ঢাকা ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
ছোট এআই মডেলেই বড় চ্যালেঞ্জ: ক্লাউড সিস্টেমকে টক্কর দিচ্ছে নতুন প্রযুক্তি রিজার্ভের আড়ালে বাড়ছে ঝুঁকি কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে: ত্রাণমন্ত্রী বিচারকদের সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান প্রধান বিচারপতির বগুড়ার আলোচিত তিন ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনে ডিসিকে প্রধানমন্ত্রীর চিঠি তাপমাত্রা ও বৃষ্টি নিয়ে নতুন বার্তা দিল আবহাওয়া অফিস নানা সংকটে চ্যালেঞ্জে পুলিশ মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দুই দিনের সরকারি সফর শুরু কাল, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা কার হাতে উঠবে বিশ্বকাপ, জানাল অক্টোপাস পলের উত্তরসূরিরা শুধু বেতন নয়, আরও যেসব সুবিধা পাচ্ছেন সরকারি চাকরিজীবীরা

হাওরে নিরাপদ জীবনের সম্ভাবনায় নবীন সূর্য

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:২৪:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২১
  • ২৯১ বার
রফিকুল ইসলামঃ ফুটেছে সূর্যমুখী হাওরের সবুজ বুক চিঁড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ফুল্লহাসি দিগন্তজুড়ে, পুষ্প-প্রকৃতিপ্রেমীর ঢল পড়ছে আছড়ে সুন্দরী রমণীর রূপসজ্জা নির্বিশেষে ঝরে।’ এ নবপ্রাণ হাওরের প্রকৃতিতে ও মনে।  যেন মাটি ফুঁড়ে উঠেছে নবীন সূর্য সম্ভাবনার প্রত্যয়ে। হাওরের সবুজ জমিনে এই প্রথমবার জেগেছে প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু অসাধারণ এক রূপবান উদ্ভিদ সূর্যমুখী। যে ফুল পাগলপাড়া করে দিয়েছে তার রূপবৈচিত্র্য দিয়ে। ইতিমধ্যে প্রযুক্তির কল্যাণে রূপসী বাংলায় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশ-দুনিয়ায় ব্যাপক পরিচিত পাওয়া নৈসর্গিক হাওরে বিস্তীর্ণ উর্বর মাঠজুড়ে হাসছে প্রকৃতির সন্তান সূর্যমুখী। শিশু মন নেচে উঠছে সেই হাসির দোলায়, যা সবুজের বুকে হলুদমাখা ফুলগুলো ডাকছে অপরূপ সৌন্দর্যের স্বপ্নিল অঙ্গনার হাতছানিতে।  
বাসন্তীরূপের স্নিগ্ধতার উৎসের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুষ্প-প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থী ও পর্যটকদের ঢল নেমেছে হাওর জনপদে। তাছাড়া বসন্ত উৎসব এবং ভালোবাসা দিবসের মিতালীতে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও নবদম্পতিদের প্রেম উৎসারিত ভালোবাসা দিবসের বাইরেও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তথা মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রেই ভালোবাসার এক অপার আবহে ভিড় হাওরজুড়ে। কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার সংযোগস্থাপনকারী অলওয়েদার রোডের জিরো পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ সংলগ্ন জমিনে কৃষক বাহাউদ্দিন ও কৃষাণী হাজেরা বেগমসহ আরও অনেকের সূর্যমুখী ফুলের চাষ দেখে মাতোয়া ভ্রমণপিপাসুরা প্রকাশ করছেন রোমাঞ্চকর যতসব অনুভূতি। তরুণী অনামিকা ও শ্রাবণী বলেন, ‘আহ্, কত্ত সুন্দর! একটি জমিতে ফুটেছে সূর্যমুখী, যেন পুরো মাঠ হাসছে প্রাণ খিলখিলে।
বিস্মিত হয়, যখন দেখলাম সূর্যমুখী ফুলই ঘাড় ঘুরাচ্ছে সূর্যতালে। থাকে সূর্যের দিকেই মুখ করে! এর জন্যই বুঝিবা নাম তার সূর্যমুখী।’ সুন্দরের মায়াময় প্রকৃতি দেখতে আসা দর্শনার্থী ললনা শাহীনূর নাহার, দোলনা ও উচ্চশিক্ষার্থী মানসুরা আক্তার প্রফুল্লচিত্তে বলেন, ‘সূর্যমুখী ক্ষেত দেখে মন ভরে উঠেছে এবং চাষে যেন প্রকৃতিকে ঢেলে সাজিয়েছে নতুন করে কেউ। রূপ ফুলটির গতরে। হাসি যেন আনন্দের সম্ভার এবং চোরা গন্ধ বাতাসে দোল খেয়ে যখন নাকের ভেতর ঢোকে, কী মাদকতায় না হৃদয়জুড়ে জাগিয়ে তোলে মনভোলানো অনুভব।’ আবার অনেকের মোবাইলে বাজছে বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গান– ‘বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে সই গো বসন্ত বাতাসে।
হাওরের প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য বড়ই বৈচিত্র্যময়। সৌন্দর্যের দিক থেকে হাওরে বর্ষা মৌসুমে অথৈ জলের রূপ অন্যদিকে চলমান শুষ্ক মৌসুমে বোরো-রবি-খরিপ ফসলের রূপ। ফসল বৈচিত্র্য সৃষ্টির পেছনে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বহুমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সূর্যমুখী আবাদকারী বাহাউদ্দিন ও হাজেরা বেগম দৃষ্টিনন্দন কুসুম মেলায় ঝাঁপি খুলে বসেছেন ‘দর্শনার্থীদের মন্তব্য বহি’ নিয়ে। এখানে যে-যার মতো আবেগ প্রকাশ করে যাচ্ছেন– ‘মনের গহীনে ও চোখের পাতায় সমস্ত ভালো লাগা নিয়ে ফিরে যাচ্ছি শহরে।’ শীতের বিবর্ণ সময়কে পাশ কাটিয়ে বসন্ত সূচনা করে নতুন প্রাণের। এবার শীতের শেষ দিক থেকেই প্রকৃতি ধীরে ধীরে রঙিন হতে থাকে বর্ণিল সাজে।সে রঙে রয়েছে হলুদের প্রধান্য। সরষে ফুলের মতো সূর্যমুখী ফুলও হলুদ।
পরিপক্ক ফল এবং ফসলের মাঠের রং হলুদাভ। ফলে উষ্ণ বসন্তে মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে হলুদ রঙের প্রভাব। প্রকৃতির এ প্রভাব থেকেই বসন্তের রং বাসন্তী। উষ্ণ সময়ের রং বলেই এটি আশা আর সুখের প্রতীক এবং পুরো পৃথিবীজুড়েই বিবেচিত শান্তি, সতেজ, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সাহস ও গৌরবেরও প্রতীক হিসেবে। আবার ইতিবাচক ভাবনার প্রতীক হিসেবে মানুষ বহু আগেই বসন্তের রং হিসেবে বেছে নিয়েছিল বাসন্তী রংকে। অর্থাৎ হালকা হলদি রংকে। সূর্যমুখী দেখতে রূপময়ই নয়, রূপ ও গুণেও অনন্য। এ সম্পর্কে গাজীপুরের জয়দেবপুর কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড: মোবারক আলীর সাথে আলাপচারীতায় মেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট মানের ভোজ্যতেল সূর্যমুখী, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ উপকারী।
এতে আছে শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড। ওমেগা ৬ ও ওমগা ৩ ফ্যাটি এসিড (লিনোলিক ও লিনোলেনিক এসিড) ও টেকোফেরল (ভিটামিন ‘ই’) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেলযুক্ত। তেল শতভাগ উপকারী অসম্পৃক্ত ফ্যাটযুক্ত। নেই ক্ষতিকারক ইউরিক এসিড। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগীর জন্যও সূর্যমুখী তেল নিরাপদ ও খু্বই উপকারী। একইভাবে সূর্যমুখীর ক্ষুদ্র বীজেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর উপাদান। এতে মজুত আছে ২০% প্রোটিন, ৩৫.৪২% তেল এবং ৩১% অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড। এছাড়া ভিটামিন হিসেবে রয়েছে এ, বি ৩, বি ৫, বি ৬, ই, ফোলেট।
তামা, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, সেলেনিয়ামের মতো খনিজ উপাদান, ডায়েটি ফাইবার এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড। এগুলোতে ফ্লেভোনয়েডস এবং ফলিক এসিডের মতো প্রচুর উদ্ভিদ যৌগ রয়েছে। এসব হজম সহায়তা, ত্বক জীবাণুমুক্ত ও এন্টি এজিং হিসেবে কাজ করে, চুলের সৌন্দর্য বাড়ায় ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে, রক্তে শর্করার পরিমাণ ও ওজন কমায়। এছাড়া বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো এবং সূর্যমুখী খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য হিসেবে এবং গাছ ও পুষ্পস্তবকও ব্যবহৃত হয় জ্বালানি হিসেবে।
তেলসংক্রান্ত জটিল সব অসুখের হাত থেকে রক্ষা পেতে খাবারে তেলের ব্যবহার বাদ দিতে হয় যদিও, কিন্তু শরীরের জন্য দরকারও রয়েছে তেলের। সূর্যমুখী হতে পারে স্বাস্থ্য রক্ষায় গুণসম্পন্ন তৈলবীজ। এ তেল নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতই নয়, আশীর্বাদস্বরূপও। দেশে বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ও যথাযথভাবে আহরণ করা গেলে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা বহুলাংশে কমে যাবে। এতে একদিকে যেমন বিদেশ থেকে তেল আমদানি কমে যাবে অন্যদিকে তেমনি বাড়বে তেলের দেশজ উৎপাদনও।
 
দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা সয়াবিন তেলের ওপর নির্ভরশীল। এই তেলে রয়েছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক অনেক উপাদান, যা ছিল না স্থানীয়ভাবে ভাঙানো সরিষার তেলেও। সরিষার তেলই ছিল বাঙালির তেলের চাহিদা পূরণের প্রধান তৈলবীজ। আরও ছিল তিল, তিসি, বাদাম। এই তিনটি তৈলবীজের তেলেও ক্ষতিকারক উপাদান নেই এতটা, যতটা আছে আমদানি করা সয়াবিন তেলে। নিরাপদ ভোজ্যতেলের চাহিদা থেকে বাণিজ্যিকভাবে এবারই প্রথম শুরু হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ফসলের পাশাপাশি সূর্যমুখী ফসলের চাষ। যা রবি চাষে পুনর্বাসনের আওতায় ইটনায় ২৭ হেক্টর, মিঠামইন ২৭ হেক্টর, অষ্টগ্রাম ২০ হেক্টর ও নিকলী উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে ৭শ জন কৃষক-কৃষাণী হাইব্রিড সূর্যমুখীর আবাদ করেছে।
চাষের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৯৪ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯০ টন এবং তেল প্রায় ৮৫ টন। ইটনার বড়িবাড়ি ব্লকের শিমুলবাগের কৃষক আ: হেকিম, পূর্বগ্রাম ব্লকের মির্দাহাটির শহিদুল ইসলাম ও কৃষাণী মোমেনা বেগম, মিঠামইনের মহিষারকান্দি ব্লকের বেড়িবাঁধের কৃষক বাহাউদ্দিন, ইসলামপুর ব্লকের মুজিবুর রহমান ও কৃৃষাণী জোসনা আক্তার, গোপদিঘী ব্লকের খাসাপুর গ্রামের আ: রহমান ও কৃষাণী আয়শা খাতুন, অষ্টগ্রামের আদমপুর ব্লকের নূরপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ্ আল মামুন ও মো: নাঈম সূর্যমুখীর চাষ প্রথম করায় এর সুফল অজানা। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ফসলটি লাভজনক এবং ফুল থেকে তেল তোলা যায় ৯০-১০০ দিনের মধ্যে, যার বাজার মূল্য বেশি এবং খরচও অপেক্ষাকৃত কম বলায় উৎসাহিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তাঁরা।
