ঢাকা ০৯:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঘরের সঙ্গে হারিয়েছে মাকেও, ঈদ আনন্দ নেই জনমদুখী আকলিমার

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৮:৫০:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪
  • ১০ বার

মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী মোসা. আকলিমা। ছোট থেকেই মায়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে সে। এখন সেই মাও নেই, তিনি মারা গেছেন। মা হারানোর শোকে কাতর হয়ে গেছে চঞ্চল এই কিশোরী। কিছুতেই সে ভুলতে পারছে না মায়ের মৃত্যুর স্মৃতি।

ভুলবেই বা কিভাবে, তার চোখের সামনেই ধুকে ধুকে মারা গেছেন মা সাহিদা বেগম (৫০)। ঝড়ে ঘরচাপা পড়ে আহত হন সাহিদা। হাসপাতালে নেওয়ার টাকা না থাকায় আকলিমার চোখের সামনে ধুকে ধুকে মারা যান কার মা। কবরও ঘরহীন বসতভিটার সামনেই। তাই ঈদের আনন্দও নেই কিশোরী আকলিমার মাঝে।

সে ভোলার লালমোহন উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বগিরচর এলাকার বেড়িবাঁধের বাসিন্দা।

আকলিমা বলে, মাসহ বেড়িবাঁধের ওপরের সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছিলাম। রোববারের প্রচণ্ড ঝড়ে আমাদের নড়বড়ে ঘরটি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ওই ঘরের নিচেই চাপা পড়েন আমার মা। মাকে ঘরের নিচে চাপা পড়তে দেখে চিৎকার শুরু করি। ঝড়ের কারণে কেউ আমার চিৎকার শুনতে পায়নি। তবে ঝড় কমে গেলে আমার কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। এরপর মাকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী একটি ঘরে নেওয়া হয়। টাকার অভাবে গুরুতর অবস্থাতেও মাকে হাসপাতালে নিতে পারিনি। আমার চোখের সামনেই গত মঙ্গলবার রাতে মা মারা যান। তার কবর দিয়েছি বসতভিটার সামনের খাস জমিতেই। মাকে হারানোর শোক কিছুতেই কমছে না। যার ফলে ঈদের কোনো আনন্দ নেই। কারণ আমি যে নিঃস্ব প্রায়।

সে আরও বলে, আমি ছোট থাকতেই আমাদের এক ভাই ও দুবোনকে মাসহ ফেলে রেখে বাবা নতুন করে বিয়ে করেন। এরপর আর আমাদের কোনো খোঁজখবর নেননি তিনি। ভাইও গত কয়েক বছর আগে অভাবের কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। তারও কোনো খোঁজ নেই। বড় বোন চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তার দুই সন্তান রয়েছে। ওই দুই সন্তানসহ তাকে রেখেও চলে গেছেন বোন জামাই। গার্মেন্টসে চাকরি করে আমার বোন যা বেতন পায় সেখান থেকে নিজের সংসার চালানোর পর আমাদের কিছু টাকা দিত। এছাড়া গ্রামে আমি মানুষজনের ঘরের কাজ করে মাকে নিয়ে সংসার চালাতাম। ঝড়ে আমার মা মারা গেছেন। বসতভিটাও এখন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আমি অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। নতুন করে ঘর তৈরি বা মেরামতের কোনো সাধ্যই আমার নেই। এখন কি করবো তাই ভেবে পাচ্ছি না। তাই আমি সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।

কিশোরী আকলিমার প্রতিবেশী মোসা. নূর নাহার বলেন, আকলিমা জন্মের পর থেকে তার মায়ের সঙ্গেই থাকছে। সে আসলেই যেন জনমদুখী। কারণ তার জন্মের পর থেকে কষ্টেই কেটেছে তাদের সংসার। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে আকলিমা ও তার মাকে। গত কয়েকদিন আগের ঝড়ে আকলিমার কষ্ট আরও বাড়িয়েছে। ঝড়ে ঘর চাপা পড়ার দুই দিনের মাথায় তার মা বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন। তার ওপর বসতঘরটিও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এখন কেবল ফাঁকা পড়ে আছে তাদের বসতভিটা। অসহায় এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক আকলিমার পক্ষে কোনোভাবেই নতুন করে ঘর তোলা সম্ভব না। তাই আকলিমাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য সরকারের কাছে প্রতিবেশী হিসেবে আমরাও দাবি জানাচ্ছি।

বদরপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. লিটন জানান, ঝড়ের পরপরই আমি বেড়িবাঁধের ওপরের সব ঘরবাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখেছি। এর মধ্যে যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের একটি তালিকাও করেছি। ঈদের ছুটির কারণে ওই তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে দিতে পারছি না। তবে ছুটি শেষ হলেই ওই তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে দেব। সেখানে আকলিমার মায়ের মৃত্যু ও ঘরের ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তালিকা অনুযায়ী কোনো বরাদ্দ আসলে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনা আগে কেউ আমাকে জানায়নি। জানলে তখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত। তবে এখন জেনেছি, ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে তাদের সহযোগিতার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

ঘরের সঙ্গে হারিয়েছে মাকেও, ঈদ আনন্দ নেই জনমদুখী আকলিমার

আপডেট টাইম : ০৮:৫০:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০২৪

মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী মোসা. আকলিমা। ছোট থেকেই মায়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেছে সে। এখন সেই মাও নেই, তিনি মারা গেছেন। মা হারানোর শোকে কাতর হয়ে গেছে চঞ্চল এই কিশোরী। কিছুতেই সে ভুলতে পারছে না মায়ের মৃত্যুর স্মৃতি।

ভুলবেই বা কিভাবে, তার চোখের সামনেই ধুকে ধুকে মারা গেছেন মা সাহিদা বেগম (৫০)। ঝড়ে ঘরচাপা পড়ে আহত হন সাহিদা। হাসপাতালে নেওয়ার টাকা না থাকায় আকলিমার চোখের সামনে ধুকে ধুকে মারা যান কার মা। কবরও ঘরহীন বসতভিটার সামনেই। তাই ঈদের আনন্দও নেই কিশোরী আকলিমার মাঝে।

সে ভোলার লালমোহন উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বগিরচর এলাকার বেড়িবাঁধের বাসিন্দা।

আকলিমা বলে, মাসহ বেড়িবাঁধের ওপরের সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছিলাম। রোববারের প্রচণ্ড ঝড়ে আমাদের নড়বড়ে ঘরটি ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ওই ঘরের নিচেই চাপা পড়েন আমার মা। মাকে ঘরের নিচে চাপা পড়তে দেখে চিৎকার শুরু করি। ঝড়ের কারণে কেউ আমার চিৎকার শুনতে পায়নি। তবে ঝড় কমে গেলে আমার কান্নার শব্দ শুনে আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। এরপর মাকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী একটি ঘরে নেওয়া হয়। টাকার অভাবে গুরুতর অবস্থাতেও মাকে হাসপাতালে নিতে পারিনি। আমার চোখের সামনেই গত মঙ্গলবার রাতে মা মারা যান। তার কবর দিয়েছি বসতভিটার সামনের খাস জমিতেই। মাকে হারানোর শোক কিছুতেই কমছে না। যার ফলে ঈদের কোনো আনন্দ নেই। কারণ আমি যে নিঃস্ব প্রায়।

সে আরও বলে, আমি ছোট থাকতেই আমাদের এক ভাই ও দুবোনকে মাসহ ফেলে রেখে বাবা নতুন করে বিয়ে করেন। এরপর আর আমাদের কোনো খোঁজখবর নেননি তিনি। ভাইও গত কয়েক বছর আগে অভাবের কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। তারও কোনো খোঁজ নেই। বড় বোন চট্টগ্রামে গার্মেন্টসে চাকরি করেন। তার দুই সন্তান রয়েছে। ওই দুই সন্তানসহ তাকে রেখেও চলে গেছেন বোন জামাই। গার্মেন্টসে চাকরি করে আমার বোন যা বেতন পায় সেখান থেকে নিজের সংসার চালানোর পর আমাদের কিছু টাকা দিত। এছাড়া গ্রামে আমি মানুষজনের ঘরের কাজ করে মাকে নিয়ে সংসার চালাতাম। ঝড়ে আমার মা মারা গেছেন। বসতভিটাও এখন ফাঁকা পড়ে রয়েছে। আমি অন্যের ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। নতুন করে ঘর তৈরি বা মেরামতের কোনো সাধ্যই আমার নেই। এখন কি করবো তাই ভেবে পাচ্ছি না। তাই আমি সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।

কিশোরী আকলিমার প্রতিবেশী মোসা. নূর নাহার বলেন, আকলিমা জন্মের পর থেকে তার মায়ের সঙ্গেই থাকছে। সে আসলেই যেন জনমদুখী। কারণ তার জন্মের পর থেকে কষ্টেই কেটেছে তাদের সংসার। একটু বড় হওয়ার পর থেকেই মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হয়েছে আকলিমা ও তার মাকে। গত কয়েকদিন আগের ঝড়ে আকলিমার কষ্ট আরও বাড়িয়েছে। ঝড়ে ঘর চাপা পড়ার দুই দিনের মাথায় তার মা বিনাচিকিৎসায় মারা গেছেন। তার ওপর বসতঘরটিও ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এখন কেবল ফাঁকা পড়ে আছে তাদের বসতভিটা। অসহায় এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক আকলিমার পক্ষে কোনোভাবেই নতুন করে ঘর তোলা সম্ভব না। তাই আকলিমাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য সরকারের কাছে প্রতিবেশী হিসেবে আমরাও দাবি জানাচ্ছি।

বদরপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. লিটন জানান, ঝড়ের পরপরই আমি বেড়িবাঁধের ওপরের সব ঘরবাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখেছি। এর মধ্যে যাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের একটি তালিকাও করেছি। ঈদের ছুটির কারণে ওই তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে দিতে পারছি না। তবে ছুটি শেষ হলেই ওই তালিকা ইউনিয়ন পরিষদে দেব। সেখানে আকলিমার মায়ের মৃত্যু ও ঘরের ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করেছি। তালিকা অনুযায়ী কোনো বরাদ্দ আসলে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনা আগে কেউ আমাকে জানায়নি। জানলে তখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেত। তবে এখন জেনেছি, ক্ষতিগ্রস্ত ওই পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে তাদের সহযোগিতার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করব