ঢাকা ০৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহজালাল বিমানবন্দরে মাল্টিমোড রাডার প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানা হচ্ছে না

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০৫:৫৮:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭
  • ৩৭৭ বার

হাওর বার্তা ডেস্কঃ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য মাল্টিমোড রাডার স্টেশন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানা হচ্ছে না। প্রকল্পটি সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) মেগা প্রকল্পের নকশা ভেঙে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি আলাদাভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংস্থাটি সমন্বিত প্রকল্প থেকে ভিসিসিএস (ভয়েস কন্ট্রোল কমিউনিকেশন্স সিস্টেম) ও এডিএসবি (অটোমেটিক ডিপেনডেন্ট সার্ভিলেন্স ব্রডকাস্ট), ইকুইপমেন্ট দুটি আলাদাভাবে কেনার জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আলাদাভাবে যন্ত্র কিনে রাডার স্থাপন করা হলে তা যথাযথভাবে কাজ করবে না। এতে পুরো অর্থই পানিতে যাবে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী হাওর বার্তাকে জানাই, আলাদাভাবে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে রাডার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তিনি বেবিচক চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন। চেয়ারম্যান তাকে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পেপার উপস্থাপন করা হবে। তারপর সবার মত অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে। পরিচালক ফ্লাইট সেফটির চিঠির বিষয়ে মন্ত্রী কিছুই জানেন না বলে উল্লেখ করেন।

প্রকল্পের কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচালক ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন চৌধুরী এম জিয়াউল কবীর রাডার স্টেশন স্থাপন প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বেবিচক’কে চিঠি দিয়েছেন। তিনি এতে উল্লেখ করেন, শাহজালালের এ মেগা প্রকল্পের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বিত কার্যক্রম।

প্রকল্পের সব কম্পোনেন্ট বা যন্ত্রপাতি একই সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন হওয়ায় অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে। কিন্তু আলাদাভাবে এডিএসবি ও ভিসিসিএস কেনা হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য যন্ত্রপাতি এটিএন অটোমেশনে সমন্বয় করা খুবই কঠিন ও দুরূহ হবে। কিছু ক্ষেত্রে ইন্টিগ্রেশন সম্ভব হলেও প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ হাওর বার্তাকে বলেছেন, এ ধরনের প্রকল্প সমন্বিতভাবে না করলে ভবিষ্যতে রাডার স্টেশনটি যথাযথভাবে কাজ করবে না। এর রক্ষণাবেক্ষণ করাও কঠিন এবং ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়বে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন করতে হলে ফের তার অনুমোদন লাগবে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের জন্য এনইসি’র রাডার কেনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার আরডিপিটি (রাডার) থ্যালাস কোম্পানির এবং এটিএনটি কমসফট কোম্পানির হওয়ায় এনইসি’র প্রকৌশলীরা থ্যালাস ও কমসফট’র সহায়তা ছাড়া ইন্টিগ্রেশন করতে পারছেন না। ফলে বর্তমানে রাডারটি ইন্টিগ্রেশন ছাড়াই অপারেশন করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, প্রায় এক হাজার কোটি টাকার এ মাল্টিমোড রাডার স্টেশন প্রকল্প থেকে ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আলাদাভাবে ক্রয় করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিসিসিএস (ভয়েস কন্ট্রোল কমিউনিকেশন্স সিস্টেম), এডিএসবি (অটোমেটিক ডিপেনডেন্ট সার্ভিলেন্স ব্রডকাস্ট), আরসিএজি (রিমোট কমিউনিকেশন এয়ার টু গ্রাউন্ড), ভিএইচএফ (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি), এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইকুইপমেন্ট।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল এভিয়েশনের এক পরিচালক হাওর বার্তাকে বলেন, প্রকল্পটির সব যন্ত্রপাতি একটি প্যাকেজের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে ক্রয় করার জন্য ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেন। এর আগে ১ মার্চ অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পিপিপি’র (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভেঙে ভেঙে না করে সমন্বিতভাবে (ইন্টিগ্রেটেড) করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সমন্বতি প্যাকেজটি ভেঙে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ওই প্যাকেজ থেকে ভিসিসিএস (ভয়েস কমিউনিকেশন্স সিস্টেম) ও এডিএসবি ইকুইপমেন্ট দুটি আলাদাভাবে ক্রয়ের জন্য টেন্ডার আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া ২৭ নভেম্বর এক অফিস আদেশে প্রথামিকভাবে প্যাকেজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইকুইপমেন্ট আলাদাভাবে কেনার সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। বেবিচকের এ আদেশে খোদ এফএসআর (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এফএসআর বিভাগের পরিচালক উইং কমান্ডার চৌধুরী এম জিয়াউল কবীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সাপ্লাই ইন্সটলেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন অব মাল্টি মোড সার্ভিলেন্স সিস্টেম (রাডার, এডিএসবি) এটিএস অ্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেম শীর্ষক প্রকল্পটি ১ মার্চে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পিপিপির পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়।

পিপিপির ওই প্রকল্পের দর প্রস্তাব করা হয়েছিল ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নে সমন্বিত প্যাকেজ আকারে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ১৫ মার্চ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেন। তার মতে, এ অবস্থায় যে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে, তারই অংশবিশেষ আলাদাভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন নিতে হবে।

চিঠিতে পরিচালক এফএসআর আরও বলেন, এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাজের স্বার্থে তাকে এ প্রকল্পের কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছেন। প্রকল্পের নতুন নামকরণ করা হয়েছে সিএনএস-এটিএন (অ্যারোরেটিক্যাল টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক) সিস্টেম আধুনিকায়ন। এ ব্যাপারে ফাস্ট ড্রাফট ডিপিপি এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যা এখনও যাচাই-বাছাই পর্যায়ে আছে।

তাছাড়া প্রকল্পটির কারিগরি স্পেসিফিকেশনগুলো আইকাও (আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন)-এর টেকনিক্যাল কো-অপারেশন ব্যুরোর (টিসিবি) সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিকমানের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করেছে। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিকমানের স্পেসিফিকেশনের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে স্পেসিফিকেশন নির্মাণ কতখানি সুফল বয়ে আনবে, তা বিবেচনার বিষয়।

চিঠিতে তিনি বলেন, সিএনএস এটিএন সিস্টেম আধুনিকায়ন নামে প্রকল্পটি দ্রুত সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে আইএমইডি (ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড অ্যাভুলেশন ডিভিশন), বুয়েট, পরিকল্পনা কমিশন, বেবিচকসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেবিচকের সদস্য অর্থ এই কমিটির সভাপতি।

কমিটি এরই মধ্যে একটি সভা করেছে। দ্বিতীয় সভাও শিগগির অনুষ্ঠিত হবে। প্রকল্পটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় হঠাৎ করে এরকম একটি মেগা প্রকল্প ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি কীভাবে আরেকটি বিভাগ ক্রয় করবে, বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, শাহজালালের এ মেগা প্রকল্পের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বিত কার্যক্রম। প্রকল্পের সব কম্পোনেন্ট বা যন্ত্রপাতি একই সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন হওয়ার ফলে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে। আলাদাভাবে এডিএসবি ও ভিসিসিএস ক্রয় করা হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য যন্ত্রপাতি এটিএন অটোমেশনে সমন্বয় করা খুবই কঠিন ও দুরূহ হবে।

কিছু ক্ষেত্রে ইন্টিগ্রেশন সম্ভব হলেও প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। তাছাড়া এডিএসবি আলাদাভাবে ক্রয় ও সংস্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে বর্তমান রাডারের (আরডিপি) সঙ্গে নতুন এটিএন প্রকল্পের রাডার, এমলেট ও এটিএন সিস্টেমের সমন্বয় করা খুবই কঠিন হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয় করা সম্ভব হবে না। এতে বিপুল অঙ্কের টাকা ক্ষতি হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির এক সদস্য হাওর বার্তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত প্রকল্পের আওতাভুক্ত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আলাদাভাবে ক্রয় ও সংস্থাপন কোনোভাবেই ঠিক হবে না। এটি করা হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করা হবে। এটি করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনসহ অন্যান্য সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এ ধরনের স্পর্শকাতর প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আলাদাভাবে ক্রয় করা হলে ভবিষ্যতে সমন্বয় করা কঠিন হবে।

তার মতে, প্রথম পর্যায়ে কন্ট্রোল টাওয়ার এবং পরবর্তী পর্যায়ে সম্পূর্ণ সিস্টেমটি নতুন টাওয়ারে স্থানান্তরেও নানা সমস্যা দেখা দেবে। ভবিষ্যতে প্রকল্পের কম্পোনেন্ট/যন্ত্রপাতির সঙ্গে সমন্বয় ঘটানো প্রায় অসম্ভব হবে এবং ব্যয়বহুল হবে। তার মতে, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদিত একটি প্রকল্পকে ভেঙে ভেঙে বাস্তবায়ন করা সরকারি নীতিমালা ভঙ্গ করার শামিল।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Haor Barta24

জনপ্রিয় সংবাদ

শাহজালাল বিমানবন্দরে মাল্টিমোড রাডার প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানা হচ্ছে না

আপডেট টাইম : ০৫:৫৮:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭

হাওর বার্তা ডেস্কঃ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য মাল্টিমোড রাডার স্টেশন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মানা হচ্ছে না। প্রকল্পটি সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন। কিন্তু বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) মেগা প্রকল্পের নকশা ভেঙে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি আলাদাভাবে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংস্থাটি সমন্বিত প্রকল্প থেকে ভিসিসিএস (ভয়েস কন্ট্রোল কমিউনিকেশন্স সিস্টেম) ও এডিএসবি (অটোমেটিক ডিপেনডেন্ট সার্ভিলেন্স ব্রডকাস্ট), ইকুইপমেন্ট দুটি আলাদাভাবে কেনার জন্য দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। আলাদাভাবে যন্ত্র কিনে রাডার স্থাপন করা হলে তা যথাযথভাবে কাজ করবে না। এতে পুরো অর্থই পানিতে যাবে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী হাওর বার্তাকে জানাই, আলাদাভাবে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে রাডার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তিনি বেবিচক চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন। চেয়ারম্যান তাকে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে পেপার উপস্থাপন করা হবে। তারপর সবার মত অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে। পরিচালক ফ্লাইট সেফটির চিঠির বিষয়ে মন্ত্রী কিছুই জানেন না বলে উল্লেখ করেন।

প্রকল্পের কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচালক ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন চৌধুরী এম জিয়াউল কবীর রাডার স্টেশন স্থাপন প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বেবিচক’কে চিঠি দিয়েছেন। তিনি এতে উল্লেখ করেন, শাহজালালের এ মেগা প্রকল্পের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বিত কার্যক্রম।

প্রকল্পের সব কম্পোনেন্ট বা যন্ত্রপাতি একই সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন হওয়ায় অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে। কিন্তু আলাদাভাবে এডিএসবি ও ভিসিসিএস কেনা হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য যন্ত্রপাতি এটিএন অটোমেশনে সমন্বয় করা খুবই কঠিন ও দুরূহ হবে। কিছু ক্ষেত্রে ইন্টিগ্রেশন সম্ভব হলেও প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ হাওর বার্তাকে বলেছেন, এ ধরনের প্রকল্প সমন্বিতভাবে না করলে ভবিষ্যতে রাডার স্টেশনটি যথাযথভাবে কাজ করবে না। এর রক্ষণাবেক্ষণ করাও কঠিন এবং ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়বে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন করতে হলে ফের তার অনুমোদন লাগবে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের জন্য এনইসি’র রাডার কেনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ঢাকার আরডিপিটি (রাডার) থ্যালাস কোম্পানির এবং এটিএনটি কমসফট কোম্পানির হওয়ায় এনইসি’র প্রকৌশলীরা থ্যালাস ও কমসফট’র সহায়তা ছাড়া ইন্টিগ্রেশন করতে পারছেন না। ফলে বর্তমানে রাডারটি ইন্টিগ্রেশন ছাড়াই অপারেশন করা হচ্ছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, প্রায় এক হাজার কোটি টাকার এ মাল্টিমোড রাডার স্টেশন প্রকল্প থেকে ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আলাদাভাবে ক্রয় করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিসিসিএস (ভয়েস কন্ট্রোল কমিউনিকেশন্স সিস্টেম), এডিএসবি (অটোমেটিক ডিপেনডেন্ট সার্ভিলেন্স ব্রডকাস্ট), আরসিএজি (রিমোট কমিউনিকেশন এয়ার টু গ্রাউন্ড), ভিএইচএফ (ভেরি হাই ফ্রিকোয়েন্সি), এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ইকুইপমেন্ট।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিভিল এভিয়েশনের এক পরিচালক হাওর বার্তাকে বলেন, প্রকল্পটির সব যন্ত্রপাতি একটি প্যাকেজের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে ক্রয় করার জন্য ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেন। এর আগে ১ মার্চ অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পিপিপি’র (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।

একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভেঙে ভেঙে না করে সমন্বিতভাবে (ইন্টিগ্রেটেড) করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সমন্বতি প্যাকেজটি ভেঙে যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ওই প্যাকেজ থেকে ভিসিসিএস (ভয়েস কমিউনিকেশন্স সিস্টেম) ও এডিএসবি ইকুইপমেন্ট দুটি আলাদাভাবে ক্রয়ের জন্য টেন্ডার আহ্বানের প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানা গেছে।

এছাড়া ২৭ নভেম্বর এক অফিস আদেশে প্রথামিকভাবে প্যাকেজের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইকুইপমেন্ট আলাদাভাবে কেনার সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। বেবিচকের এ আদেশে খোদ এফএসআর (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) বিভাগ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

এফএসআর বিভাগের পরিচালক উইং কমান্ডার চৌধুরী এম জিয়াউল কবীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সাপ্লাই ইন্সটলেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন অব মাল্টি মোড সার্ভিলেন্স সিস্টেম (রাডার, এডিএসবি) এটিএস অ্যান্ড কমিউনিকেশন সিস্টেম শীর্ষক প্রকল্পটি ১ মার্চে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পিপিপির পরিবর্তে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দেয়া হয়।

পিপিপির ওই প্রকল্পের দর প্রস্তাব করা হয়েছিল ১ হাজার ৭৫৫ কোটি টাকা। সরকারি অর্থায়নে সমন্বিত প্যাকেজ আকারে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ১৫ মার্চ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন করেন। তার মতে, এ অবস্থায় যে প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে, তারই অংশবিশেষ আলাদাভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন নিতে হবে।

চিঠিতে পরিচালক এফএসআর আরও বলেন, এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাজের স্বার্থে তাকে এ প্রকল্পের কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছেন। প্রকল্পের নতুন নামকরণ করা হয়েছে সিএনএস-এটিএন (অ্যারোরেটিক্যাল টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক) সিস্টেম আধুনিকায়ন। এ ব্যাপারে ফাস্ট ড্রাফট ডিপিপি এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যা এখনও যাচাই-বাছাই পর্যায়ে আছে।

তাছাড়া প্রকল্পটির কারিগরি স্পেসিফিকেশনগুলো আইকাও (আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন)-এর টেকনিক্যাল কো-অপারেশন ব্যুরোর (টিসিবি) সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিকমানের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করেছে। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিকমানের স্পেসিফিকেশনের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে স্পেসিফিকেশন নির্মাণ কতখানি সুফল বয়ে আনবে, তা বিবেচনার বিষয়।

চিঠিতে তিনি বলেন, সিএনএস এটিএন সিস্টেম আধুনিকায়ন নামে প্রকল্পটি দ্রুত সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষের অনুরোধে আইএমইডি (ইমপ্লিমেন্টেশন মনিটরিং অ্যান্ড অ্যাভুলেশন ডিভিশন), বুয়েট, পরিকল্পনা কমিশন, বেবিচকসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেবিচকের সদস্য অর্থ এই কমিটির সভাপতি।

কমিটি এরই মধ্যে একটি সভা করেছে। দ্বিতীয় সভাও শিগগির অনুষ্ঠিত হবে। প্রকল্পটি মন্ত্রণালয় কর্তৃক সরাসরি তদারকি করা হচ্ছে। এ অবস্থায় হঠাৎ করে এরকম একটি মেগা প্রকল্প ভেঙে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি কীভাবে আরেকটি বিভাগ ক্রয় করবে, বিষয়টি স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, শাহজালালের এ মেগা প্রকল্পের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বিত কার্যক্রম। প্রকল্পের সব কম্পোনেন্ট বা যন্ত্রপাতি একই সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন হওয়ার ফলে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে। আলাদাভাবে এডিএসবি ও ভিসিসিএস ক্রয় করা হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য যন্ত্রপাতি এটিএন অটোমেশনে সমন্বয় করা খুবই কঠিন ও দুরূহ হবে।

কিছু ক্ষেত্রে ইন্টিগ্রেশন সম্ভব হলেও প্রকল্প ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। তাছাড়া এডিএসবি আলাদাভাবে ক্রয় ও সংস্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে বর্তমান রাডারের (আরডিপি) সঙ্গে নতুন এটিএন প্রকল্পের রাডার, এমলেট ও এটিএন সিস্টেমের সমন্বয় করা খুবই কঠিন হবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয় করা সম্ভব হবে না। এতে বিপুল অঙ্কের টাকা ক্ষতি হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্প বাস্তবায়নে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির এক সদস্য হাওর বার্তাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনুমোদিত প্রকল্পের আওতাভুক্ত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আলাদাভাবে ক্রয় ও সংস্থাপন কোনোভাবেই ঠিক হবে না। এটি করা হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ উপেক্ষা করা হবে। এটি করতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনসহ অন্যান্য সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। এ ধরনের স্পর্শকাতর প্রকল্পের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আলাদাভাবে ক্রয় করা হলে ভবিষ্যতে সমন্বয় করা কঠিন হবে।

তার মতে, প্রথম পর্যায়ে কন্ট্রোল টাওয়ার এবং পরবর্তী পর্যায়ে সম্পূর্ণ সিস্টেমটি নতুন টাওয়ারে স্থানান্তরেও নানা সমস্যা দেখা দেবে। ভবিষ্যতে প্রকল্পের কম্পোনেন্ট/যন্ত্রপাতির সঙ্গে সমন্বয় ঘটানো প্রায় অসম্ভব হবে এবং ব্যয়বহুল হবে। তার মতে, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদিত একটি প্রকল্পকে ভেঙে ভেঙে বাস্তবায়ন করা সরকারি নীতিমালা ভঙ্গ করার শামিল।