সূর্যমুখী চাষের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে নিকলী উপজেলার ষাইতদার গ্রামের কৃষক জালাল, উদ্দিন, কৃষাণী হোসনেহার ও মিয়া হোসেনের। তাঁদের ভাষায় শোনান আলাদীনের চেরাগের নয়, সত্যকাহনের গল্প। মাত্র ৪০ শতক জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করে খরচ বাদে প্রায় চারগুণ বেশি লাভ পেয়েছিলেন বলে বিজয়ের গালভরা হাসিতে রহস্যভরে বলেন, বীজ অইছিন ৮ মণ আর ঘানির মালিকরে খৈল দিয়ে তেল অইছিন ৬০ কেজির ওফরে। ৫শ ট্যাহা কেজিতে মাইনষে বাড়িত থেইক্যা কিন্না নিছেগা।
ট্যাহা পাইছি ৩০ হাজার। তাছাড়া সারাবছর তেলও খাইছি ফাও। অথচ খরছ অইছিন ৮ হাজারের মতো। সূর্যমুখী ফসলের ব্যাপক চাষে হাওরের কৃষকের দুর্দিন ঘুচে যেতে পারে বলে বিপুল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে অভিমত ব্যক্ত করেন তাঁরা। অধিক লাভজনক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ও পরামর্শে এবারও নিকলীর কৃষক জালাল উদ্দিন ও কৃষাণী হোসনেহার একাই সূর্যমুখী চাষ করেছেন একশ শতক জমিতে। এতে ২২-২৩ হাজার টাকা খরচ করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা গাঁটে তোলার বাসনা থাকলেও দর্শনার্থীরা বারো আনা পুষ্পস্তবক বিনষ্ট করে ফেলায় সব আশা-ভরসা ভেস্তে যাবার হতাশা ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এমন আপদের অনুযোগ প্রায় সর্বত্রই। এর জন্যই মিঠামইন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলীনূর আলম ‘কৌতূহলের বশে কৃষকের ফসল নষ্ট না করার অনুরোধ’ জানান দর্শনার্থীর মন্তব্য বইতে। কৃষি উদ্যোগের যুগে পা রাখা হাওর উপজেলা মিঠামইনে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পরিদর্শন করে এসেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক বশির আহম্মদ সরকার, ঢাকা খামারবাড়ির অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) মো: মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছাইফুল আলম ও অতিরিক্ত উপপরিচালক আশেক পারভেজ।
তারা বলেন, হাওরাঞ্চলের আবহাওয়া, জলবায়ু, মাটি তথা পরিবেশ অনুকূলে থাকায় নতুন সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে সূর্যমুখীর চাষ ও তেল উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনাময় এই হাওরাঞ্চল। ভুট্টার ক্ষেত্রেও। হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার প্রায় ৪৭ টি উপজেলার কৃষক বোরো ফসলে দেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ খাদ্য জোগানদাতা। কৃষির সর্বব্যাপী ভূমিকায় তা নিরাপদ ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রেও উর্বরক্ষেত্র। বহুযুগের সংকট উৎপাদকের জন্য একটি মূল্য কমিশন গঠনের সংকীর্ণতাসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতায় প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় হাওরে কৃষির পারিবারিক ঐতিহ্য ভেঙে যাচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থেকে যাওয়ায় প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন সম্ভব হয় না, যা কৃষকদের জন্য এক বড় হতাশা। দুর্ভোগের কান্নাও। সবুজ ঘাসে ছেয়ে যাওয়া ফসলি মাঠ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘গরিবের নিউজিল্যান্ড’ খ্যাতি পেয়ে কৃষকের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে বিনোদনের অনুষঙ্গ। কৃষি উদ্যোগের এ যুগে বিশেষ ভর্তুকিতে সমগ্র হাওরাঞ্চলের এসব জমি কৃষি বিভাগের পরামর্শে সূর্যমুখী, ভুট্টা ও সবজি চাষের আওতায় আনা হলে মুজিববর্ষে কৃষিতে বদলাবে বাংলাদেশ, কৃষিতে বদলে যাবে হাওরাঞ্চল।
 রফিকুল ইসলাম: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

ছোট এআই মডেলেই বড় চ্যালেঞ্জ: ক্লাউড সিস্টেমকে টক্কর দিচ্ছে নতুন প্রযুক্তি

হাওরে নিরাপদ জীবনের সম্ভাবনায় নবীন সূর্য

আপডেট টাইম : ০১:২৪:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২১
রফিকুল ইসলামঃ ফুটেছে সূর্যমুখী হাওরের সবুজ বুক চিঁড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ফুল্লহাসি দিগন্তজুড়ে, পুষ্প-প্রকৃতিপ্রেমীর ঢল পড়ছে আছড়ে সুন্দরী রমণীর রূপসজ্জা নির্বিশেষে ঝরে।’ এ নবপ্রাণ হাওরের প্রকৃতিতে ও মনে।  যেন মাটি ফুঁড়ে উঠেছে নবীন সূর্য সম্ভাবনার প্রত্যয়ে। হাওরের সবুজ জমিনে এই প্রথমবার জেগেছে প্রকৃতির অকৃত্রিম বন্ধু অসাধারণ এক রূপবান উদ্ভিদ সূর্যমুখী। যে ফুল পাগলপাড়া করে দিয়েছে তার রূপবৈচিত্র্য দিয়ে। ইতিমধ্যে প্রযুক্তির কল্যাণে রূপসী বাংলায় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে দেশ-দুনিয়ায় ব্যাপক পরিচিত পাওয়া নৈসর্গিক হাওরে বিস্তীর্ণ উর্বর মাঠজুড়ে হাসছে প্রকৃতির সন্তান সূর্যমুখী। শিশু মন নেচে উঠছে সেই হাসির দোলায়, যা সবুজের বুকে হলুদমাখা ফুলগুলো ডাকছে অপরূপ সৌন্দর্যের স্বপ্নিল অঙ্গনার হাতছানিতে।  
বাসন্তীরূপের স্নিগ্ধতার উৎসের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পুষ্প-প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থী ও পর্যটকদের ঢল নেমেছে হাওর জনপদে। তাছাড়া বসন্ত উৎসব এবং ভালোবাসা দিবসের মিতালীতে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও নবদম্পতিদের প্রেম উৎসারিত ভালোবাসা দিবসের বাইরেও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তথা মানবজীবনের সর্বক্ষেত্রেই ভালোবাসার এক অপার আবহে ভিড় হাওরজুড়ে। কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার সংযোগস্থাপনকারী অলওয়েদার রোডের জিরো পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্ব পাশ সংলগ্ন জমিনে কৃষক বাহাউদ্দিন ও কৃষাণী হাজেরা বেগমসহ আরও অনেকের সূর্যমুখী ফুলের চাষ দেখে মাতোয়া ভ্রমণপিপাসুরা প্রকাশ করছেন রোমাঞ্চকর যতসব অনুভূতি। তরুণী অনামিকা ও শ্রাবণী বলেন, ‘আহ্, কত্ত সুন্দর! একটি জমিতে ফুটেছে সূর্যমুখী, যেন পুরো মাঠ হাসছে প্রাণ খিলখিলে।
বিস্মিত হয়, যখন দেখলাম সূর্যমুখী ফুলই ঘাড় ঘুরাচ্ছে সূর্যতালে। থাকে সূর্যের দিকেই মুখ করে! এর জন্যই বুঝিবা নাম তার সূর্যমুখী।’ সুন্দরের মায়াময় প্রকৃতি দেখতে আসা দর্শনার্থী ললনা শাহীনূর নাহার, দোলনা ও উচ্চশিক্ষার্থী মানসুরা আক্তার প্রফুল্লচিত্তে বলেন, ‘সূর্যমুখী ক্ষেত দেখে মন ভরে উঠেছে এবং চাষে যেন প্রকৃতিকে ঢেলে সাজিয়েছে নতুন করে কেউ। রূপ ফুলটির গতরে। হাসি যেন আনন্দের সম্ভার এবং চোরা গন্ধ বাতাসে দোল খেয়ে যখন নাকের ভেতর ঢোকে, কী মাদকতায় না হৃদয়জুড়ে জাগিয়ে তোলে মনভোলানো অনুভব।’ আবার অনেকের মোবাইলে বাজছে বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের গান– ‘বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে সই গো বসন্ত বাতাসে।
হাওরের প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য বড়ই বৈচিত্র্যময়। সৌন্দর্যের দিক থেকে হাওরে বর্ষা মৌসুমে অথৈ জলের রূপ অন্যদিকে চলমান শুষ্ক মৌসুমে বোরো-রবি-খরিপ ফসলের রূপ। ফসল বৈচিত্র্য সৃষ্টির পেছনে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের বহুমুখী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সূর্যমুখী আবাদকারী বাহাউদ্দিন ও হাজেরা বেগম দৃষ্টিনন্দন কুসুম মেলায় ঝাঁপি খুলে বসেছেন ‘দর্শনার্থীদের মন্তব্য বহি’ নিয়ে। এখানে যে-যার মতো আবেগ প্রকাশ করে যাচ্ছেন– ‘মনের গহীনে ও চোখের পাতায় সমস্ত ভালো লাগা নিয়ে ফিরে যাচ্ছি শহরে।’ শীতের বিবর্ণ সময়কে পাশ কাটিয়ে বসন্ত সূচনা করে নতুন প্রাণের। এবার শীতের শেষ দিক থেকেই প্রকৃতি ধীরে ধীরে রঙিন হতে থাকে বর্ণিল সাজে।সে রঙে রয়েছে হলুদের প্রধান্য। সরষে ফুলের মতো সূর্যমুখী ফুলও হলুদ।
পরিপক্ক ফল এবং ফসলের মাঠের রং হলুদাভ। ফলে উষ্ণ বসন্তে মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে হলুদ রঙের প্রভাব। প্রকৃতির এ প্রভাব থেকেই বসন্তের রং বাসন্তী। উষ্ণ সময়ের রং বলেই এটি আশা আর সুখের প্রতীক এবং পুরো পৃথিবীজুড়েই বিবেচিত শান্তি, সতেজ, জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সাহস ও গৌরবেরও প্রতীক হিসেবে। আবার ইতিবাচক ভাবনার প্রতীক হিসেবে মানুষ বহু আগেই বসন্তের রং হিসেবে বেছে নিয়েছিল বাসন্তী রংকে। অর্থাৎ হালকা হলদি রংকে। সূর্যমুখী দেখতে রূপময়ই নয়, রূপ ও গুণেও অনন্য। এ সম্পর্কে গাজীপুরের জয়দেবপুর কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড: মোবারক আলীর সাথে আলাপচারীতায় মেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট মানের ভোজ্যতেল সূর্যমুখী, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য অসাধারণ উপকারী।
এতে আছে শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড। ওমেগা ৬ ও ওমগা ৩ ফ্যাটি এসিড (লিনোলিক ও লিনোলেনিক এসিড) ও টেকোফেরল (ভিটামিন ‘ই’) এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেলযুক্ত। তেল শতভাগ উপকারী অসম্পৃক্ত ফ্যাটযুক্ত। নেই ক্ষতিকারক ইউরিক এসিড। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগীর জন্যও সূর্যমুখী তেল নিরাপদ ও খু্বই উপকারী। একইভাবে সূর্যমুখীর ক্ষুদ্র বীজেও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিকর উপাদান। এতে মজুত আছে ২০% প্রোটিন, ৩৫.৪২% তেল এবং ৩১% অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড। এছাড়া ভিটামিন হিসেবে রয়েছে এ, বি ৩, বি ৫, বি ৬, ই, ফোলেট।
তামা, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, সেলেনিয়ামের মতো খনিজ উপাদান, ডায়েটি ফাইবার এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটি এসিড। এগুলোতে ফ্লেভোনয়েডস এবং ফলিক এসিডের মতো প্রচুর উদ্ভিদ যৌগ রয়েছে। এসব হজম সহায়তা, ত্বক জীবাণুমুক্ত ও এন্টি এজিং হিসেবে কাজ করে, চুলের সৌন্দর্য বাড়ায় ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে, রক্তে শর্করার পরিমাণ ও ওজন কমায়। এছাড়া বীজ ছাড়ানোর পর মাথাগুলো এবং সূর্যমুখী খৈল গরু ও মহিষের উৎকৃষ্টমানের খাদ্য হিসেবে এবং গাছ ও পুষ্পস্তবকও ব্যবহৃত হয় জ্বালানি হিসেবে।
তেলসংক্রান্ত জটিল সব অসুখের হাত থেকে রক্ষা পেতে খাবারে তেলের ব্যবহার বাদ দিতে হয় যদিও, কিন্তু শরীরের জন্য দরকারও রয়েছে তেলের। সূর্যমুখী হতে পারে স্বাস্থ্য রক্ষায় গুণসম্পন্ন তৈলবীজ। এ তেল নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতই নয়, আশীর্বাদস্বরূপও। দেশে বাণিজ্যিকভাবে সূর্যমুখী তেল উৎপাদন ও যথাযথভাবে আহরণ করা গেলে ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা বহুলাংশে কমে যাবে। এতে একদিকে যেমন বিদেশ থেকে তেল আমদানি কমে যাবে অন্যদিকে তেমনি বাড়বে তেলের দেশজ উৎপাদনও।
 
দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটাতে আমদানি করা সয়াবিন তেলের ওপর নির্ভরশীল। এই তেলে রয়েছে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক অনেক উপাদান, যা ছিল না স্থানীয়ভাবে ভাঙানো সরিষার তেলেও। সরিষার তেলই ছিল বাঙালির তেলের চাহিদা পূরণের প্রধান তৈলবীজ। আরও ছিল তিল, তিসি, বাদাম। এই তিনটি তৈলবীজের তেলেও ক্ষতিকারক উপাদান নেই এতটা, যতটা আছে আমদানি করা সয়াবিন তেলে। নিরাপদ ভোজ্যতেলের চাহিদা থেকে বাণিজ্যিকভাবে এবারই প্রথম শুরু হয়েছে কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ফসলের পাশাপাশি সূর্যমুখী ফসলের চাষ। যা রবি চাষে পুনর্বাসনের আওতায় ইটনায় ২৭ হেক্টর, মিঠামইন ২৭ হেক্টর, অষ্টগ্রাম ২০ হেক্টর ও নিকলী উপজেলায় ২০ হেক্টর জমিতে ৭শ জন কৃষক-কৃষাণী হাইব্রিড সূর্যমুখীর আবাদ করেছে।
চাষের মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৯৪ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯০ টন এবং তেল প্রায় ৮৫ টন। ইটনার বড়িবাড়ি ব্লকের শিমুলবাগের কৃষক আ: হেকিম, পূর্বগ্রাম ব্লকের মির্দাহাটির শহিদুল ইসলাম ও কৃষাণী মোমেনা বেগম, মিঠামইনের মহিষারকান্দি ব্লকের বেড়িবাঁধের কৃষক বাহাউদ্দিন, ইসলামপুর ব্লকের মুজিবুর রহমান ও কৃৃষাণী জোসনা আক্তার, গোপদিঘী ব্লকের খাসাপুর গ্রামের আ: রহমান ও কৃষাণী আয়শা খাতুন, অষ্টগ্রামের আদমপুর ব্লকের নূরপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ্ আল মামুন ও মো: নাঈম সূর্যমুখীর চাষ প্রথম করায় এর সুফল অজানা। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ ফসলটি লাভজনক এবং ফুল থেকে তেল তোলা যায় ৯০-১০০ দিনের মধ্যে, যার বাজার মূল্য বেশি এবং খরচও অপেক্ষাকৃত কম বলায় উৎসাহিত হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তাঁরা।
সূর্যমুখী চাষের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে নিকলী উপজেলার ষাইতদার গ্রামের কৃষক জালাল, উদ্দিন, কৃষাণী হোসনেহার ও মিয়া হোসেনের। তাঁদের ভাষায় শোনান আলাদীনের চেরাগের নয়, সত্যকাহনের গল্প। মাত্র ৪০ শতক জমিতে সূর্যমুখীর চাষ করে খরচ বাদে প্রায় চারগুণ বেশি লাভ পেয়েছিলেন বলে বিজয়ের গালভরা হাসিতে রহস্যভরে বলেন, বীজ অইছিন ৮ মণ আর ঘানির মালিকরে খৈল দিয়ে তেল অইছিন ৬০ কেজির ওফরে। ৫শ ট্যাহা কেজিতে মাইনষে বাড়িত থেইক্যা কিন্না নিছেগা।
ট্যাহা পাইছি ৩০ হাজার। তাছাড়া সারাবছর তেলও খাইছি ফাও। অথচ খরছ অইছিন ৮ হাজারের মতো। সূর্যমুখী ফসলের ব্যাপক চাষে হাওরের কৃষকের দুর্দিন ঘুচে যেতে পারে বলে বিপুল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে অভিমত ব্যক্ত করেন তাঁরা। অধিক লাভজনক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ও পরামর্শে এবারও নিকলীর কৃষক জালাল উদ্দিন ও কৃষাণী হোসনেহার একাই সূর্যমুখী চাষ করেছেন একশ শতক জমিতে। এতে ২২-২৩ হাজার টাকা খরচ করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা গাঁটে তোলার বাসনা থাকলেও দর্শনার্থীরা বারো আনা পুষ্পস্তবক বিনষ্ট করে ফেলায় সব আশা-ভরসা ভেস্তে যাবার হতাশা ব্যক্ত করেন তাঁরা।
এমন আপদের অনুযোগ প্রায় সর্বত্রই। এর জন্যই মিঠামইন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলীনূর আলম ‘কৌতূহলের বশে কৃষকের ফসল নষ্ট না করার অনুরোধ’ জানান দর্শনার্থীর মন্তব্য বইতে। কৃষি উদ্যোগের যুগে পা রাখা হাওর উপজেলা মিঠামইনে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পরিদর্শন করে এসেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক বশির আহম্মদ সরকার, ঢাকা খামারবাড়ির অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) মো: মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ছাইফুল আলম ও অতিরিক্ত উপপরিচালক আশেক পারভেজ।
তারা বলেন, হাওরাঞ্চলের আবহাওয়া, জলবায়ু, মাটি তথা পরিবেশ অনুকূলে থাকায় নতুন সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে সূর্যমুখীর চাষ ও তেল উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনাময় এই হাওরাঞ্চল। ভুট্টার ক্ষেত্রেও। হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার প্রায় ৪৭ টি উপজেলার কৃষক বোরো ফসলে দেশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ খাদ্য জোগানদাতা। কৃষির সর্বব্যাপী ভূমিকায় তা নিরাপদ ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রেও উর্বরক্ষেত্র। বহুযুগের সংকট উৎপাদকের জন্য একটি মূল্য কমিশন গঠনের সংকীর্ণতাসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতায় প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় হাওরে কৃষির পারিবারিক ঐতিহ্য ভেঙে যাচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থেকে যাওয়ায় প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদন সম্ভব হয় না, যা কৃষকদের জন্য এক বড় হতাশা। দুর্ভোগের কান্নাও। সবুজ ঘাসে ছেয়ে যাওয়া ফসলি মাঠ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘গরিবের নিউজিল্যান্ড’ খ্যাতি পেয়ে কৃষকের আর্তনাদ হয়ে উঠেছে বিনোদনের অনুষঙ্গ। কৃষি উদ্যোগের এ যুগে বিশেষ ভর্তুকিতে সমগ্র হাওরাঞ্চলের এসব জমি কৃষি বিভাগের পরামর্শে সূর্যমুখী, ভুট্টা ও সবজি চাষের আওতায় আনা হলে মুজিববর্ষে কৃষিতে বদলাবে বাংলাদেশ, কৃষিতে বদলে যাবে হাওরাঞ্চল।
 রফিকুল ইসলাম: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট। সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা।