,

15

অবৈধ জালের দখলে বঙ্গোপসাগর, নষ্ট হচ্ছে ইকো-সিস্টেম

হাওর বার্তা ডেস্কঃ বঙ্গোপসাগরের তিন নদীর মোহনায় কিলোমিটারের পর কিলোমিটার এলাকা জুড়ে অবৈধ গোপ জাল (সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল) পেতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা ধরছে বরগুনার কিছু অসাধু জেলে।

মৎস্যজীবীরা বলছেন, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই পোনা শিকারের মহোৎসব চালাচ্ছে প্রভাবশালীরা। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব জালের ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে নষ্ট হবে সাগরের ইকো-সিস্টেম, বিলুপ্ত হবে ইলিশসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি।

পারথরঘাটা ট্রলার মালিক সমিতির দেওয়া তথ্য মতে, পাথরঘাটার হরিণঘাটা এলাকার হিরণ, শহিদ নাজির, এনামুলসহ প্রায় ৩২ জন লোক গোপ জাল পেতে পোনা শিকার করছে। তবে হিরণ একাই তিন নদীর মোহনার প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় গোপ জাল পেতে পোনা শিকার করছে।

ট্রলার মালিক সমিতির দেওয়া এমন তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় সরেজমিনে দেখা যায়, পায়রা, বলেশ্বর ও বিষখালীর তিন নদীর মোহনায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে খুঁটি দিয়ে গোপ নামের সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল পেতেছে জেলেরা। একটু সামনে এগিয়ে দেখা যায় কয়েকশ কিলোমিটার এলাকা গোপজালে সয়লাব।

পাথরঘাটা ট্রলার মালিক সমিতির সহসভাপতি সুলতান ফরাজী  বলেন, ‘ওই সাতটি ট্রলার হচ্ছে হরিণঘাটা এলাকার হিরণ নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির। প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ টন পোনা মাছ ধরা পরছে এসব জালে। সারা বছর মোহনায় জাল পেতে পোনা ধরে পাথরঘাটা ও তালতলীর আশারচড়ের শুঁটকি পল্লীতে বিক্রি করাই তার ব্যবসা। তবে স্থানীয় প্রশাসনকে তারা এ বিষয়ে একাধীকবার জানিয়েছেন, তারা কোনো ব্যবস্থা নেয় না। পাথরঘাটা কোষ্টগার্ড কয়েকবার অভিযান চালিয়ে জাল ও খুঁটা কেটে দিয়েছে। তারপরে আবার তারা নতুন করে জাল-দড়ি কিনে অবৈধ এ ব্যবসা করে যাচ্ছে। পাথরঘাটা ও তালতলীর শুঁটকি পল্লীতে গেলেই দেখা মিলবে এসব মাছের পোনার।’

মৎস্য ট্রলারের মালিক রাসেল চৌধুরী, হেমায়েত খান, কবির খানসহ বেশ কয়েকজন মৎস্যজীবীরা  বলেন, ‘জাটকা ইলিশ ধরা আমরা বন্ধ রেখেছি, যাতে সাগরে ইলিশ বৃদ্ধি পায়। তবে গোপজালের এমন অবস্থা থাকলে এসব অবরোধ কোনো কাজেই আসবে না।’

এই বিষয়ে বাংলাদেশ ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘প্রশাসনকে ম্যানেজ করে হিরণ ও শহীদ নাজিরসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীর নেতৃত্বে বঙ্গোপসাগরের মোহনা দখল করে রেখেছে। কমপক্ষে ১০০ কিলোমিটার এলাকা গোপ জালের দখলে। এসব নিয়ে একাধিকবার আমরা মানববন্ধন করেছি। বিক্ষোভ মিছিল করেছি, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। তারপরেও সমাধান হয়নি। শুধু আশ্বাস পেয়েছি গোপ জাল অপসারনের, তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তাই এখন এসব বিষয় নিয়ে আর মাথা ঘামাই না।’

পোনা শিকারের বিষয়ে জানতে চাইলে মুঠোফোনে  অভিযুক্ত হিরন বলেন, ‘গত বছর পোনা শিকার করেছি এটা সত্য। তবে এই নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হলে এখন আর পোনা মাছ শিকার করি না আমি। কেউ শত্রুতামূলকভাবে এখন আমার নামে বদনাম করছে।’

বরগুনা সরকারি মহিলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক খালেদা জান্নাতী বলেন, ‘সূক্ষ্ম ফাঁসের এসব জালে শুধু মাছের পোনা নয়, মারা পড়ছে মাছের ডিম ও বিভিন্ন জলজ প্রাণি। আবার একদিকে পানিতে ভাসমান ক্ষুদ্র প্রাণি বা জীব যেভাবে নেটের জালে মারা পড়ছে, অন্যদিকে জলজ প্রাণির খাবার উঠে যাচ্ছে সেসব জালে। যার ফলে হুমকির মুখে পড়বে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছ ও জলজ প্রাণির পরবর্তী প্রজন্ম। আর এ কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সাগরের ইকো সিস্টেম। এসব অবৈধ জাল বন্ধ না করলে চরম মূল্য দিতে হবে দেশকে।’

বরগুনার জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান  বলেন, ‘দেশের সম্পদ যারা নষ্ট করছে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। শিগগিরই কোস্টগার্ড ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান চালানো হবে বঙ্গোপসাগরে। যে কোনো মূল্যে অবৈধজাল মুক্ত করা হবে বঙ্গোপসাগর।’

রাইজিংবিডি.কম

বরগুনা/সনি

Print Friendly, PDF & Email

     এ ক্যাটাগরীর আরো খবর