,

বুড়িগঙ্গার মতো মরছে ধলেশ্বরী

হাওর বার্তা ডেস্কঃ সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর বর্জ্যরে ভয়াবহ দূষণে বুড়িগঙ্গার মতোই প্রাণ হারিয়েছে ধলেশ্বরী। দূষণে ধ্বংস হয়ে গেছে নদীর জলজ জীবন এবং জীববৈচিত্র্য। ট্যানারি বর্জ্যে মৃতপ্রায় বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলোকে সরিয়ে নেয়া হয় সাভারের হেমায়েতপুরে হরিণধরা এলাকায়। কিন্তু তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ট্যানারির বর্জ্যে দূষণের শিকার হয়ে মরছে ধলেশ্বরী। কারখানার তরল বর্জ্যে সরাসরি মিশছে নদীর পানিতে। এ ছাড়া চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্যে শোধনাগার (সিইটিপি) থেকে যে পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে, তাতেও মাত্রার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে।

ধলেশ্বরী নদীর বর্তমান মৃতপ্রায় অবস্থা নিয়ে পরিবেশ অধিদফতর গত জুলাই মাসে সংসদীয় কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। এতে বলা হয়েছে, সাভার ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটের বর্জ্যরে দূষণে নদীর জলজ জীবন এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিবেশ অধিদফতরের এ প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংসদীয় কমিটি ট্যানারি শিল্পের সব শিল্প ইউনিটকে কেন্দ্রীয় বর্জ্যে শোধনাগারের আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণে শিল্প মন্ত্রণালয়কে ৩ থেকে ৬ মাস সময় দিয়েছে। এরপর পরিবেশ দূষণের দায়ে সাভার শিল্পনগরী বন্ধ করে দেয়ার সুপারিশ করেছে। কিন্তু শিল্পমন্ত্রণালয় তাদের এ সুপারিশ আমলে নিচ্ছে না। তবে সংসদীয় কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী পরিবেশ অধিদফতর সাভার শিল্পনগরীর ট্যানারিগুলোকে নতুন করে পরিবেশ ছাড়পত্র দিচ্ছে না। বর্তমানে এগুলো পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়াই তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। শুধু ট্যানারিগুলোই নয়, বিসিকও এখন পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া চলছে।
শুধু ধলেশ্বরী নদীই নয়, ট্যানারির বর্জ্যরে উন্মুক্ত ডাম্পিং এলাকায় ট্যারির বর্জ্য ফেলার কারণে গোটা এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানের অপরিশোধিত বর্জ্যে স্ক্রিনিং করার পর দুটি আলাাদা পাইপলাইনে সিইটিপিতে এবং ক্রোম রিকোভারি ইউনিটে নিগর্মণ করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাস্তবে শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বর্জ্যে স্ক্রিনিং ছাড়াই পাইপলাইনে ছেড়ে দিচ্ছে, ফলে স্থানীয় বাসিন্দারের কাছে চামড়া শিল্পনগরী এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্জ্যে আর উৎকট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ তারা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনে (বিসিক) বারবার জানিয়েও ফল মিলছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প-করপোরেশন (বিসিক) বলছে, একটি পরিপূর্ণ চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য যেসব বিষয় দরকার ছিল, তা প্রকল্পে সংযুক্ত ছিল না। কঠিন বর্জ্যে পরিশোধনের ব্যবস্থা করতে যে চীনা কোম্পানিকে কাজ দেয়া হয়েছিল, তারা তা করেনি।
পরিবেশের বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবেই সাভার চামড়া শিল্পনগরীর এই সমস্যা। যে কোনো ইন্ডাস্ট্রি করলে, সেখানে বর্জ্যে হবেই। সঠিক পরিকল্পনা ও বর্জ্যে ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে কার্যক্রম শুরু করায় আজকে এই জটিল অবস্থার তৈরি হয়েছে। বর্জ্যে ওই এলাকার নদী ও নদীপাড়ের পরিবেশ, আবহাওয়ায় ও জনজীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খবির উদ্দিন বলেন, নিষিদ্ধ কেমিক্যাল ব্যবহারে বিশ্বের অন্যান্য দেশে মানা হলেও বাংলাদেশে মানা হচ্ছে না। ট্যানারির তরল বর্জ্যে নদীতে ফেলার কারণে, নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি মানবদেহেরও মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।

এ অবস্থার প্রতিকার জরুরি প্রয়োজন।
সাভার শিল্পনগরীর ট্যানারিগুলোতে পরিকল্পিত ডাম্পিং স্টেশন গড়ে না উঠায় ট্যানারির দূষণে আক্রান্ত হচ্ছে ধলেশ্বরী নদী ও নদীপারের বাসিন্দারা। চামড়া শিল্প কর্তৃপক্ষ ও মালিকদের কারসাজিতে কলকারখানার বর্জ্যে গিয়ে পড়ছে ধলেশ্বরীতে। ট্যানারির বর্জ্যে পরিশোধন না করে সরাসরি ও আংশিক পরিশোধিত বর্জ্যে ড্রেনেজের লাইন সংযুক্ত করা হয়েছে নদীর সাথে। এ কারণে ধলেশ্বরী নদী দূষিত হচ্ছে। এ ছাড়া উন্মুক্ত ডাম্পিংয়ে বর্জ্য ফেলায় পুরো এলাকায় দূষণ ছড়াচ্ছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, অধিকাংশ ট্যানারিতে উৎপাদন চলছে। কারখানার পাশে ড্রেনগুলোতে জমে আছে পানি আর ট্যানারির কঠিন বর্জ্য।ে কোথাও ট্যানারির বর্জ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যেন কারও দায় নেই পরিষ্কারের। উৎকট দুর্গন্ধে টিকা দায়।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বলেছিল সুন্দর আধুনিক পরিবেশ দেবে। বাস্তবতা বলছে এখন নরক! দুর্গন্ধে থাকা যায় না, বিপদে না পড়লে এ অঞ্চলে কেউ আর এখন থাকে না। ভাড়াটিয়ারা আসে না, যার ফলে কলোনিগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। আর যারা থাকেন তারা দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির সঙ্গে যুদ্ধ করেন। ট্যানারির বিষাক্ত গ্যাসে টিনসেড বাড়িগুলোর টিন ছিদ্র হয়ে যাচ্ছে।

ঘরে রেখে দেয়া তামা, কাসা, স্বর্ণ ও রুপার মতো ধাতুও রং ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চামড়া শিল্পনগরীতে দৈনিক ৪০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যে উৎপাদন হয়, অথচ বর্জ্যে ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে মাত্র ২৫ ঘনমিটার। ক্রোমিয়াম শোধনের ব্যবস্থাও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে নেই। অর্থাৎ দৈনিক ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্যে পরিবেশের সঙ্গে মিশেছে। যার ফলে এসব বর্জ্যরে খারাপ প্রভাব পড়েছে আশপাশের এলাকাগুলোতে।
স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আলী বলেন, ধলেশ্বরী নদী আর নদী নেই। এখন হয়েছে নোংরা পানির খাল। রাতের আঁধারে ট্যানারি মালিকরা সরাসরি ময়লা পানি নদীতে ছেড়ে দেয়। কেউ প্রতিবাদ করলেও কোনো লাভ নেই। তাদের সিইটিপি প্ল্যান শুধু নামেই থাকে। কাজের কাজ কিছুই নেই। প্রতিনিয়ত দূষণ হচ্ছে নদী ও তার আশপাশের এলাকা। আমাদের কাছে ট্যানারি এখন অভিশাপ।
ট্যানারি ওয়াকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ বলেন, চামড়া শিল্প নগরীতে শ্রমিকদের আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল, ক্যান্টিন ও ইউনিয়ন (সিবিএ) কার্যালয়ের ব্যবস্থাসহ শ্রমিক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবির বিষয়ে এর আগে আমরা আন্দোলন করেছি।

আন্দোলনের পর ইউনিয়ন (সিবিএ) কার্যালয় হলেও অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা এখনও হয়নি। শ্রমিকরা এখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পরিবেশ দূষণ করে ট্যানারি কারখানায় উৎপাদন ও বর্জ্যে নদীতে ফেলার অভিযোগে সাভারে বিসিক শিল্পনগরী ট্যানারিতে পরিবেশ অধিদফতরের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে এর আগে একাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষকে জরিমানা করলেও থামছে না বর্জ্যে নদীতে ফেলার কার্যক্রম।
পরিবেশ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জহিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ২০২১ সালে মাত্র ৮১টি কারখানা পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নিয়েছিল। যা ফেব্রুয়ারির পর কাউকে আর ছাড়পত্র দেয়া হচ্ছে না। বিসিকের নিজেরও নেই কোনো পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র।
তবে বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুর রহমান রেজোয়ান বলেন, পরিবেশ রক্ষা করে উৎপাদন চালাতে কারখানাগুলোকে বারবার তাগিদ দেয়া হয়। উচ্চমহল থেকে পরিবেশ নিয়ে ভাবছেন। আশাকরি দ্রুতই সমাধান হবে সব ভোগান্তি।
চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প পরিচালক জিতেন্দ্র নাথ পাল বলেন, অতীতে বিভিন্ন কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। তবে এখন সিইটিপি চালু করাসহ প্রকল্পের সব কাজসম্পন্ন হয়েছে। এই শিল্পনগরীতে কঠিন বর্জ্যে শোধনাগার স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়গুলো সম্পৃক্ত করে নতুন আরেকটি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর