর। এনসিটিবি থেকে জানা যায় জুলাই অভুত্থানের পর তিনি বিএনপির একজন নেতার সুপারিশে আসেন বলে চাউর রয়েছে শিক্ষা প্রশাসনে। ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রত্যাহার করা সচিব অনির্ধারিত বৈঠক করায় দুর্নীতির অভিযোগ আরো জোরালো হলো বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

সিদ্দিক জোবায়ের সচিব হয়েও এনসিটিবিতে নিয়মিত অফিস করতেন। ফলে কাগজ ও মুদ্রণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র ছিলো তার এবং তাদের কাছ থেকে সরাসরি সুবিধা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোন দিন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মতামত দিতে রাজী হয়নি ।

এনসিটিবির বর্তমান সচিব সাহতাব উদ্দিনের দাবি তিনি গোপন বৈঠকে তিনি ছিলেন না।

অপরদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় বুধবার বিকেলে । বিতারিত শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জোবায়েরের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বই ছাপার কাগজ কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্য, শিক্ষাবোর্ড ও সরকারি কলেজে পদায়নে বাণিজ্য, ডিডি ও জেলা শিক্ষা অফিসার পদায়ন এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোয় কেনাকাটা এবং বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়মসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শুধু পরীক্ষা স্থগিতের ইস্যুতে নয়, গত ১০ মাসের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল সরকার। গত বছরের বই ছাপার জন্য কাগজ কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই সচিব। আওয়ামী আমলে লুটপাট করা এনসিটিবি সচিব নাজমা আখতারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সিদ্দিক জোবায়ের-এর হস্তক্ষেপে বন্ধ করা হয়েছে বলেই জানা গেছে । এর আগেও দুই দফায় সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও সরকারের দুজন উপদেষ্টার হস্তক্ষেপের কারণে সম্ভব হয়নি।

গত বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর ড. শেখ আব্দুর রশীদকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় । তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব হলে পদায়ন পান। গত ২৪শে  ১৪ অক্টোবর সিদ্দিক জোবায়েরকে ‘দুই বছরের জন্য’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারে সুবিধাভোগী আমলা।

সরকারের দুজন উপদেষ্টার সুপারিশে তাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পেয়েই বদলি পদায়নে বাণিজ্যে শুরু করেন সিদ্দিক জুবায়ের। শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর আস্থাভাজন জুবায়ের ওই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। সর্বশেষ অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যান ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর। তার পিডিএস রেকর্ড বলছে, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ বিপুর চেষ্টায় যুগ্ম সচিব হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগে পদায়ন পান তিনি। এ মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে ২০১৭ ই অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিক্ষা প্রশাসনে অস্থিরতার জন্য দায়ী সিদ্দিক জোবায়ের। যারা ছাত্রজীবনে ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির করা কর্মকর্তাদের হয়রানি করতেন । তার নিজ জেলা নারায়ণগঞ্জ থেকে একাধিক কর্মকর্তাকে মাউশিতে পদায়ন করেন। পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) এবং উপপরিচালক (মাধ্যমিক উইং) পদে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তার আস্থাভাজন দুই কর্মকর্তা আছেন ।

গত ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয় বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর আস্থাভাজন এহতেসাম উল হককে। পরে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা সচিবের রুমে গিয়ে হট্টগোল করলে মাত্র ২০ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে দেয়। এ মহাপরিচালককে ফের নিয়ে আসেন সচিব। শুধু তাই নয়, দীপু মনির ঘনিষ্ঠজন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার আলোচিত প্রকল্প পরিচালক শফিউল আজমকে তার পদে রেখে সব প্রকল্পের তদারকি করাতেন। শিক্ষা খাতের অধিকাংশ প্রকল্পের কমিশন পূর্ববর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আদায় করা হতো তার মাধ্যমে । শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে স্মার্ট টিভির পরিবর্তে ইন্টারেক্টিভ প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার ব্যবস্থা করেন সিদ্দিক জোবায়ের।

এদিকে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগে বিতাড়িত সাবেক যুগ্ম সচিব (কলেজ) নুরুজ্জামানের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্যের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সিদ্দিক জোবায়ের। নতুন সরকার গঠনের পর দেশের প্রায় প্রতিটি কলেজে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রশাসনে কর্মকর্তা পদায়নে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠার পর নুরুজ্জামানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। কিন্তু তার পরও তিনি ছিলেন স্বপদে অনেকদিন । এ ছাড়া আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের মাউশি, এনসিটিবি, ও নায়েমে পদায়ন করতে সিদ্দিক জুবায়ের সহযোগিতা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার একক সিদ্ধান্তে স্কুল ভর্তিতে বিতর্কিত জুলাই কোটা চালু করে পরে সমালোচনার মুখে তা সংশোধন করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের ৭০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলাকারী অধ্যাপক মালেকা আক্তার বানুকে করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ।

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সিদ্দিক জোবায়ের এর মতামত জানতে চাওয়া হলে তা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার নিজ বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পত্রিকা ও টিভির রিপোর্টকে তিনি কোন তোয়াক্কা করতেন না , তার মতামত দিতেও চান না। এমন কথা তিনি গত কয়েকমাসে আগেও উচ্চারণ করেছেন প্রকাশ্যে ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির সভাপতিকে কুপিয়ে হত্যা, আহত আরও একজন

এনসিটিবিতে গোপন বৈঠকে সিদ্দিক জোবায়ের সিন্ডিকেট

আপডেট টাইম : ০১:৩২:১৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ জুলাই ২০২৫

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে (এনসিটিবি) সদ্য প্রত্যাহার হওয়া শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জোবায়ের সিন্ডিকেটের গত বুধবারবার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন । অফিসের পর বিকেল পাঁচটায় তিন ঘন্টার এই বৈঠকে শেষ সময়ে উপস্থিত হন সিদ্দিক জোবায়ের। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক উইংয়ের সদস্য অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরীর কক্ষে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে এনসিটিবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রবিউল কবির চৌধুরী ও প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর সম্রাট ও বিতরণ নিয়ন্ত্রক মো. হাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন এই বৈঠকে অংশ নেন।

নোটগাইড কোম্পানীর বহু বছরের পছন্দের শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সম্পাদনা শাখায় পদায়ন দেওয়ার রেওয়াজ ২০ বছর ধরে চলে আসছে। এবারও তার কোন ব্যতিক্রম নয়। আর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সংস্থার প্রতিবেদনে সিদ্দিক জোবায়ের-এর বিরুদ্ধে পুস্তক প্রকাশক ও কাগজ বিক্রেতাদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসছে । এই পর্যন্ত কোনো অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি সিদ্দিক জোবায়ের।

গত বুধবার বিকেলে মতিঝিলের এনসিটিবি কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন  সূত্রে  এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে, এনসিটিবির বর্তমান সচিব ওই বৈঠক সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানান তিনি । তিনি একাধিকবার বলেছেন বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল কবীর চৌধুরীর দক্ষতায় তিনি মুগ্ধ। রবিউলের সঙ্গে কেবিনেট বিভাগের ভালো যোগাযোগ আছে ।

জানা গেছে, এই বৈঠকের অন্যতম পরিকল্পনাকারী এনসিটিবি থেকে গত সেপ্টেম্বরে বদলি করা বিতর্কিত সচিব নাজমা আখতার। তাকে টাঙ্গাইলে বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যান না ।

রবিউল কবীর চৌধুরী গত ১৫ বছর ধরে পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের প্রধান পদে ছিলেন। সাবেক আওয়ামী লীগ মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী তাকে গত বছরের ৪ জুলাই এনসিটিবিতে বদলি করে নিয়ে আসেন। তখনকার সরকারের ঘনিষ্ঠজন রিয়াদ চৌধুরী আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও দীপু মনির ভাইকে ম্যানেজ করে মাদ্রাসা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন গত কয়েকবছর। এনসিটিবি থেকে জানা যায় জুলাই অভুত্থানের পর তিনি বিএনপির একজন নেতার সুপারিশে আসেন বলে চাউর রয়েছে শিক্ষা প্রশাসনে। ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রত্যাহার করা সচিব অনির্ধারিত বৈঠক করায় দুর্নীতির অভিযোগ আরো জোরালো হলো বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

সিদ্দিক জোবায়ের সচিব হয়েও এনসিটিবিতে নিয়মিত অফিস করতেন। ফলে কাগজ ও মুদ্রণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র ছিলো তার এবং তাদের কাছ থেকে সরাসরি সুবিধা নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কোন দিন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মতামত দিতে রাজী হয়নি ।

এনসিটিবির বর্তমান সচিব সাহতাব উদ্দিনের দাবি তিনি গোপন বৈঠকে তিনি ছিলেন না।

অপরদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সিদ্দিক জোবায়েরকে প্রত্যাহার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় বুধবার বিকেলে । বিতারিত শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জোবায়েরের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বই ছাপার কাগজ কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্য, শিক্ষাবোর্ড ও সরকারি কলেজে পদায়নে বাণিজ্য, ডিডি ও জেলা শিক্ষা অফিসার পদায়ন এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোয় কেনাকাটা এবং বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়মসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শুধু পরীক্ষা স্থগিতের ইস্যুতে নয়, গত ১০ মাসের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল সরকার। গত বছরের বই ছাপার জন্য কাগজ কেনাকাটায় কমিশন বাণিজ্যের মাস্টারমাইন্ড ছিলেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া এই সচিব। আওয়ামী আমলে লুটপাট করা এনসিটিবি সচিব নাজমা আখতারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সিদ্দিক জোবায়ের-এর হস্তক্ষেপে বন্ধ করা হয়েছে বলেই জানা গেছে । এর আগেও দুই দফায় সচিবকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও সরকারের দুজন উপদেষ্টার হস্তক্ষেপের কারণে সম্ভব হয়নি।

গত বছরের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর ড. শেখ আব্দুর রশীদকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় । তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব হলে পদায়ন পান। গত ২৪শে  ১৪ অক্টোবর সিদ্দিক জোবায়েরকে ‘দুই বছরের জন্য’ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারে সুবিধাভোগী আমলা।

সরকারের দুজন উপদেষ্টার সুপারিশে তাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পেয়েই বদলি পদায়নে বাণিজ্যে শুরু করেন সিদ্দিক জুবায়ের। শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর আস্থাভাজন জুবায়ের ওই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান। সর্বশেষ অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যান ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর। তার পিডিএস রেকর্ড বলছে, ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মার্চ বিপুর চেষ্টায় যুগ্ম সচিব হিসেবে বিদ্যুৎ বিভাগে পদায়ন পান তিনি। এ মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে ২০১৭ ই অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিক্ষা প্রশাসনে অস্থিরতার জন্য দায়ী সিদ্দিক জোবায়ের। যারা ছাত্রজীবনে ছাত্রদল বা ছাত্রশিবির করা কর্মকর্তাদের হয়রানি করতেন । তার নিজ জেলা নারায়ণগঞ্জ থেকে একাধিক কর্মকর্তাকে মাউশিতে পদায়ন করেন। পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) এবং উপপরিচালক (মাধ্যমিক উইং) পদে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তার আস্থাভাজন দুই কর্মকর্তা আছেন ।

গত ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করা হয় বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর আস্থাভাজন এহতেসাম উল হককে। পরে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীরা সচিবের রুমে গিয়ে হট্টগোল করলে মাত্র ২০ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে দেয়। এ মহাপরিচালককে ফের নিয়ে আসেন সচিব। শুধু তাই নয়, দীপু মনির ঘনিষ্ঠজন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা শাখার আলোচিত প্রকল্প পরিচালক শফিউল আজমকে তার পদে রেখে সব প্রকল্পের তদারকি করাতেন। শিক্ষা খাতের অধিকাংশ প্রকল্পের কমিশন পূর্ববর্তী সরকারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আদায় করা হতো তার মাধ্যমে । শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে স্মার্ট টিভির পরিবর্তে ইন্টারেক্টিভ প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা কমিশন নেওয়ার ব্যবস্থা করেন সিদ্দিক জোবায়ের।

এদিকে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগে বিতাড়িত সাবেক যুগ্ম সচিব (কলেজ) নুরুজ্জামানের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্যের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন সিদ্দিক জোবায়ের। নতুন সরকার গঠনের পর দেশের প্রায় প্রতিটি কলেজে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রশাসনে কর্মকর্তা পদায়নে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠার পর নুরুজ্জামানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। কিন্তু তার পরও তিনি ছিলেন স্বপদে অনেকদিন । এ ছাড়া আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের মাউশি, এনসিটিবি, ও নায়েমে পদায়ন করতে সিদ্দিক জুবায়ের সহযোগিতা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার একক সিদ্ধান্তে স্কুল ভর্তিতে বিতর্কিত জুলাই কোটা চালু করে পরে সমালোচনার মুখে তা সংশোধন করেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজের ৭০০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলাকারী অধ্যাপক মালেকা আক্তার বানুকে করা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ।

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সিদ্দিক জোবায়ের এর মতামত জানতে চাওয়া হলে তা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার নিজ বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পত্রিকা ও টিভির রিপোর্টকে তিনি কোন তোয়াক্কা করতেন না , তার মতামত দিতেও চান না। এমন কথা তিনি গত কয়েকমাসে আগেও উচ্চারণ করেছেন প্রকাশ্যে ।