,

গৃহায়ন চেয়ারম্যানের ২৭১ অ্যাকাউন্ট

তোফাজ্জল হোসেন রুবেলঃ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চেয়ারম্যানের নামে রয়েছে ২৭১টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। বিভিন্ন প্রকল্পের নামে ও স্থায়ী আমানত রাখার জন্য এসব ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংক হিসাবের ১০৩টি চলতি হিসাবের আর ১৬৮টি স্থায়ী আমানতের হিসাব।

একটি ব্যাংকেই রয়েছে ৬৫টি অ্যাকাউন্ট। এসব হিসাব গত ৭ থেকে ৮ বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পের জামানত ও কিস্তি সংগ্রহের জন্য এগুলো খোলা হয়েছিল। অনেক প্রকল্প সমাপ্ত হয়ে গেলেও ব্যাংক হিসাব চলমান রয়েছে। এগুলোর জন্য বাৎসরিক চার্জ হিসেবে গুনতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় আর গৃহায়নের চেয়ারম্যানদের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পছন্দে এসব অ্যাকাউন্ট খোলা হয়ে থাকে। অনেক হিসাব চলমান না থাকলেও কেউ দায়িত্ব নিয়ে তা বন্ধ করছে না। গৃহায়নের শীর্ষ কর্তারাও স্বীকার করেন, ‘এরকম অস্বাভাবিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা উচিত নয়।’ স্বীকার পর্যন্তই! পরের পদক্ষেপের উদ্যোগ নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. দেলওয়ার হায়দার বলেন, ‘এতগুলো অ্যাকাউন্ট থাকা উচিত না। কিছু অ্যাকাউন্ট হলেই চলে। আমাদের ৩২টি প্রকল্প রয়েছে; তাই ৩২টি অ্যাকাউন্ট হলে কাজের সুবিধা হবে। আলাদা প্রকল্পের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন হয়। তাহলে এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্পের টাকার সঙ্গে মিলে যাবে না। হয়তো এই কারণেই বেশি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে আমি মনে করি এমনটি হওয়া উচিত না।’

কোন ব্যাংকে কত অ্যাকাউন্ট : এক যুগের বেশি সময় ধরে কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে যেখানে কোনো লেনদেন নেই, তবু তা সচল। অনেক অ্যাকাউন্ট আছে যা প্রকল্পের জন্য খোলা হয়েছে, সেই প্রকল্প সমাপ্ত হলেও অ্যাকাউন্ট চলছে। বেসিক ব্যাংকের একাধিক শাখায় রয়েছে ৬৫টি চলতি হিসাব। এ ছাড়া ওয়ান ব্যাংকে ১৯টি, ঢাকা ব্যাংকে ৩টি, জনতা ব্যাংকে ১২টি, মার্কেন্টাইল ব্যাংকে ১৭টি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে ৩টি, মধুমতি ব্যাংকে ৫টি, এনআরবি ব্যাংকে ১টি, অগ্রণী ব্যাংকে ১৫টি, এবি ব্যাংকে ৫টি, ন্যাশনাল ব্যাংকে ৪টি, সোনালী ব্যাংকে ৪টি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ২টি, আইএফআইসি ব্যাংকে ১০টি, যমুনা ব্যাংকে ২টি, প্রাইম ব্যাংকে ৩টি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে ৫টি, উত্তরা ব্যাংকে ১টি এবং সরকারি-বেসরকারি আরও ২৩টি ব্যাংকে যেমন রূপালী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, আইএসআইবিএল ব্যাংক, ইউসিবিএল ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকে ১০৪টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। মোট ২৭১টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে।

যেভাবে অ্যাকাউন্টের টাকা যাচ্ছে ব্যাংকের পকেটে : চলতি বছরে সরকারের শুল্ক-কর আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষে ব্যাংকগুলো পঞ্জিকাবর্ষ (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) ধরে আবগারি শুল্ক কেটে রাখছে। কোনো গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যদি ১ লাখ টাকার কম টাকা থাকে তাহলে কোনো আবগারি শুল্ক কাটা হয় না। তবে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত টাকা থাকলে ১৫০ টাকা ও ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত থাকলে ৫০০ টাকা আবগারি শুল্ক দিতে হয়। ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা থাকলে ৩ হাজার টাকা, ১ কোটি থেকে ৫ কোটি টাকা থাকলে ১৫ হাজার টাকা এবং ৫ কোটি টাকার ওপরে থাকলে ৪০ হাজার টাকা আবগারি শুল্ক আরোপ করা হয়।

১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা হলে ৩ হাজার টাকা ধরে হিসাব করলে ২৭১ ব্যাংক হিসাবের বার্ষিক আবগারি শুল্ক হয় ৮ লাখ ১৩ হাজার টাকা। ১ কোটি টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা হলে ১৫ হাজার টাকা ধরে ২৭১ হিসাবের বার্ষিক আবগারি শুল্ক হয় ৪০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ৫ কোটি টাকার ওপরে হলে ৪০ হাজার টাকা ধরে ২৭১ হিসাবের বার্ষিক আবগারি শুল্ক হয় ১ কোটি ৪ লাখ টাকা। গৃহায়নের ব্যাংক হিসাবের বেশিরভাগ কোটি টাকার ওপরে। অ্যাকাউন্ট চার্জ বাবদ তাদের প্রায় কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর কোষাগারে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করে গৃহায়নের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এমন অস্বাভাবিক ব্যাংক হিসাব থাকার মূল কারণ যখন যে চেয়ারম্যান বা প্রশাসন শাখার পদস্থ কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকেন তখন তাদের পছন্দে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের সুপারিশেও বিভিন্ন ব্যাংকে টাকা জমা রাখা হয়। এসব ব্যাংকে জামানত রাখার বিনিময়ে সংশ্লিষ্টরা নানান সুযোগ-সুবিধাও নিয়ে থাকেন। এ কারণে এসব হিসাব চলমান না থাকলেও কেউ দায়িত্ব নিয়ে বন্ধ করে না। বছরের পর বছর এসব অ্যাকাউন্টে লেনদেন না হলেও গৃহায়নের কোষাগার থেকে ব্যাংকগুলোকে নানা ধরনের ফি দিতে হচ্ছে। সরকারি আর কোনো সংস্থায় এত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই বলেও জানান তারা।

দেশ রূপান্তরকে

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর