ঋণের নামে বস্তায় ভরে বেসিক ব্যাংকের টাকা সরিয়ে নেয়া হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় দায়ী করা হয়নি ঋণ বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে রক্ষায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট ডিভিশন (আইসিডি) ও কমার্শিয়াল ক্রেডিট ডিভিশনের (সিসিডি) সংশ্লিষ্টতা। ক্রেডিট পলিসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইড লাইনের প্রসঙ্গও আনা হয়নি। বাচ্চু ও তার সহযোগীদের বাঁচাতেই এ কৌশল নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে আসামি না করে এজাহারেই দেয়া হয়েছে দায়মুক্তি। ঋণ সংশ্লিষ্ট রেকর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন, কমার্শিয়াল অডিট রিপোর্ট ও দুদকের এজাহার পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।
রেকর্ড অনুযায়ী, ঋণের নামে ৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মেসার্স বি. আলম শিপিং লাইন্সের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করে দুদক। এতে আসামি করা হয় প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ বশিরুল আলমসহ ছয়জনকে। এ মামলায় অন্য আসামিরা হলেন- বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলাম, গুলশান শাখার সাবেক ডিজিএম এসএম ওয়ালিউল্লাহ, সাবেক ক্রেডিট ইনচার্জ এসএম জাহিদ হাসান, প্রধান কার্যালয় ঋণ যাচাই কমিটির (এইচওসিসি) সদস্য সচিব এ মোনায়েম খান ও তৎকালীন মহা-ব্যবস্থাপক মো. সেলিম। মামলাটিতে দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়। এজাহারে বলা হয়- আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহারপূর্বক অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করতঃ অন্যায়ভাবে নিজেরা লাভবান হয়ে বেসিক ব্যাংক লি. গুলশান শাখা থেকে এ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
‘বাসাভি ফ্যাশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় করা মামলায় ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয়- বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন এমডি কাজী ফখরুল ইসলাম, বাসাভির চেয়ারম্যান ইয়াসির আহমেদ খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল জামান মোল্লা, পরিচালক আজমল হক আযিম, ব্যাংকের গুলশান শাখা ব্যবস্থাপক শিপার আহমেদ, ক্রেডিট ইনচার্জ এসএম জাহিদ হাসান, একই বিভাগের জিএম মো. আবদুল হাদী গোলাম সানজারি, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মঞ্জুর মোরশেদ, জিএম শাহ আলম ভূঁইয়া ও কমার্শিয়াল ক্রেডিট ডিভিশনের ডিএমডি খন্দকার শামীম হাসানকে। দুটি মামলায়ই কাজী ফখরুল ইসলাম ও শিপার আহমেদ অভিন্ন আসামি। এর একটি শিল্প ঋণ আরেকটি বাণিজ্যিক ঋণ। দুটি এজাহারে ‘পরস্পর যোগসাজশের অভিযোগ আনা হলেও অর্থ আত্মসাতে যোগসাজশকারী আইসিডি ও সিসিডির অন্য সদস্যদের আসামি করা হয়নি। ৬০ কোটি টাকার মামলাটির ঘটনার সময় উল্লেখ করা হয়েছে ২০১২ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৮ মে পর্যন্ত। এ সময় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্রেডিট কমিটির এজিএম পদে ছিলেন মো. শেহাব চৌধুরী, ডিজিএম পদে ছিলেন মো. ওমর ফারুক ও শিপার আহমেদ। বি. আলম শিপিং লাইসেন্সের কোনো মামলায়ই তাদের আসামি করা হয়নি। অথচ আইসিডির দায়িত্বশীল এসব কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছাড়া এ দুটি ঋণ প্রস্তাব অগ্রবর্তী হওয়ার সুযোগ নেই। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সিসিডির দায়িত্বে ছিলেন- ডিজিএম খন্দকার শামীম হাসান, এজিএম মো. সাইফল্লাহ, ডিএমডি এম. মোনায়েম খান, খান ইকবাল হোসেন, মো. এমদাদুল হক, ডিজিএম মাসুদুল আলম, ওমর ফারুক ও মো. মাসুমউদ্দিন খান।
রেকর্ডপত্রে আরও দেখা যায়, শিল্প ঋণের মামলাগুলোতে আইসিডি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ঋণের মামলাগুলোতে কমার্শিয়াল ক্রেডিট ডিভিশনের (সিসিডি) সম্পৃক্ততা আড়াল করা হয়েছে। অথচ শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে বেসিক ব্যাংক লোপাটের পুরোভাগে সম্পৃক্ত ছিলেন আইসিডি ও সিডিডির প্রায় সব সদস্য।
এ সময় আইসিডির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. কোরবান আলী, এজিএম মো. আশরাফুজ্জামান, শেহাব চৌধুরী, ডিজিএম মো. ওমর ফারুক, শিপার আহমেদ ও খান ইকবাল হোসেন দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সালের ১০ মে থেকে ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ শাখায় ডিজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. কোরবান আলী। ২০১১ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১২ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত এজিএম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো.আশরাফুজ্জামান। ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত আইসিডির এজিএম পদে ছিলেন মো. শেহাব চৌধুরী। ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে একই বছর ১০ জুন পর্যন্ত ডিজিএম পদে ছিলেন মো. ওমর ফারুক। ২০১২ সালের ৩ আগস্ট থেকে ২০১৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত ডিজিএম পদে দায়িত্ব পালন করেন শিপার আহমেদ। একই পদে ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন খান ইকবাল হোসেন।
এ সময় সিসিডির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা হলেন- ডিজিএম খান শামীম হাসান, এজিএম মো. সাইফুল্লাহ, ডিএমডি এ. মোনায়েম খান, ডিজিএম খান ইকবাল হোসেন, মো. এমদাদুল হক, মো. মাসুদুল আলম, ডিজিএম মো. ওমর ফারুক ও মো. মাসুমউদ্দিন খান। ডিজিএম খন্দকার শামীম হাসান ২০১০ সালের ৬ জুন থেকে ২০১১ সালের ২৮ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত এ শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। এজিএম মো. সাইফল্লাহ এজিএম পদে ছিলেন ২০১১ সালের ১২ অক্টোবর থেকে ২০১৩ সালের ১০ জুন পর্যন্ত। ডিএমডি এ. মোনায়েম খান দায়িত্ব পালন করেন ২০১১ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের ৩০ মে পর্যন্ত। ডিজিএম খান ইকবাল দায়িত্বে ছিলেন ২০১২ সালের ২০ মে থেকে ২০১৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত। একই পদে মো. এমদাদুল হক দায়িত্বে ছিলেন ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে একই বছরের ১৫ মে পর্যন্ত। ডিজিএম মাসুদুল আলম ছিলেন ২০১৩ সালের ১৯ মে থেকে একই বছরের ২ জুন পর্যন্ত। ওমর ফারুক ২০১৩ সালের ১১ জুন থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। মো. মাসুম উদ্দিন খান এ শাখার ডিজিএম পদে দায়িত্বে ছিলেন ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৩০ মে পর্যন্ত। আইসিডি প্রধানদের দায়িত্ব ছিল শাখা থেকে ঋণ প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে আসার পর ব্যাংকের ক্রেডিট পলিসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইড লাইন অনুসারে প্রস্তাবের মেরিট (সারবত্তা) যাচাই করা। এ প্রক্রিয়ায় রয়েছে ঋণ প্রত্যাশী প্রতিষ্ঠানের ক্লিন সিআইবি রিপোর্ট, একসেপ্টেবল সিআরজি (ক্রেডিট রিস্ক গ্রেডিং), ব্যবসাসংক্রান্ত তথ্য এবং সহায়ক জামানত (কো-লেটারাল) যাচাই করা। ঋণের আবেদন ‘অযোগ্য’ বিবেচিত হলে আইসিডি ও সিসিডি ঋণের আবেদন শাখায় ফেরত পাঠানোর বিধান নেই। সে ক্ষেত্রে ঋণ প্রাপ্তির শর্তাবলী পূরণের লক্ষ্যে ঋণ প্রস্তাবকারী শাখা থেকে আরও তথ্য-উপাত্ত চাইতে (কয়েরি করা) পারে। কিন্তু আইসিডি ও সিসিডি থেকে কোনো তথ্য-উপাত্ত না চেয়ে সরাসরি প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটিতে (এইচওসিসি) পেশ করে। মামলাগুলোতে আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধজনিত বিশ্বাস ভঙ্গ এবং অন্যায়ভাবে ব্যক্তিগত লাভের যে অভিযোগ আনা হয়েছে সেটি এ দুটি বিভাগের সব বিভাগীয় প্রধানদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অথচ ‘পছন্দ-অপছন্দ’র ভিত্তিতে আসামি করে দুদক ৫৬টি মামলায়ই বাচ্চু ও তার সহযোগীদের এজাহারেই ‘দায়মুক্তি’ দিয়েছে।
এমজেই,ঢাকা
সংবাদ শিরোনাম
বাচ্চুকে বাঁচাতে এড়িয়ে যাওয়া হয় ঋণ বিভাগ প্রধানদের সংশ্লিষ্টতা
-
Reporter Name - আপডেট টাইম : ০২:০৭:৩০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০১৫
- ৩৬৮ বার
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ


























