ঢাকা ০৩:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা বছর হল ফাঁকা

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ১১:২৭:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫
  • ১১০ বার

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। যা এখনও চলছে সিনেমা হলে। এর এক মাস পর গত সপ্তাহে আলোর মুখ দেখেছে নতুন সিনেমা। গত ১১ জুলাই মুক্তি পেয়েছে কামার আহমাদ সাইমনের ‘অন্যদিন’। আর ১৮ জুলাই মুক্তি পেল বিপ্লব হায়দারের ‘আলী’। আর ঈদের পর যে সিনমাগুলো মুক্তি পেল তা দেখছে না দর্শক। এভাবে কি সিনেমা হল বাঁচানো যায়? এমন প্রশ্ন সিনেমাসংশ্লিষ্টদের। এজন্য দেশের সিনেমা হলগুলোর মধ্যে যেটুকু অবশিষ্ট আছে বছরের বেশির ভাগ সময়ই সেগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে। কারণ বড় বাজেটের আলোচিত সিনেমাগুলো কেবল দুই ঈদে মুক্তি পায়। আর তখনই দর্শক সমাগমে জমজমাট চেহারা ফিরে পায়। মূল কথা সিনেমা হল বেঁচে আছে কেবল ঈদ ঘিরে। বছরের বাকি সময়ে দর্শকসংকটে হলের খরচ তুলতেই হিমশিম খান হল মালিকরা। অধিকাংশ হলেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই, নেই প্রেক্ষাগৃহ সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ।

চলচ্চিত্র পরিবেশকরা বলেছেন, বর্তমানে দেশে চালু সিমেনা হলের সংখ্যা ১৪১টি। এই সংখ্যাটা সত্যিকার প্রতিচ্ছবি নয়। কারণ ঈদ ছাড়া সারা বছর ধরে চালু থাকে মাত্র ৬০টি হল। এর মধ্যে ৩০টির বেশি হলে চালানো হয় পুরনো সিনেমা। নব্বই দশকের ‘কাটপিস’ সিনেমা বা শাকিব খানের পুরনো ব্যবসাসফল সিনেমা বেশির ভাগ হলে চলে। পরিবেশকদের হিসাব অনুযায়ী, বাকি প্রায় ৮১টি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে কিছু বছরের বেশির ভাগ সময়ে বন্ধই থাকে। খোলা হয় কেবল ঈদের সিনেমা মুক্তি পেলে। এমন হলের সংখ্যা প্রায় ৩৯টি। এ ছাড়া আরও ৪২টি প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া দেওয়া হয় সময় ও সিনেমার ধরন বুঝে। অর্থাৎ হল মালিকদের অনেকেই এখন হলের তত্ত্বাবধানে নেই। তাদের হল বুকিং এজেন্টদের কাছে চুক্তিভিত্তিক লিজ দেওয়া হয় এক বা দুই মাসের জন্য। বড় বাজেটের বা তারকাসমৃদ্ধ সিনেমা এলে ভাড়া নিয়ে চলে হলগুলো। ঈদ ছাড়া বছরের বাকি সময় নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে সিনেপ্লেক্স ছাড়া তাদের হল জোটে সর্বোচ্চ ২৫-৩০টি।

চলচ্চিত্র পরিবেশক হিসেবে চার দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন মো. শহিদুল মিয়া, চলচ্চিত্রাঙ্গনে যিনি ‘মাস্টার’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, ‘হলের দরকার সিনেমা, আর সিনেমাওয়ালাদের দরকার হল। অথচ দুপক্ষই এখন দুর্বল। সিনেমা বানাতে এখন অনেক খরচ, কিন্তু সেই খরচ তুলতে হলে তো হলে দর্শক লাগবে। এখন হলে সিনেমা চালালেও টাকা ওঠে না। তাই বেশির ভাগ হলই বন্ধ রাখা হয়।’ ‘সিনেমা হয় ঈদের জন্য, সারা বছরের জন্য নয়’ এমনটাই মনে করেন আরেক পরিবেশক রুহুল আমীন। তিনি বলেন, ‘এখনকার প্রযোজক ও নির্মাতারা শুধুই ঈদকেন্দ্রিক সিনেমা বানাচ্ছেন, মৌসুমি রিলিজের মতোই। ঈদ ছাড়া হলে চলার মতো সিনেমা থাকে না। ঈদে একসঙ্গে ১০-১১টি সিনেমা এলেও ব্যবসা করে এক থেকে দুটি। এই সিনেমাগুলো যদি ঈদের ভিড় এড়িয়ে বছরের অন্য সময়ে আসত, তাহলে হল খোলা রাখা যেত।’

প্রশ্ন আসে সিনেমা হলগুলোতে দর্শক ধীরে ধীরে কমে গেল কেন? এর কারণ হিসেবে শুরুতেই আসে হলে পরিবেশের অবনতির কথা। আর এর সঙ্গে চলে আসে দর্শকের পছন্দসই সিনেমা তৈরি না হওয়া। এক সময় সিনেমা হল মানে ছিল পরিপাটি আসন, ঝকঝকে পর্দা, আর সুশৃঙ্খল দর্শক। পরে এর জায়গা নিল ধুলোবালি, ভাঙা চেয়ার আর বিশৃঙ্খলা। স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মন উঠে গেল। আগের সিনেমাগুলো ছিল পারিবারিক, গল্পনির্ভর আর সংলাপে ভরপুর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের জায়গা নিল অতি নাটকীয়তা আর অতিরঞ্জিত অ্যাকশন। দর্শক ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল। এ ছাড়া রয়েছে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের দাপট। ঘরে বসেই যদি হাজারো সিনেমা দেখা যায়, তাহলে আর হলে যাওয়ার ঝামেলা কে নেয়? ইউটিউব, নেটফ্লিক্স আর স্ট্রিমিং সার্ভিসের যুগে সিনেমা হল যেন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারল না। আর রয়েছে শপিংমল আর মাল্টিপ্লেক্সের আগ্রাসন। পুরনো সিনেমা হল যেখানে ধুলো জমিয়ে বসে রইল, সেখানে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের মন জয় করে নিল। এসিযুক্ত আরামদায়ক পরিবেশ, উন্নত প্রযুক্তির পর্দা আর নিখুঁত শব্দব্যবস্থা মানুষের পছন্দের তালিকার শীর্ষে উঠে এলো।

সাধারণ দর্শকের মতে, সমাধানের পদগুলো খুব সহজ। নির্মাণশৈলীর উন্নয়ন : মানসম্মত চিত্রনাট্য ও দক্ষ পরিচালকের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। অভিনেতা নির্বাচন : দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিল্পীদের গুরুত্ব দেওয়া। সিনিয়র শিল্পীদের এখন দেখাই যায় না। বিনিয়োগ বৃদ্ধি : পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানে সিনেমা নির্মাণ। বাজার গবেষণা : দর্শকদের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে সিনেমা তৈরি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

সারা বছর হল ফাঁকা

আপডেট টাইম : ১১:২৭:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ জুলাই ২০২৫

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মুক্তি পায় ছয়টি সিনেমা। যা এখনও চলছে সিনেমা হলে। এর এক মাস পর গত সপ্তাহে আলোর মুখ দেখেছে নতুন সিনেমা। গত ১১ জুলাই মুক্তি পেয়েছে কামার আহমাদ সাইমনের ‘অন্যদিন’। আর ১৮ জুলাই মুক্তি পেল বিপ্লব হায়দারের ‘আলী’। আর ঈদের পর যে সিনমাগুলো মুক্তি পেল তা দেখছে না দর্শক। এভাবে কি সিনেমা হল বাঁচানো যায়? এমন প্রশ্ন সিনেমাসংশ্লিষ্টদের। এজন্য দেশের সিনেমা হলগুলোর মধ্যে যেটুকু অবশিষ্ট আছে বছরের বেশির ভাগ সময়ই সেগুলো ফাঁকা পড়ে থাকে। কারণ বড় বাজেটের আলোচিত সিনেমাগুলো কেবল দুই ঈদে মুক্তি পায়। আর তখনই দর্শক সমাগমে জমজমাট চেহারা ফিরে পায়। মূল কথা সিনেমা হল বেঁচে আছে কেবল ঈদ ঘিরে। বছরের বাকি সময়ে দর্শকসংকটে হলের খরচ তুলতেই হিমশিম খান হল মালিকরা। অধিকাংশ হলেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নেই, নেই প্রেক্ষাগৃহ সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ।

চলচ্চিত্র পরিবেশকরা বলেছেন, বর্তমানে দেশে চালু সিমেনা হলের সংখ্যা ১৪১টি। এই সংখ্যাটা সত্যিকার প্রতিচ্ছবি নয়। কারণ ঈদ ছাড়া সারা বছর ধরে চালু থাকে মাত্র ৬০টি হল। এর মধ্যে ৩০টির বেশি হলে চালানো হয় পুরনো সিনেমা। নব্বই দশকের ‘কাটপিস’ সিনেমা বা শাকিব খানের পুরনো ব্যবসাসফল সিনেমা বেশির ভাগ হলে চলে। পরিবেশকদের হিসাব অনুযায়ী, বাকি প্রায় ৮১টি প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে কিছু বছরের বেশির ভাগ সময়ে বন্ধই থাকে। খোলা হয় কেবল ঈদের সিনেমা মুক্তি পেলে। এমন হলের সংখ্যা প্রায় ৩৯টি। এ ছাড়া আরও ৪২টি প্রেক্ষাগৃহ ভাড়া দেওয়া হয় সময় ও সিনেমার ধরন বুঝে। অর্থাৎ হল মালিকদের অনেকেই এখন হলের তত্ত্বাবধানে নেই। তাদের হল বুকিং এজেন্টদের কাছে চুক্তিভিত্তিক লিজ দেওয়া হয় এক বা দুই মাসের জন্য। বড় বাজেটের বা তারকাসমৃদ্ধ সিনেমা এলে ভাড়া নিয়ে চলে হলগুলো। ঈদ ছাড়া বছরের বাকি সময় নতুন সিনেমা মুক্তি পেলে সিনেপ্লেক্স ছাড়া তাদের হল জোটে সর্বোচ্চ ২৫-৩০টি।

চলচ্চিত্র পরিবেশক হিসেবে চার দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন মো. শহিদুল মিয়া, চলচ্চিত্রাঙ্গনে যিনি ‘মাস্টার’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, ‘হলের দরকার সিনেমা, আর সিনেমাওয়ালাদের দরকার হল। অথচ দুপক্ষই এখন দুর্বল। সিনেমা বানাতে এখন অনেক খরচ, কিন্তু সেই খরচ তুলতে হলে তো হলে দর্শক লাগবে। এখন হলে সিনেমা চালালেও টাকা ওঠে না। তাই বেশির ভাগ হলই বন্ধ রাখা হয়।’ ‘সিনেমা হয় ঈদের জন্য, সারা বছরের জন্য নয়’ এমনটাই মনে করেন আরেক পরিবেশক রুহুল আমীন। তিনি বলেন, ‘এখনকার প্রযোজক ও নির্মাতারা শুধুই ঈদকেন্দ্রিক সিনেমা বানাচ্ছেন, মৌসুমি রিলিজের মতোই। ঈদ ছাড়া হলে চলার মতো সিনেমা থাকে না। ঈদে একসঙ্গে ১০-১১টি সিনেমা এলেও ব্যবসা করে এক থেকে দুটি। এই সিনেমাগুলো যদি ঈদের ভিড় এড়িয়ে বছরের অন্য সময়ে আসত, তাহলে হল খোলা রাখা যেত।’

প্রশ্ন আসে সিনেমা হলগুলোতে দর্শক ধীরে ধীরে কমে গেল কেন? এর কারণ হিসেবে শুরুতেই আসে হলে পরিবেশের অবনতির কথা। আর এর সঙ্গে চলে আসে দর্শকের পছন্দসই সিনেমা তৈরি না হওয়া। এক সময় সিনেমা হল মানে ছিল পরিপাটি আসন, ঝকঝকে পর্দা, আর সুশৃঙ্খল দর্শক। পরে এর জায়গা নিল ধুলোবালি, ভাঙা চেয়ার আর বিশৃঙ্খলা। স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের মন উঠে গেল। আগের সিনেমাগুলো ছিল পারিবারিক, গল্পনির্ভর আর সংলাপে ভরপুর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের জায়গা নিল অতি নাটকীয়তা আর অতিরঞ্জিত অ্যাকশন। দর্শক ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল। এ ছাড়া রয়েছে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের দাপট। ঘরে বসেই যদি হাজারো সিনেমা দেখা যায়, তাহলে আর হলে যাওয়ার ঝামেলা কে নেয়? ইউটিউব, নেটফ্লিক্স আর স্ট্রিমিং সার্ভিসের যুগে সিনেমা হল যেন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারল না। আর রয়েছে শপিংমল আর মাল্টিপ্লেক্সের আগ্রাসন। পুরনো সিনেমা হল যেখানে ধুলো জমিয়ে বসে রইল, সেখানে আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স দর্শকদের মন জয় করে নিল। এসিযুক্ত আরামদায়ক পরিবেশ, উন্নত প্রযুক্তির পর্দা আর নিখুঁত শব্দব্যবস্থা মানুষের পছন্দের তালিকার শীর্ষে উঠে এলো।

সাধারণ দর্শকের মতে, সমাধানের পদগুলো খুব সহজ। নির্মাণশৈলীর উন্নয়ন : মানসম্মত চিত্রনাট্য ও দক্ষ পরিচালকের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। অভিনেতা নির্বাচন : দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিল্পীদের গুরুত্ব দেওয়া। সিনিয়র শিল্পীদের এখন দেখাই যায় না। বিনিয়োগ বৃদ্ধি : পর্যাপ্ত বাজেট নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক মানে সিনেমা নির্মাণ। বাজার গবেষণা : দর্শকদের পছন্দ-অপছন্দ বুঝে সিনেমা তৈরি।