,

এবার এশিয়ার সেরায় চোখ রুপনার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ নেপালের কাঠমান্ডুতে সদ্য সমাপ্ত সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা গোলরক্ষকের খেতাব জিতেছেন শিরোপাজয়ী বাংলাদেশ দলের গোলবারের অতন্দ্র প্রহরী পাহাড়ি কন্য রুপনা চাকমা। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পর এবার তার চোখ এশিয়ার সেরায়। নজরকাড়া পারফরম্যান্স করে এশিয়ার সেরা গোলরক্ষকের খেতাব জিততে চান রুপনা। গতকাল দুপুরে মতিঝিলের বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনে দৈনিক ইনকিলাবের সঙ্গে আলাপচারিতায় একথা জানান তিনি।
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে অপরাজিত শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ে গত বুধবার দেশে ফেরার পর থেকে এখনও আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভাসছেন সাবিনা খাতুনরা। ছাদখোলা বাসে চড়ে বিমানবন্দর থেকে বাফুফে ভবনে নিয়ে আসা হয় কৃষ্ণা রানী সরকার-রুপনা চাকমাদের। হাজার হাজার ফুটবলপ্রেমীর সংবর্ধনা ও উষ্ণ ভালবাসায় সিক্ত হয়ে বাফুফে ভবনে পৌঁছার পর থেকে যেন অবসর নেই সাফজয়ী জাতীয় নারী দলের খেলোয়াড়দের। প্রতিদিনই গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে হচ্ছে চ্যাম্পিয়ন মেয়েদের। দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে সেরার খেতাব জেতার আনন্দ গণমাধ্যমের কাছে নানাভাবে প্রকাশ করছেন সাবিনা-সানজিদারা। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপাকালে মেয়েদের অনেক অজানা কাহিনীও বেরিয়ে আসছে। এসব কাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সাফের সেরা গোলরক্ষক রুপনা চাকমার জরাজীর্ণ বাসস্থান। রাঙামাটিতে মাথাগোজার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার সেরা এই গোলরক্ষকের উপযুক্ত একটি বাড়িও নেই। এটা সাফের ফাইনালের আগেই জেনেছেন ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন রুপনাকে যেন রাঙামাটিতে তার পৈতৃক ভিটায় একটি বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা পেয়ে সংশ্লিষ্টরা যখন রাঙামাটি জেলার ভূইয়াডাম গ্রামে রুপনার গ্রামে যান তখন কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে এই পাহাড়ি কন্যা দেশের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য লড়ছেন।
রুপনা আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী। তার বাবা নেই। জন্মের আগেই তার বাবা মারা গেছেন। মা কালাসোনা চাকমা, বড় দুই ভাই ও এক বোনের পরই রুপনার স্থান সবার শেষে। সংসারের শেষের সন্তানটির নামই এখন দক্ষিণ এশিয়ায় সবার আগে! বড় দুই ভাই ও এক বোন বিয়ে করেছেন। সবাই একসঙ্গে ভূইয়াডাম গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। এই গ্রামে প্রবেশ করতে হয় বিশাল এক বাঁশের সাঁকো বা পুলের উপর দিয়ে। যা বেশ কষ্টসাধ্য। বর্ষার সময় খুবই অসুবিধা হয় সাঁকো পাড় হতে। রুপনা জানান, অনেক সময় ঢাকা থেকে বাড়িতে গেলে সাঁকো পাড় হওয়ার সময় সমস্যায় পড়তে হয়। কখনো কখনো সঙ্গে থাকা লাগেজ সাঁকোর নীচে পানিতে পড়ে গেছে। তারপরও বাড়িতে পৌঁছার আনন্দ এসব কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। তার মা আগে
কৃষি কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন কাজ করেন না। এ প্রসঙ্গে রুপনা বলেন,‘আগে যখন ছোট ছিলাম তখন মা কৃষি কাজ করতেন, এখন আমি বড় হয়েছি। ফুটবল খেলে রোজগার করি তাই মাকে কাজ করতে দেই না।’
প্রধানমন্ত্রী রুপনাকে বাড়ি করে দিচ্ছেন। এটা জেনে কেমন লেগেছে এই পাহাড়ি কন্যার? এ প্রশ্নে রুপনার উত্তর,‘ফাইনাল শেষে সতীর্থদের কাছে এবং ফেসবুকের পোস্টে যখন জানলাম প্রধানমন্ত্রী আমাকে বাড়ি করে দিবেন, তখন যে কি খুশি লেগেছে বলে বোঝাতে পারবো না। খবরটি জেনে সঙ্গে সঙ্গেই মাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম তিনি খুশি কিনা। মা বললেন তুমি খুশিতো, আমি বললাম তোমরা খুশি থাকলে আমিও খুশি।’ তিনি আরও বলেন,‘প্রধানমন্ত্রী আমাদের সবার অভিভাবক। উনার সহযোগিতা আমরা সব সময়ই পেয়ে থাকি। ব্যাক্তিগতভাবে আমাকে বাড়ি করে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে উনি প্রমাণ করেছেন সত্যিই আমাদের প্রধানমন্ত্রী মানবতার জননী। আমি প্রধানমন্ত্রীকে সালাম ও ধন্যবাদ জানাই।’ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরের অনূভুতি এভাবে প্রকাশ করেন এই পাহাড়ি কন্যা,‘চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর যখন হোটেলে ফিরলাম তখন যে কি আনন্দ ছিল আমাদের মাঝে তা বলে বোঝানো যাবে না। ওই রাতে আমরা ঘুমাতে পারি নাই আনন্দে। বার বার ভাবছিলাম আমরা কি সত্যিই চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।’
রুপনা জানান এবার তার চোখ এশিয়ার সেরায়। তিনি এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক হতে চান। তার কথায়,‘আমার এখন চোখ এশিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ায় সেরা গোলরক্ষক হয়েছি, এখন লক্ষ্য এশিয়ার সেরা হওয়া। চেষ্টা করবো যাতে লক্ষ্যপূরণ করতে পারি। জানি এটা করতে হলে অনেক পরিশ্রম করতে হবে। তা করতে রাজি আছি আমি। ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে চাই। নারী ফুটবলে বাংলাদেশকে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে দেখতে চাই।’
রুপনা বলেন,‘সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ছাদখোলা বাসে চড়ে বাফুফে ভবনে আসতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। দেশে ফেরার পর যে সম্মান ও জনগণের ভালবাসা পেলাম তা কখনো ভুলবো না। এসব কিছু হয়েছে বাফুফের সভপতি কাজী মো. সালাউদ্দিন স্যার, মাহফুজা আক্তার কিরণ ম্যাডাম, কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন স্যারসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের জন্য। তারাই আমাদেরকে সেরা হিসেবে গড়ে তুলতে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন। তাদেরকে জানাই অশেষ ধন্যবাদ। আর ছাদখোলা বাসের ব্যবস্থা করে আমাদেরকে বিমানবন্দর থেকে বাফুফে ভবনে নিয়ে এসেছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল স্যার। রাসেল স্যারকেও জানাই সালাম ও ধন্যবাদ। পাশাপাশি ধন্যবাদ দেশের ক্রীড়া পাগল ফুটবলপ্রেমীদের। যারা ভালবাসা দিয়ে আমাদেরকে বরণ করে নিয়েছেন।’

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর